বুধবার, জুলাই ১, ২০২৬

বিজ্ঞান না কি,আমলাতন্ত্র ? স্পারসোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

একটি দেশের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেবল স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে না। দুর্যোগের আগাম সতর্কতা, কৃষি উৎপাদনের মানচিত্র, নদীভাঙন পর্যবেক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণ, সীমান্ত নজরদারি, নগর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে জাতীয় নিরাপত্তার নানা ক্ষেত্রে এর অবদান অপরিহার্য। তাই এমন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কাদের হাতে থাকবে, সেটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত ভবিষ্যতেরও প্রশ্ন।
বাংলাদেশের বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (SPARRSO) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মহাকাশ প্রযুক্তিকে জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি কতটা গবেষণাকেন্দ্রিক এবং কতটা প্রশাসনিক কাঠামোয় আবদ্ধ, সে প্রশ্ন বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্বের সফল মহাকাশ সংস্থাগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। ভারতের Indian Space Research Organisation, যুক্তরাষ্ট্রের NASA, ইউরোপের European Space Agency কিংবা চীনের China National Space Administration-এ প্রযুক্তিগত নেতৃত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। গবেষণাগারের বাস্তব অভিজ্ঞতা, প্রকৌশল দক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক কাজের ভিত্তিতেই নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়।
ভারতের Chandrayaan-3 Moon Landing শুধু একটি সফল অভিযান ছিল না; এটি দেখিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল এবং বিজ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব মিললে সীমিত বাজেটেও অসাধারণ সাফল্য অর্জন সম্ভব।
বাংলাদেশেও মেধার অভাব নেই। দেশের বহু প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মহাকাশ-প্রযুক্তি প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রশ্ন হলো, সেই দক্ষতা দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কাজে লাগাতে পারছে?
অনেক নীতি বিশ্লেষকের মতে, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক দক্ষতা প্রয়োজন হলেও গবেষণার দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ নেতৃত্ব অপরিহার্য। কারণ মহাকাশ গবেষণা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে জটিল প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের দক্ষতা বাজেট, জনবল, নীতি বাস্তবায়ন এবং সমন্বয়ের ক্ষেত্রে অপরিহার্য। কিন্তু গবেষণাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বের প্রশ্নটি ভিন্ন। বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশই এই দুই দায়িত্বের মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখে, যেখানে প্রশাসন ও বিজ্ঞান একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশ প্রতিবছর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য সরকারি বিনিয়োগ করে। নাগরিকদের প্রত্যাশা, এই অর্থের প্রতিফলন গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে দৃশ্যমান হবে। সে কারণে স্পারসোর মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মক্ষমতা, গবেষণার ফলাফল এবং নেতৃত্বের কাঠামো নিয়ে জনপরিসরে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।
এখন প্রয়োজন ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিতর্ক নয়, নীতিগত সংস্কার। নেতৃত্বে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ, গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ এবং তরুণ বিজ্ঞানীদের জন্য বাস্তব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে স্পারসো আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মহাকাশ গবেষণায় কোনো শর্টকাট নেই। এখানে সফলতা আসে বছরের পর বছর গবেষণা, দক্ষতা, পরিকল্পনা এবং সঠিক নেতৃত্বের সমন্বয়ে। বাংলাদেশেরও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্ধারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে গড়ে ওঠে। আর প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই দেশ কতটা বিজ্ঞানকে নেতৃত্ব দিতে পারে, নাকি বিজ্ঞানকে শুধু প্রশাসনের একটি দপ্তর হিসেবে দেখে।

লেখক পরিচিতি

পংকজ পাল
পংকজ পাল
তরুণ গল্পকার ও কবির জন্ম ১৫ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলায় ৷ বি.এস.সি (অনার্স), এম.এস.সি ; এল.এল.বি; শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন ৷ তার প্রকাশিত একক গ্রন্থ দুইটি ৷ কাব্যগ্রন্থ-'নিঃসঙ্গতার মেঘমালা' ও গল্পগ্রন্থ-'আকাশের নীল রং' এবং যৌথগ্রন্থ-চল্লিশের বেশি ৷ জেলার উদীচী, প্রগতি লেখক সংঘ, খেলাঘর, প্রথম আলো বন্ধুসভা, উত্তরণসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন ৷ বর্তমানে সম্পাদনা করছেন-'পলিমাটি','অন্তরঙ্গ 'ও 'চিন্ময়ী'৷ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে জেলা পর্যায়ে আয়োজিত ৩১তম বিজ্ঞান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সপ্তাহ ২০০৯-১০ খ্রিস্টাব্দে সিনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান, কবিতা সংসদ সাহিত্য পদক-২০১৪, বাংলাদেশের লেখক-'লেখক ডিরেক্টরি'র অন্তর্ভূক্ত-২০১৪, কাব্য চন্দ্রিকা একাডেমি পদক-২০১৭, লিখিয়ে কাব্য সাহিত্য সম্মাননা-২০১৮, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন স্মারক-২০১৮, কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি স্মারক ও সম্মাননা-২০২২ পেয়েছেন ৷ মেইল : pankajprenoy@gmail.com/ paulpankaj864@gmail.com

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা