এখন আর কোনো অনুষ্ঠান বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু আমার ইচ্ছেতে তো আর সব হবার জো নেই । কারণ একটাই। তা হলো সামাজিক জীব হয়ে জন্মেছি যে!
সামাজিকতা জীবনের অনেক দায়ের মধ্যে এখন বোধহয় সবথেকে বড় দায়। সম্ভবত মুখ্য দায়। তাই গত রবিবার মাঘী সন্ধ্যায় সেই দায় চোকাতে কলিগের একমাত্র মেয়ের বিয়েতে যেতেই হলো। এবার ঠান্ডাটা বেশ পড়েছে।
চারিদিকে আলো আর আলো। বিভিন্ন খাবারের স্টল। কিসের যে স্টল নেই সেটাই খুঁজে পাওয়া মুস্কিল। একজন কলিগ এসে বলল,
— চলুন একটু সফট্ ড্রিঙ্কস নিই।
— তোমরা যাও । জানোই তো আমি সুগারের রোগী।
বেচারা কলিগের মুখ ব্যাজার হলো। আমি দেখে শুনে একটু দূরে চেয়ার নিয়ে বসলাম।
চারিদিকে হাই- হ্যালো, বাবাঃ কতদিন পর দেখলাম, তুমি এখন কোথায় থাকো, হ্যাঁ রে তোর মেয়ের বিয়ে হয়েছে, মাসিমা এখন ক্যামন আছেন, একদিন আসিস না আমার ফ্ল্যাটে বেশি দূর তো নয়, তোর ফোন নম্বরটা কিন্তু দিস থেকে শুরু করে কি দাদা কবে রিটায়ার করলেন, আর বলবেন না প্রেসার সুগার নিয়ে একবারে নাজেহাল হয়ে গেলাম, গিন্নি তো হাঁটুর ব্যথা নিয়ে আর আসতেই পারল না , পর্যন্ত শুধু সামাজিক ও পারিবারিক সুলুক সন্ধানের কোলাহল।
বেশ লাগছিল এইসব শুনতে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে শুনছিলাম মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগহীনতার জন্য অবচেতন হাহাকার। কবি বলেছিলেন বেঁধে বেঁধে থাকার কথা। সেই বাঁধন যে কবে আলগা হয়ে খুলে গেছে তা কেউ আমরা খেয়াল করতে পারিনি। তাই এতো খবরের দেওয়া নেওয়া।
বলতে দ্বিধা নেই, বিয়ে বাড়িতে সব মেয়েকেই,সে ষোলো থেকে ষাট সবাইকেই আমার চোখ সুন্দরী দ্যাখে। এক কলিগ বন্ধু বলেছিল,
— আসল রহস্যটা কি জানো?
চিরকালীন ক্যাবলা এবং আনাড়ী আমি বললাম, কি?
— এখন মেক আপের যুগ। এমন মেক আপ করে যে নেপালী নাককে সহজেই ইরানি নাক করে দেয়, চামড়ার কালোজিরের রঙ সাদা জিরে করে দেয়।
— বলো কি?
— তবে আর বলছি কি!
সে যাইহোক, আমার দেখতে বেশ লাগে। কিন্তু কিছুতেই ভেবে কূলকিনারা করতে পারি না এই প্রচণ্ড শীতে কোনো মেয়েই কোনো শীতের পোশাক এমন কি একটা চাদর পর্যন্ত নেয় নি। আহা রে, মেয়ে গুলোর যে ঠান্ডা লেগে যাবে! আমার দুঃশ্চিন্তা হয়। তবে বয়স্ক কয়েকজন মহিলা হালকা চাদর নিয়েছেন ঠিকই কিন্তু সেটাওএক দিকের কাঁধে লম্বা করে ফেলা।
বাড়ির বেশিরভাগ মেয়েদেরই দেখলাম তাদের শরীর জুড়ে সোনার গয়না ঝিলিক মারছে। হাতে , কানে,গলায় তো আছেই তার সঙ্গে বাজুবন্ধ,কোমরবিছেও আছে । এক কথায় শরীর জুড়ে সোনার গয়নার ঝিলিক।
সেই ঝিলিক যেন গয়না গুলোর মুক্তির নিঃশ্বাসের মতোই মনে হলো আমার কাছে। যেন গয়না গুলো বলতে চাইছে, দিনের পর দিন সিন্দুকে, ব্যাঙ্কের লকারে, বাড়ির আলমারির অন্ধকারে বদ্ধ হয়ে হয়ে আমাদের নাভিঃশ্বাস উঠে যায় গো!
ও কন্যে ভাগ্যিস তোর বিয়ে হয়েছিল তাই তো আমরা একটু আলো বাতাসের মুখ দেখলাম! কয়েকশ বছর ধরে কত কত বংশের কত জায়গার কত সিন্দুকের অন্ধকারে যে আমারা দিন কাটাই তুই তো জানিস নে মা। শুধু কি তাই ? কত কন্যের শরীর রাঙিয়ে হাত বদল হয়ে আরেক কন্যের শরীরের গন্ধ মাখি রে ! তোর মায়ের, তার শাশুড়ির, তস্য শাশুড়ির শরীরের গন্ধ যে আমাদের শরীরে লেপ্টে আছে তার হিসেব নেই। শুধু তাই নয় তোর শাশুড়ির শরীর ছুঁয়েও এখানে আছি। একদিন তুইও তো আবার তোর মেয়ে বা ছেলের বৌয়ের জিম্মায় আমাদের দিয়ে দিবি।
কন্যারে আমাদের নিজের কোনো স্থায়ী বাস হলো না। নিজের ঘর হলো না। শুধুই আঁধারে পড়ে থাকি এক সিন্দুক থেকে আরেক সিন্দুকে।
আমাদের দখল নেওয়ার জন্য কত গোপন ষড়যন্ত্র, কত মৃত্যু যে অবিরত ঘটে আসছে তার হিসেব কৈ ?
পৃথিবীর ইতিহাসে তোকে নিয়েও তো কত যুদ্ধ ঘটে গেছে, যাচ্ছে ভবিষ্যতেও যাবে।
তুই যে আমাদের সই।
ও মেয়ে তোরও কি নিজের কিছু আছে ? নিজের একান্ত আপন ঘর হয়েছে কখনো?
আমরা আভরণ, শরীর সাজাই।
তুই সংসার সাজাস ।
আমাদের মৃত্যু নেই, আকারের রূপান্তর আছে।
তুই চলে যাস একদিন। থাকে শুধু তোর রক্তের স্রোত।
তবুও আমরা তোর শরীরে লগ্ন হয়ে থাকি।
বিয়ে বাড়ির হৈ হুল্লোড়ে আমি শুধু সোনা ও মেয়ের কথাই শুনি।
শুনি বহমান এক অশ্রুত যন্ত্রণার আলাপন।
এ আলাপন চিরকালীন!


