বর্ষার চিঠি
যখন আমি ছোট ছিলাম, বর্ষার নতুন জলে
খেলতাম নানান খেলা উৎসাহ ও কৌতূহলে ৷
নৌকা ভাসানো,ডুব দেয়া আরো দিতাম সাঁতার
বর্ষা ছিল আমার সঙ্গে কিছু লাগেনা তো আর !
মন ভরতো প্রকৃতির মায়াময় সৌন্দর্য দেখে
দুষ্ট ছেলের দল শরীর ভরতাম কাঁদা মেখে ৷
জলের কলকল শব্দে মনটা থাকতো না ঘরে
নতুন সুরে মনটা আটকে দিতাম কেমন করে ?
খেলাগুলো চলতো আমাদের ঘন্টার পর ঘন্টা
নতুন জলের ঝংকারেই পড়ে থাকতো মনটা ৷
বর্ষার জলে চোখ লাল করে আসতাম নেয়ে
চোখের কোনে আসতো জল মা’র বকুনি খেয়ে ৷
নদী-নালা,ডোবা-খাল,বিল-ঝিল ভরতো জলে
নব জলে দাপিয়ে বেড়াতাম দুষ্টু ছেলের দলে ৷
এ যে ছলাৎ ছলাৎ শব্দের জল তরঙ্গ খেলা
কলাগাছ কেটে কেটে শিশুরা ভাসাইতো ভেলা ৷
আমরা ভাসাতাম কাগজের নৌকা নতুন জলে
ঘুরে বেড়াতাম নানা জায়গা মাছ ধরার ছলে ৷
স্বচ্ছ জলে মাছ দেখার ছলে অপেক্ষায় থাকি
সাপ দেখে পেতাম ভয় আর ব্যাঙ উঠতো ডাকি !
গাছে গাছে কদম,কেয়া,হিজল,হাস্নাহেনা হাসে
বিলে ঝিলে কলমিলতা,হেলেঞ্চা ও শাপলা ভাসে ৷
গাছে গাছে নানারঙ পাখি কিচির মিচির ডাকে
পানকৌড়ি,ডাহুক-ডাহুকী, হাঁসেরা কূলেই থাকে ৷
বর্ষা আসে জেলেদের রূপালী মাছ সাথেই করে
গাছে গাছে ফল, অন্যরকম সৌন্দর্যে মন ভরে !
পাটকাঠি হতে সোনা আঁশ ছাড়ায় বাংলার চাষী
খাদ্য দিয়ে যায় দুপুরে—রাখাল বধূ, মুখে হাসি ৷
বাড়ির উঠোনে জল,স্কুল বন্ধ-পড়াশোনা নাই
ইচ্ছে মতন ঘুরে বেড়াতাম নতুন জলে সবাই ৷
আমাদের রাখাল আনতো নানান বাজার করে
এসময় উৎসব চলতো মা-ঠাকুমা’র হাত ধরে ৷
ঘুরেছি নৌকায় সবাই মিলে মিশে একটুখানি
বর্ষাজলে নৌকায় বেড়ানো মজার,সেটা জানি !
বর্ষা যায় —আসে, বড় হই, মাছ ধরে দিন কাটে
নতুন জলে রাস্তায়,পুকুর পাড়ে, দীঘির ঘাটে ৷
বাবার শখের ভেসালে পাহারা দিয়েছি দু’জন
নৌকায় বসে চাঁদটা দেখেই কেটেছে কতক্ষণ ৷
মাছ ধরেছি জিয়ালায় দু’জনে মনের মতন
পাশের বাড়ির-বর্ষা,কিছু বলেছে-বুঝিনি তখন !
নতুন জলের প্রতীক্ষা করতাম সারা বছর ধরে
জল চলে যাওয়াতে মনটা যেতো দুঃখে ভরে ৷
গ্রীষ্ম আসে, বর্ষা আসে আবার বর্ষা যায় চলে
কত স্মৃতি,কত কথা মনে পড়ে এই নতুন জলে ৷
নতুন জল খেলা করে পুকুর-নদী,বিলে-ঝিলে
যখন বুঝেছি, তখন তো বর্ষা কথা দিয়েছিলে ৷
ধুয়ে মুছে যায় নতুন জলে ময়লা আছে যত
পৃথিবী পায় প্রাণ,শুধু থেকে যায় আমার ক্ষত !
বর্ষার নতুন জলে উথাল পাথাল করে ঢেউ
আমাকে শাপলা ফুল তুলে এনে দিত কেউ ৷
জল এসে ছড়িয়ে যায় বাড়ির আঙ্গিনা জুড়ে
ঠাকুমা’র রূপকথার জলপরী এখনো সুদূরে !
বর্ষা আগের মতোন নেই, সে এখন অন্য খানে?
কেমন আছে?কি করে?সেই খুব ভালো জানে ৷
আজ নতুন বর্ষার নতুন জলে,বর্ষার সনে-
বর্ষা এলেই রঙিন স্মৃতিগুলো পড়ে যায় মনে !
কবির চোখে সৃজন ঋতু , কত কি রচনা করে..
আমি বিরহী প্রেমিক তাই চিঠি লিখি বর্ষা তরে ৷
অনেকেরই বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলো হয় নষ্ট
অসহায় যারা এ বর্ষায় তাদের হয় বড় কষ্ট ৷
মায়াবী বর্ষার এক চোখে অশ্রু অন্য চোখে হাসি
এমন দিনে নকশি কাঁথা বুনতেন মা ও মাসি ৷
নতুন জলে বর্ষা এসেছে প্রকৃতি জানান দিলো
পুরনো নানারকম স্মৃতিগুলো তাই ফিরে এলো ৷
নানান রঙের স্মৃতিগুলো এলোমেলো পড়ে আছে
কিছু আমার কাছে আর কিছু আছে বর্ষার কাছে ৷
ভরা বর্ষার এই চাঁদ পূর্ণিমার জ্যোৎস্না রাতে
বর্ষাকে ভেবে ভেবে আমি নিদ্রাহীন নয়ন-পাতে ৷
বর্ষা আসে বর্ষা হাসে তবুও আমি একা মানুষ
হাওয়ায় ভাসে রঙ বেরঙের স্বপ্নের ফানুস ৷
সত্যি হলেও এসব এখন— গল্প রূপকথার
যাই হোক, রূপকথা এখন শুধু একা আমার !


