গোল রসুন
কলকাতার এক নামকরা প্রাইভেট হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হিরন্ময় বোস সপ্তাহে একদিন রবিবার তার জন্মভূমি এই বনগাঁ শহরে চেম্বার করতে আসেন। সেদিন বনগাঁর বাটার মোড়ে হরিনাথ ম্যাডিক্যাল ঔষুধের দোকানে ভিড় উপচে পড়ে। আগে থেকেই নাম লেখাতে হয়। ওপারের বাংলাদেশ থেকে বিশেষ করে যশোরের রোগীরাও আসে। বনগাঁ হাসপাতালের রোগীদের মধ্যে বেশিরভাগই বাংলাদেশের রোগী। চিকিৎসা করার জন্য এপারে আসার প্রবনতা তাদের মধ্যে দিন দিন বাড়ছে। দেশ ভাগের পঞ্চাশ বছর পরও ওপারের লোকের কাছে বনগাঁ যেন তাদেরই দেশ।
বনগাঁর দূর্গাপূজো পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে যথেষ্ট নাম করা । এই পূজোর সময় আনন্দযজ্ঞে সামিল হতে ওপারের মানুষের ঢল নামে। সীমান্ত রক্ষীরাও এইসময় একটু ঢিলেঢালা হয়ে যায়। মানুষের মিলনমেলাকে কঠোর বেড়াজালে আটকাতে চায় না। তাই বলে নিজেদের কর্মে যে ফাঁকি দেয় তাও না। চিকিৎসার জন্য যারা আসে তাদের পাশপোর্ট ভিসা থাকে। কিন্তু গরীব গুর্বোদের তা থাকে না। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন বা ওপার থেকে করে আনা কোনো মেডিকেল রিপোর্ট দেখিয়ে সীমান্তরক্ষীদের একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মানুসারে তারা এপারে আসে ডাক্তার দেখাতে।
নিজের জন্মস্থান তার উপর এখনো ডাক্তার হিরন্ময় বোসের একানব্বই বছরের মা জীবিত। ভাই সন্ময় বনগাঁ মিউনিসিপ্যালিটির একজন অফিসার। সে তার পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেশের বাড়িতেই থাকে। পিতৃভূমি সন্ময়ের কাছে যেন এক স্বর্গীয় উদ্যান। হিরন্ময়েরও এই দেশের বাড়ির প্রতি কম টান নেই। সেই টানে এখানে এলেই যেন সে কলকাতার যানজট,ইট,কাঠ, পাথরের রাজ্য থেকে মুক্ত হয়ে গভীরভাবে,বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে। তার ছোটবেলার লীলাভূমি এই বনগাঁ শহর। অবশ্য তখন বনগাঁ শহর হয়ে ওঠে নি। তখন বনগাঁ বনগ্রাম নামেই পরিচিত ছিল সবার কাছে। বনগ্রামের বুক চিরে বয়ে গেছে ইছামতি নদী। চারিদিকে গাছপালায় , বড় বড় ফলের বাগানের ঘন ছায়াময়, মায়াময় এক স্বপ্নের জগত। যে জগত একসময় বাংলা সাহিত্যের স্বনামধন্য সাহিত্যিক বিভূতিভূষণের চারণভূমি ছিল। অনেকেই তখন বিভূতিভূষণের জন্যই বনগ্রামের বা বনগাঁর নাম জানতে পেরেছিল। এছাড়াও নীল বিদ্রোহের সর্বজন শ্রদ্ধেয় দীনবন্ধু মিত্র থেকে প্রথিতযশা সাহিত্যিক শংকরেরও জন্মস্থান এই বনগ্রাম।
দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বর্তমানের বাংলাদেশ এই ভারতবর্ষেরই অঙ্গ ছিল। ছিল না কোনো কাঁটাতারের বেড়া। এপার ওপার বলে কোনো ধারণাই ছিল না। এক অখন্ড বাংলাতে তখন হিন্দু মুসলমান সবাই এক দেশের বাসিন্দা।ভাই ভাই। দেশ ভাগ হয়ে গেছে আজ প্রায় পঞ্চাশ বছর হয়ে গেছে।
(দুই)
ডাক্তার হিরন্ময় বোসের নির্দেশ ছিল বা তিনি একটা নিয়ম করেছিলেন যে আগে তিনি বাংলাদেশের রোগী দেখবেন তারপর স্থানীয় রোগীদের দেখবেন। কারণ তিনি জানেন যে ঐসব রোগীদের ডাক্তার দেখানোর পর সীমান্ত পেরিয়ে বাড়ি যেতে যেতে রাত হয়ে যায়। শত হলেও বিদেশ বলে কথা!
আগের দিন অর্থাৎ শনিবার রাতেই হিরন্ময় বনগাঁ চলে আসেন এবং রবিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোগী দেখে সেদিন রাতে বাড়িতেই থাকেন এবং সোমবার ভোরবেলা বেরিয়ে যান কলকাতার উদ্দেশে।
রোগী দেখা শুরু হয়ে গেছে। এক, দুই, তিন করে চার নম্বরে ডাক পড়ল গোলাম রসুলের। প্রায় সত্তর বছর বয়সী এক ভদ্রলোক, হ্যাঁ, যাই, বলে চেম্বারের ভিতরে ঢুকল।
ডাক্তার হিরন্ময় বোস টেবিলের উপর একটা কাগজে কিসব যেন লিখছিলেন।
— নমস্কার,ডাক্তার বাবু,
এই কথা বলেই গোলাম রসুল ডাক্তারের টেবিলের পাশে রোগীর জন্য রাখা একটা কাঠের টুলের দিকে এগিয়ে গেল। ডাক্তারবাবু চশমার উপর দিয়ে রোগীর দিকে তাকিয়ে কাঠের টুলটা হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন,
— বসুন। কি কষ্ট হচ্ছে বলুন।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গোলাম রসুল বলল,
— অনেক কষ্ট ছিল কিন্তু এখন আর কোনো কষ্ট নেই।
রোগীর কথা শুনে অবাক হয়ে ডাক্তারবাবু রোগীর দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকল। রোগীর ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসির রেখা। রোগীর ঠোঁটে চলকে পড়া মৃদু হাসির রেখা দেখে ডাক্তারবাবু একটু বেসামাল হয়ে পড়েন। তিনি আরো গভীরভাবে রোগীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। ডাক্তারবাবুর এই ভাবে তাকিয়ে থাকা দেখে গোলাম রসুল বলল,
— ডাক্তারবাবু , যদি আমার খুব ভুল না হয়, আপনি হিরণ না?
এই কথা শুনে ডাক্তার হিরন্ময় বোস চমকে ওঠেন। এই নামে তো তার ছোটবেলার একজন প্রাণের বন্ধুই ডাকত! তবে কি ?
হ্যাঁ,তাই তো !
ডাক্তার হিরন্ময় লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে বললেন, আরে আমার গোল রসুন না?
— যাক তবে চিনতে পেরেছিস তুই?
— চিনব না? বলিস কি? তুই যে আমার গোল রসুন।
— বাজে কথা রাখ সত্যি যদি চিনতে পারতিস তবে আমাকে প্রথমবার দেখেই চিনতিস।
— হ্যাঁ কথাটা ঠিক। কিন্তু তুই যে দাড়ি টুপি পড়ে একেবারে মৌলবী সেজেছিস তাই চিনতে একটু দেরি হলো।
— হ্যাঁ, যা বলেছিস। তোরও তো মাথায় টাক পড়ে এমন হয়েছে যে মনে হচ্ছে মাথায় পূর্ণিমার চাঁদ নিয়ে বসে আছিস।
এই কথা শুনে হিরন্ময় হো হো করে হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে বলল,
— যাক ওসব কথা। ক’দিনের জন্য ভারতে এসেছিস? শুধুই ডাক্তার দেখাতে? কোথায় উঠেছিস শুনি?
— ধুর,ডাক্তার দেখাতে থোড়াই এসেছি। কলকাতায় কিছু কাজ আছে। দশ দিনের ভিসা। গতকাল রাতে এসেছি। ট বাজারের কাছে একটা হোটেলে উঠেছি। ঐ হোটেলে রাতে খাবার টেবিলে দুজন ভদ্রলোকের সাথে পরিচয় হলো।ওরা এসেছে যশোর শহর থেকে হৃদয়ের অসুখ নিয়ে। ওদের কাছেই তোর কথা শুনলাম। শুনেই ওদের কাছ থেকে তোর চেম্বারের ঠিকানা নিলাম। তাই রুগী সেজে তোর কাছে আসা।
এক নিঃশ্বাসে গোলাম রসুল কথা গুলো বলল।
সব শুনে হিরন্ময় বলল, কলকাতায় কোথায় উঠবি?
— কেনো হোটেলে।
— শোন গোল রসুন তুই এখনই হোটেলে ফিরে যা। ওখানে গিয়ে হোটেল ছেড়ে দিয়ে তোর লাগেজ নিয়ে এখানে চলে আয়। তারপর দুপুরে আমার সাথে আমার বাড়ি যাবি। কালকে দুজনে একসাথে আমার গাড়িতে কলকাতায় যাবো। হোটেলে থাকার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। কলকাতায় আমার বাড়িতেই থাকবি। আচ্ছা একটু দাঁড়া ।
বলেই হিরন্ময় বেল টিপল। একটি যুবক ছেলে এসে বলল,
— স্যার..
– শোনো, এই ভদ্রলোক আমার বন্ধু। উনি ট বাজারের কাছে একটা হোটেলে উঠেছেন। তুমি ওনার সাথে গিয়ে ওনার লাগেজ পত্র নিয়ে আমার বাড়িতে পৌঁছে দাও। আর হোটেল থেকে একটা টোটো ধরে ওনাকে আবার এই চেম্বারে পাঠিয়ে দিও এবং চেম্বারে আমার রেস্ট রুমটা খুলে ওনাকে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দিও।
— ঠিক আছে স্যার।
যুবকটি উত্তর দিল এবং একটু আড় চোখে গোলাম রসুলের দিকে তাকালো।
হিরণের কথা শুনে গোলাম রসুল কি যেন বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু হিরন্ময় তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
— কোনো কথা বলবি না আর।
গোলাম রসুল থেমে যায়। তার দুই চোখের পাতা কি ভিজে উঠছে? সে বুঝতে পারছে না।
(তিন)
হিরণের গাড়ি করে ভোর পাঁচটার মধ্যে গোলাম রসুল কলকাতার দিকে রওনা দিল। পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন করেই চলেছে তারা। সেসব দিনের কথা মনে হলে যেমন আনন্দে মনটা ভরে উঠছিল তেমনি ভারাক্রান্তও হয়ে পড়ছিল ছোটোবেলার দুই বন্ধুর মন। মনে পড়ে একই ক্লাসে পড়ত তারা দুজনে। হিরণের বাড়ি ছিল খলসেকোটায় আর গোলাম রসুলের বাড়ি ছিল ইছামতি নদীর ওপারে মতিগঞ্জে। হিরন্ময়কে গোলাম রসুল হিরণ বলে ডাকত আর হিরণ ওকে বলেছিল,
— তোরা মুসলমানরা খুব রসুন খাস আর তোর চেহারাটা বেশ গোলগাল নাদুসনুদুস। তাই তোকে আমি গোল রসুন বলে ডাকব কিন্তু।
— ডাকিস।
হেসে উত্তর দিয়েছিল গোলাম রসুল। সেই থেকে হিরন্ময় একজনের কাছে হয়ে গেল হিরণ আর গোলাম রসুল একজনের কাছেই সারা জীবনের মতো হয়ে রয়েছে গোল রসুন।
গ্রীষ্মের দুপুরে বাগানে বাগানে ঘুরে বিভিন্ন ফলমূল চুরি করার জুটি ছিল তারা দুজনেই। বাড়িতে না জানিয়েই কতদিন ইছামতিতে স্নান করা, কখনো কখনো সাইকেল নিয়ে গোপাল নগর,পাল্লা, ব্যারাকপুর ঘাটে চলে যাওয়া, প্রকৃতির পেটের ভিতরে ঢুকে গিয়ে সেখানকার মনিমানিক্যকে শৈশবের বুকপকেটে ভর্তি করার নেশায় দুই বন্ধুর আত্মা এক হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সময়ের ওলোট পালোটে , রাজনীতির নোংরা ও ঘৃন্য কূটকৌশলের অভিশাপ নেমে এসেছে পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষের উপর বারবার।
আজও মনে পড়ে স্বাধীনতার প্রাক্কালের সেইসব ভয়ানক দিনগুলোর কথা। এক ঘোরতম অবিশ্বাসের মানসিকতা খুব সুকৌশলে রাজনৈতিক নেতারা এবং বৃটিশ সরকার তৈরি করে দিতে পেরছিল হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে। বেশিরভাগ মানুষই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে এই উপমহাদেশে একই ভূখন্ডে দুই ধর্মের মানুষ একসাথে বাস করতে পারে না। হিন্দুর জন্য এবং মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র হওয়া উচিত। কোনোদিনই এই কূটকৌশলীরা বাঙলা ভাষা ও বাঙালি সত্তাকে, বাংলার সংস্কৃতিকে এক অখন্ড সত্তা হিসাবে তাদের বিবেচনায় আনে নি। ধর্মের সুড়সুড়ি যে খুব কার্যকরী তা বেশ ভালোভাবেই তারা বুঝিছিল এবং প্রয়োগ করেছিল। এর ফলেই ১৯৪৭ সালের আগে দেশভাগের কথাটাই তাদের মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল এবং তারপর স্বাধীনতা। ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীনতা পেল এবং ১৫ই আগষ্ট ভারতবর্ষ। বাংলাকে কালির আঁচড়ে দুভাগে ভাগ করে দিল। রেডিওতে এক লাইনের বার্তা। আর তার ফলেই ভাগ হল দেশ, মাটি, মাঠের খেলা, স্কুলের শাসন, ছেলেবেলার ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্তগুলো। শৈশবের খেলার সঙ্গী চলে গেল ওপার বাংলায়। এ কেমন স্বাধীনতা?
কিন্তু দুঃখের বিষয় বনগাঁ,নদীয়া, মালদা, মুর্শিদাবাদের বেশ কিছু অংশে সেই স্বাধীনতা এলো না। এক ঘোরতম দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা এইসব অঞ্চলের মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। ১৫ই আগষ্ট যখন সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে ভারতের পতাকা উড়ছে তখন বনগাঁতে উড়ছে পাকিস্তানের পতাকা। বিক্ষোভ আন্দোলনের ঢেউ বয়ে গেল চারিদিকে।
তখনই গোলাম রসুল আর হিরন্ময়রা জানতে পেরেছিল যে নীলবিদ্রোহের ঘাঁটি এই নদীয়া জেলা ছিল বলে বৃটিশ শাসকদের খুব একটা স্বস্তি ছিল না। তৎকালীন সময়ে পরাধীন ভারতে বনগাঁয় নীল বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে ১৮৬২ সালের শেষের দিকে ম্যাজিস্ট্রেট মি. হার্সেল এবং জেলা প্রশাসক অ্যাসলে ইডেন বনগাঁয় আসেন এবং নীল চাষিদের শান্ত করার জন্য বনগাঁকে মহকুমা ঘোষণা করেন। তখনও বনগাঁ এবং বর্তমানের উত্তর চব্বিশ পরগনার একটা বড়ো অংশই ছিল নদীয়া জেলার মধ্যে। ১৮৮২ সালে নদিয়া জেলা থেকে যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয় বনগাঁ মহকুমা।
সারা দেশ যখন তথাকথিত স্বাধীনতার জন্য উল্লাস করছে তখন বনগাঁ বাসীর খাওয়া ঘুম উধাও হয়ে গেছে। তখনও বনগাঁ মহকুমার প্রশাসক পাকিস্তান পন্থী সৈয়েদ আহমদ চৌধুরী এবং পাকিস্তানের পতাকা উদ্ধত ভাবে পতপত করে উড়ছে এবং জানান দিচ্ছে এটা পাকিস্তান।
হিরন্ময় আর গোলাম রসুলদের মতো হাজার হাজার পরিবার। প্রত্যেক পরিবারই তাদের বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে রেখেছে আর কান পেতে রয়েছে রেডিওর খবরে। কখন কি হয়! যেকোনো একপক্ষ থেকে যাবে বনগাঁ মহাকুমাতেই অর্থাৎ এই দিখন্ডিত বাংলা তথা ভারতবর্ষে । নয়তো সবকিছু ফেলে, ,বেড়ে ওঠার ইতিহাসকে , এখানকার মাটির গন্ধ, মানুষের সাথে মানুষের আত্মিক সম্পর্ককে ইতিহাসের পাতায় জমা রেখে এক বুক যন্ত্রণার স্মৃতিকে পাঁজরের কোনোয় ঝুলিয়ে নিয়ে চলে যেতে হবে পাকিস্তানে।
সেই অন্ধকার দিনগুলিতে হিরন্ময় আর গোলাম রসুল দুজনেই ইছামতির পাড়ে গিয়ে বসে থাকত নিঃশ্চুপ হয়ে।অথচ দুজনের গভীরে তখন নীরবে যে কত কথা হতো তার হিসাব ইতিহাসের পাতায় কেউ লিখে রাখে নি।
হঠাৎই নীরবতা ভেঙে গোলাম বলে,
— হিরণ আমাদের যদি চলে যেতে হয় তুই যোগাযোগ রাখবি তো আমার সাথে?
এই প্রশ্ন শুনে হিরন্ময় অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— রসুন আমারও তো একই প্রশ্ন।
তারপর দুজনেই চুপচাপ। তাদের মনের নীরব কথামালার নীরব স্রোত হয়তো ইছামতির শরীরকে আরো বেশি ভারী করে তুলছে। তাই তার গতি যেন শ্লথ হয়ে আসছে। কোনোরকমে সে মানুষের কান্না গুলোকে নিয়ে ধীরে ধীরে বয়ে নিয়ে গিয়ে মহাকালের স্রোতের সাথে মিশিয়ে দেবে।
(চার)
প্রবল গণআন্দোলনের জেরে বৃটিশ সরকার বুঝতে পেরেছিল ভাগাভাগির অঙ্কটা ঠিকঠাক কষতে পারে নি তারা। তাই সান্ধ্য টেবিলে এই গরমের দেশে বিয়ার আর হুইস্কির ঘোরে ম্যাপের উপর দেশভাগের কালির আঁচড়টাকে আবার কাটাকুটি করতে বসে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৭ই আগষ্ট সন্ধ্যায় রেডিওতে ঘোষণা করা হলো বনগাঁ মহাকুমা পশ্চিমবঙ্গেই থাকবে। এই ঘোষণায় একপপক্ষের উল্লাস এবং অন্য পক্ষের স্বপ্ন ভাঙার শব্দহীন শব্দের মিছিল।
খবরটা শুনেই হিরন্ময় দৌড়ে চলে যায় তার প্রাণের বন্ধু গোল রসুনের বাড়ি। বারান্দায় তাদের পরিবারের সবাই বসে আছে এক গভীর নিথর চোখের দৃষ্টি ছড়িয়ে। হিরন্ময় আস্তে আস্তে গোলামর পাশে গিয়ে বসে তার কাঁধে হাত রাখে।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না গোলাম। হিরণ্ময়কে জড়িয়ে তার বুকে মাথা রেখে, ফিসফিসিয়ে বলল,
— এর নাম স্বাধীনতা। ভাগাভাগিটার কথা কেউ ভাবল না।
হিরণ্ময়ের মুখে কোনো উত্তর ছিল না সেদিন।
বনগাঁ মহকুমা প্রশাসকের দফতরে ১৯৪৭ সালের ১৮ আগস্ট বেলা ১১ টা ৪৫ মিনিটে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে ভারতীয় তেরঙ্গা পতাকা তোলা হয়। সেই সময় মহকুমা প্রশাসক হন নৃপেন্দ্র মোহন চক্রবর্তী। ঐ অনুষ্ঠানে সেদিন বনগাঁর অনেক মানুষই গিয়েছিল। কিন্তু গোলাম বা হিরণ যায়নি। শুধু তাই নয় তাদের দুই বাড়ির কেউই যায় নি।
দুদিন পরেই হিরন্ময় তার গোল রসুনের পরিবারকে একেবারে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে এসে সেদিন রাতে আর কিছু খেতে পারে নি, ঘুম তো কয়েক দিনের জন্য চোখ থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল।
তারপর দিনের পিঠে দিন জমা হয়েছে। স্মৃতির উপর কালের নিয়মে ধূলোর আস্তরণও বেশ পুরু হয়ে উঠেছিল। আজ সব ধূলো পরিষ্কার করে দিল তার গোল রসুন।
আটদিন হিরন্ময়ের বাড়িতে থেকে, কলকাতার কাজ শেষ করে গোল রসুন ফিরে যাচ্ছে তার দেশ নয়, তার ঠিকানায়।
হিরণ্ময় আজও তার সব কাজ ফেলে তাকে পৌঁছে দিতে এসেছে সেই পঞ্চাশ বছর আগের মতোই।
ঐ যে ওপারে গোল রসুন হেঁটে যাচ্ছে , হেঁটেই যাচ্ছে সীমান্তের বেড়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে।


