এমন নিশির ডাক এড়ানো মুস্কিল। এ ডাক তার ছোটবেলা থেকেই সমরেশ শুনে এসেছে এবং সেই ডাকে বেশিরভাগ সময়ই সাড়া দিয়ে বিছানা ছেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। ছোটবেলার কথা গুলো মনে পড়লে এখনো তার মাথার চুলের গোড়ায় আর কানের লতি দুটো শিরশির করে ওঠে।
ভোরবেলায় রাত্রি জাগরণের জন্য জবা ফুলের মতো লাল টকটকে চোখ দেখেই তার জ্যেঠু ঠিক বুঝে ফেলতেন আর খুব গম্ভীর গলায় বলতেন,
— এদিকে আয়।
জ্যেঠুর ডাককে অমান্য করার মতো বুকের পাটা তখনও তৈরি হয় নি। ফলে গুটিগুটি পায়ে জ্যেঠুর সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়াতেই বলতেন,
— কাল রাতেও নিশ্চয়ই ঘুমোস নি ?
এই প্রশ্নের কী যে উত্তর হবে তা তখন ভাবতে ভাবতেই জ্যেঠুর কড়া পড়া হাতের আঙুল ততক্ষণে হয় তার চুলের গোছা নয়তো কানের লতিকে দখল করে নিয়েছে। তারপরই এক মোক্ষম মোচড়ে তার চোখের জল বেরিয়ে আসত। আর এরকম হবে না — এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তবে নিষ্কৃতি মিলত। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি কোনোবারই সেই প্রতিশ্রুতি সে রাখতে পারত না। কয়েকদিন পর আবার সেই নিশির ডাক।
তার পড়ার টেবিল থেকে খুঁজে খুঁজে যত ভূতের গল্পের বই ছিল সব বই গুলিকে একজন ঝানু দারোগার মতো জ্যেঠু সীজ করে নিল। প্রত্যেকের একটা বদ্ধমূল ধারণাই তৈরি হয়ে গিয়েছিল ঐ সব ভূতের বই পড়ার ফলে নিশ্চয় সমরেশের ঘাড়ে ভূতেরা ভর করেছে। ওনারাই ওকে নিশিতে ডেকে নিয়ে যায়।
এর ফলে তাকে নিয়ে তাদের বাড়ির প্রত্যেকের চিন্তার সীমা রইল না। সে যেন তাদের বাড়ির এক বিষম ঝামেলার বিষয় হয়ে উঠল। শুধু কি তাদের ঝামেলা! সে নিজেই নিজের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ল বেশ ভালো রকমে।
প্রায় নিয়ম করে তাকে তার মা আর জেঠিমা বিভিন্ন সাধুবাবার আস্তানায় নিয়ে গিয়ে হাজির করত। কত রকমের তাবিজ কবজ যে তার হাতে, গলায়,কোমরে পড়তে হয়েছে তার হিসেব নেই। কত যে মন্ত্র পড়া জল খেতে হয়েছে সেসব কথা ভাবলে সত্যি এখনো তার গায়ে জ্বর আসে।
ব্যাপারটা এখানেই থেমে থাকল না। এর ফলে একটা বেশ মজার ঘটনাও এরসঙ্গে শুরু হয়ে গেল।প্রতি মাসের পূর্ণিমাতে জেঠিমার আর বাড়ির পুরোহিতের পরামর্শে নারায়ণ পূজোর ব্যবস্থা হলো। এতে সমরেশ বেশ মজা যেযন পেল তেমনি তার আনন্দও হলো দ্বিগুণ। কারণ নারায়ণের প্রসাদ সিন্নি ছিল তার অত্যন্ত প্রিয়।ফলে বাড়ির সবাইকে সে নারায়ণের প্রতি তার অগাধ ভক্তি প্রদর্শণেরও একটা সুযোগ পেয়ে গেল। যেন সে নিজেও রাত্রির ঐ অবাঞ্ছিত ডাককে এড়িয়ে যেতে পারে। এর জন্য অত্যন্ত ভক্তি সহযোগে সে বাড়ির অন্যান্যদের তুলনায় সিন্নির উপর অনেক বেশি ভাগ বসাত। নারায়ণের প্রসাদের উপর তার এই প্রগাঢ় ভক্তি দেখে তার মা নিজেই তাকে আলাদা এক জামবাটিতে সিন্নি ভর্তি করে পরিবেশন করত।
কিন্তু নিশির ডাক থামল না। ফলে নারায়ণের পূজো ধারাবাহিক ভাবে অব্যাহত রইল।
গ্র্যাজুয়েশন করার পর মাস্টার্স করার জন্য যখন সমরেশ কলকাতার হস্টেলে থাকত তখন এই নিশির ডাকেই সে বিভোর হয়ে থাকত। সপ্তাহের মধ্যে প্রায় দিন তিনেক রাতে সে ভয়ঙ্কর নিশির ডাকে সাড়া না দিয়ে পারত না। পরের দিন অবধারিতভাবে বেলা বারোটা পর্যন্ত একেবারে নির্ভেজাল ঘুম।
মাস্টার্স পাশ করে বাড়ি থেকে দূরে মালদার একটা কলেজে অধ্যাপনা করার সময় তাকে বাড়ি ভাড়া করে থাকতে হয়েছে বেশ কয়েক বছর। তখন একলা থাকার সুবাদে রাতকে সে আপন করে নিয়েছিল নিজের মতো করে। আর এদিকে কলকাতায় তার মা নিয়ম করে নারায়ণ পূজোকে অব্যাহত রেখেছিল।
আসল গোলমালটা শুরু হলো সমরেশের বিয়ের পর। তার স্ত্রী কৌশিকী লক্ষ্য করল তার স্বামী তার মতোই তপন কুমারের লেখা ভূতের বই পড়তে ভালোবাসে। যেহেতু সে নিজে তপন কুমারের লেখা পড়তে ভালোবাসে সেহেতু সে কোনোদিনই তপন কুমারের নতুন নতুন বই সমরেশ কিনে আনলে খুশিই হতো।
প্রথম কয়েক মাস ভালোয় ভালোয় কাটল। সমরেশের মা, বাবা ভাবল এতোদিনে ছেলেটাকে ঐ ভয়ঙ্কর নিশির ডাক বোধহয় মুক্তি দিয়েছে। এই কথা ভেবে তাদের মন শান্ত হয়েছে। ততদিনে সমরেশের জ্যেঠু ইহলোক ত্যাগ করে চলে গেছে। জেঠিমাও প্রায় অথর্ব হয়ে পড়েছে। তাই জেঠিমার একমাত্র মেয়ে সমরেশের বড়দি অনন্যা আসানসোলে তার কাছে নিয়ে গেছে।
হঠাৎই একদিন সেই ডাক। প্রবল এবং ভয়ঙ্কর ডাক। স্ত্রী কৌশিকীর ঘুমটা ভেঙে যেতেই দেখে সমরেশ বিছানায় নেই। প্রথমে বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিল কৌশিকী। একটু ধাতস্থ হয়ে সে উঠে বসল বিছানার উপর। তারপর ধীরে ধীরে খাট থেকে নেমে বারান্দায় গিয়ে দেখে সমরেশ আকাশের নবমীর চাঁদের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে।
কৌশিকী একটু ভেবে নিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল,
— কী হলো তোমার? ঘুম থেকে উঠে এসেছ কেন ?
কৌশিকীর কথায় কোনো উত্তর সমরেশ দিচ্ছে না। যেন সে কৌশিকীর কোনো কথাই শুনতে পাচ্ছে না।
— কি গো, কী হলো তোমার?
তবুও কোনো উত্তর দিচ্ছে না সমরেশ।
এবার ভীষণ ভয় পেয়ে গেল কৌশিকী। সে বেশ উত্তেজিত হয়ে উঁচু স্বরে বলল,
— কী হলো শুনতে পাচ্ছ না, আমি কি বলছি?
বলেই কৌশিকী সমরেশের পিঠে হাত রাখতেই সমরেশ চমকে ওঠে। সে ফিরে দেখে তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে কৌশিকী। কৌশিকীকে দেখে সমরেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
— কী ব্যাপার, তুমি এখানে?
— প্রশ্নটা তো আমার সমরেশ। তুমি কেন এখানে ? শরীর খারাপ ? আমাকে ডাকো নি কেন ?
সমরেশ কোনোক্রমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
— না,এমনি ঘুম আসছিল না, তাই।
— চলো ঘরে চলো।
— চলো।
কৌশিকী লক্ষ্য করল বেশ কয়েক দিন পর আবার সেই একই ভাবে সমরেশ বিছানা থেকে উধাও হয়ে গেছে। সেদিন কিন্তু আর বারান্দায় সমরেশকে দেখতে পেল না। কৌশিকীর ভিতরটা কেঁপে উঠল। সমরেশের স্টাডি রুম থেকে যেন এক চিলতে আলো এসে বারান্দার মেঝেতে পড়েছে। কৌশিকী ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে গেল। প্রায় ভেজানো দরজার ফাঁক দিয়ে দেখল সমরেশ তার স্টাডি চেয়ারে বসে বসে গভীর ভাবে কী যেন ভাবছে। তার হাতে একটা কলম।
কৌশিকী যেমন এসেছিল তেমনভাবেই ফিরে গেছে তার বেডরুমে।
আজ কৌশিকীর ঘুম আসছিল না। চোখ বন্ধ করে মটকা মেরে পড়েছিল। গভীর রাতে সমরেশ যেই উঠতে গেল তখনই তার হাতটা ধরে ফেলল কৌশিকী।
— কী ব্যাপার কৌশিকী, তুমি ঘুমোও নি?
সমরেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল।
— দেখতেই তো পাচ্ছো, আমি ঘুমোই নি। এবার বলো তো মাঝে মাঝেই রাতে তুমি ঘুম থেকে উঠে চলে যাও কেন? কী হয়েছে তোমার ?
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— গভীর ডাক।
— ডাক?
আকাশ থেকে পড়ল কৌশিকী।
— কিসের ডাক ? কার ডাক? কী বলছ তুমি!
— ঠিকই বলছি । প্লীজ হাতটা ছেড়ে দাও।
— না ছাড়ব না।
— দেখ একটা প্লট মাথায় ক্লিক করে গেল। এখুনি না লিখে রাখলে গল্পটা হারিয়ে যাবে।
— মানে?
— নতুন পাবলিশার তপন কুমারের কাছে একটা নতুন গল্প চেয়েছে।
কথাটা বলেই সমরেশের হুঁশ ফেরে। সমরেশের কথা শুনে কৌশিকী বলে,
— তপন কুমারের কাছে গল্প চেয়েছে তা তুমি জানলে কি করে?
— না, মানে সেদিন তপন কুমারের সঙ্গে কলেজ স্ট্রিটে দেখা হয়েছিল, তখন উনি বললেন। এই প্লটটা ওনাকে কালকে দিয়ে দেব তারপর উনি যেমন করেই হোক লিখবেন। কী বলো ?
মুচকি হেসে কৌশিকী বলল,
— কালকে আর কলেজে যেতে হবে না। কালকেই লিখে পাবলিশারকে খবর দিও গল্পটা নিয়ে যেতে।
— আমি লিখব মানে!
— বিয়ের আগে আমি সব খবর নিয়েই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছি যে তপন কুমার!


