বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২৬

বিজয়া-র জয় হোক || অজয় রায়

মহাশক্তি মহামায়ার আগমন প্রতীক্ষায় আমরা উন্মুখ, শরতের এই স্নিগ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশ বাৎসল্যরসে আপ্লুত হয়ে তাঁকে বরণ করে নিতে চিত্ত আমাদের প্রস্তুত। দক্ষিণায়নের এই মুহুর্তে নিদ্রামগ্ন দেবী। ভক্তের আকুল আহ্বানে অকালে জেগে উঠেছেন। সনাতন ধর্মে বিধিবদ্ধ বিধান অনুযায়ী বসন্তকালে উত্তরায়নের সময় সম্মিলিত শক্তির আধার মা দুর্গা বাসন্তী দেবীরূপে ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে ধরাধামে পূজিত হতেন। আর্য-কষিগণের উর্বর মস্তিক তাদের ত্রিকালজ্ঞ হিসাবে গুণান্বিত করেছে। তাঁরা ছিলেন ভবিষ্যৎ স্রষ্টা। তাঁদের প্রখর মননশীলতা দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন ভক্তের চিত্তক্ষেত্রে বছরে একবার যদি মহাশক্তি মা দুর্গার আবির্ভাব ঘটে, সময়ের দীর্ঘ ব্যবধানে তাদের মনোজগত তমসাবৃত হয়ে ভক্তিমার্গ, জ্ঞানমার্গ ও হৃদয় মার্গ ইন্দ্রিয়ের বিচরণ ক্ষেত্রে রূপান্তরিত হবে। চিত্ত বিক্ষেপ দ্বারা আক্রান্ত মানবিক মূল্যবোধ সভ্যতার সংকট সৃষ্টি করবে। শুধু তাই নয় মানুষের আত্মিক উন্নতি বাধাগ্রস্থ। হবে। পরমার্থ লাভের পথে অন্তরায় সৃষ্টি হবে। এই ধারণা থেকেই আর্য ঋষিগণ ছয় মাসের ব্যবধানে শরতের শান্ত-সৌম্য-ধ্যানী প্রাকৃতিক পরিবেশে পুনরায় মহাশক্তি দেবী ভগবতীকে আরাধনার সুযোগ সৃষ্টি করতে আয়োজন করেছেন শারদোৎসবের। দক্ষিণায়নের সময় অকাল বোধনের মাধ্যমে কৈলাস থেকে স্নেহময়ী কন্যা উমা রূপে গিরিরাজপুরে তাঁকে আবাহন করেছেন।

আর্য-ঋষিদের প্রতিটি কর্ম আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে সম্পর্কিত ও সত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। দুর্গাপূজার নিগুঢ় তত্ত্ব এবং প্রতীক প্রতিমা কল্পনার ভাব মাহাত্ম্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে জগতে বিকশিত শক্তির বিভিন্ন রূপের একীভূত প্রকাশ মায়ের বাহ্যিক অন্যারে। দশভূজা দশদিক অর্থাৎ দশ ইন্দ্রিয় থেকে আমাদের রক্ষা করতে প্রবৃত্ত। আমাদের মনোজগতে “সু” এর পাশাপাশি “কু” বিচরণ করছে। সেই পশু শক্তির প্রতীক মহিষাসুরকে পাশে আবদ্ধ করে, তার বক্ষস্থলে সংহারকারী দেবতা দেবাদিদেব মহাদেবের অস্ত্র তীক্ষ্ণ ত্রিশূল বিদ্ধ করে কেশ ধরে রেখেছেন। ইন্দ্রিয়গনের রাজা মনঃ সিংহ তাঁর বাহন, ডান দিকে সর্ব সিদ্ধিদাতা জ্ঞানগুরু গনপতি, পাশে ধম্মৈশ্বর্য প্রদায়িনী লক্ষ্মী দেবী। বামে বীর বিক্রম দেব সেনাপতি কার্তিকেয় এবং বিকশিত জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত বাগ দেবী। অর্থাৎ সকল দেবশক্তির সংমিশ্রনে এক মহাশক্তির বহিঃপ্রকাশ রূপক প্রতিমার মাধ্যমে। তাহলে দুর্গা পূজার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য এ রকম দাঁড়ায় ভক্তের মনোজগতের পশুশক্তিকে সাধনালব্ধ জ্ঞান দ্বারা পরাভূত করে মানবিক গুণের পুনর্বাসন কল্পে প্রায়োগিক সৰ্ব্ব প্রকার শক্তির আরাধনা। অর্থাৎ তমোগুন দ্বারা পরিবেষ্টিত ভক্ত হৃদয়কে সৰ্ব্ব শক্তি প্রয়োগ করে রিপুর শৃংখল মুক্ত সত্ত্বের প্রবেশ দ্বারে পৌঁছে দেওয়া।

কিন্তু আর্য-ঋষিগণ যে জ্ঞানে মা দুর্গার উপাসনার বিধান ধর্ম শাস্ত্রে সন্নিবেশিত করেছিলেন, সেই আধ্যাত্মিক দর্শন আমরা আত্নস্থ করতে পারি নাই। আমরা মহাশক্তির আরাধনার অন্তয়ঃস্থ উদ্দেশ্য বিস্তৃত হয়ে বাহ্যিক আনন্দ উৎসবে প্রবৃত্ত হই। সেখানে ভক্তির বদলে মহা আড়ম্বর, অহমিকা, ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। বোধন থেকে শুরু করে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীতে মহা আয়োজন, আনুষ্ঠানিকতা দৃশ্যমান। ভক্তিহীন দম্ভের বহিঃপ্রকাশ। দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাঝখান দিয়ে মূল উদ্দেশ্য বিসর্জিত হয়ে আবার নিরানন্দে নিমজ্জিত হয়ে যাই। বিজয়ার আনন্দ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চিত্তশুদ্ধির আয়োজন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়ে যায়।

দুর্গা পূজার দুটি পর্ব (১) আগমন ও (২) বিসর্জন। সংসারবদ্ধ জীব যখন রিপুর তাড়নায় যন্ত্রণাকাতর, ভোগ-সুখে তৃপ্তি পায়না, অশান্তির দাবানলে দগ্ধ অন্তর, তখন বোধোদয় হয়। অন্তরান্তায় সত্যানুসন্ধানের অদম্য স্পৃহা তাকে ব্যাকুল করে তোলে। ঠিক সেই সময়ই চিত্তজুড়ে মহাশক্তির বোধন মন্ত্র উচ্চারিত হয়। সাধনায় নিমগ্ন ভক্ত সপ্তমীতে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্র তৈরী করে, অষ্টমীতে অন্তরে অধিষ্ঠিত মহাশক্তির সাথে অশুভ অসুরশক্তি মহারণ শুরু হয়ে যায় ৷ ভক্তি অস্ত্র নিক্ষেপ করে ত্রিতাপ জ্বালায় জর্জরিত জীব তামসিক অবস্থা থেকে রাজসিকভাবে উন্নীত হয় এবং অব্যাহত সংগ্রামে অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে রজঃ থেকে সত্ত্বগুনে উত্তরণ ঘটে। নবমী বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত ও উল্লাসিত। ভক্তের চিদাকাশে আলোকোজ্জ্বল, জ্যোর্তিময়ী মহাদেবী সত্যের প্রতিভূ হয়ে আলো বিতরণ করেন। মহাশক্তির আশীর্বাদপুষ্ট ভক্ত আরাধনায় সিদ্ধি লাভ করে শুদ্ধ আত্মায় চেতনারূপী বিবেককে প্রাণবন্ত করে তুলেন। সত্যানুসন্ধান ব্রত সাধকেরা সফল হয়।
দশমীতে বিসর্জন বা বিজয়া। এখানে বিসর্জন অর্থ হলো পরাভূত অধর্মকে ত্যাগ করা। তমো ও রজঃ গুণের বিসর্জন, বাহ্যিক অনুষ্ঠানের সমাপন। বিজয়া রিপুর কুৎসিত ভয়ংকর বলয় থেকে মনুষ্যত্বের সত্যকে ছিনিয়ে আনার জয়। তাই বিজয়া বিষাদের দিন নয় আনন্দের। আত্মশ্রাঘা থেকে পরিত্রাণের জন্য এবং সত্য প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে সাধক মহাদেবীকে আবাহন করেছিলেন, সেই অভীষ্ট লক্ষ্য বিজয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। মা আমাদের অন্তরের ধন অন্তরে আছেন। তাঁর প্রাণভরা আশীর্বাদে আমরা শক্তি সঞ্চয় করে পাশবিক শক্তির বিরুদ্ধে জয়লাভ করি। মেঘমুক্ত মনোভূমি মঙ্গলদীপের স্নিগ্ধ প্রভায় আলো ঝলমল। তাই বিজয়া অসত্যের বিসর্জন, সত্য প্রতিষ্ঠার দিন। যারা বিসর্জনকে বিষাদ বলে মনে করেন, জলে নিম্ন মৃতমূর্তির পানে তাকিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন, মন্দিরে মূর্তি নাই ফাঁকা, ঢাকের শব্দ থেমে গেছে-নিরব প্রকৃতি, সব আয়োজনের পরিসমাপ্তি, উৎসব শেষ আনন্দও শেষ, উৎসব চলাকালীন সময়ে দশমী ফিরে না আসুক এই যেখানে মনের প্রার্থনা, সেখানে মায়ের অর্চনা বৃথা। অর্থ চিত্তের অহংকারে আমরা আড়ম্বর পছন্দ করি। দুর্গা তত্ত্বের অন্তঃস্তদর্শন ধারণ না করে বাহ্য সৌন্দর্যের উপাসক হয়ে মায়ের নামে কামনার অর্চনা করি। উৎসবের কয়দিন বাহ্য আমোদ প্রমোদে লিপ্ত হই। দশমীতে বিষর্জনের মধ্য দিয়ে তমোগুনাশ্রিত উপাসনার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে বিষাদের বিষকুম্ভ মাথায় নিয়ে গৃহে ফিরে আসি।

বিজয়ার আনন্দ চৈতন্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না। তাই আজকের শারদোৎসবে আমরা ভ্রান্তি মোচনে উদ্বুদ্ধ হব। চিদাকাশে সমাচ্ছন্ন অন্ধকার দূর করতে মহাশক্তি মহামায়ার আরাধনায় আত্মনিবেদন করবো। বাহ্য সৌন্দর্যের উপাসনা নয়, আনন্দের স্থলে নিরানন্দের পূজা নয়, এই কলিষিত অন্তরান্তায় বোধন থেকে বিজয়া পর্যন্ত ভক্তিযুক্ত চিত্তে তাঁকে হৃদয়ে ধারণ করে চিত্ত থেকে আবর্জনার স্তূপ অপসারণ অন্তে আমরা সত্যে প্রতিষ্ঠিত হব। বিসর্জনের আয়োজন সমাপ্ত করে আমরা বিজয়ার আনন্দোৎসবে মেতে উঠবো। মা বিজয়াকে হৃদয়মন্দিরে অধিষ্ঠিত করে সত্য সুন্দরের জয়গান করবো। হিংসা, দ্বেষ, ইর্ষা, স্বার্থপরতা, কুটনীতি, কাম, ক্রোধ, লোভ, দর্প, অহংকার প্রভৃতি পশুবৃত্তিকে সলিল সমাধি দেবো। পরস্পর পরস্পরকে প্রেমালিঙ্গনে আবদ্ধ করে কন্ঠ ভরে উচ্চারণ করবো জয় সত্য সুন্দরের জয়, জয় মা বিজয়ার জয় ।

“ওঁ নমন্তে ভুবনেশানি নমস্তে প্রনবাত্মকে। সৰ্ব্ব বেদান্ত সংসিদ্ধে নমঃ হ্নীঙ্কার মূর্ত্তয়ে”।

লেখক পরিচিতি

অজয় কুমার রায়
অজয় কুমার রায়
কবি গল্পকার ও প্রাবন্ধিক অজয় কুমার রায় মানিকগঞ্জ জেলায় ঘিওর উপজেলার নারচি গ্রামে ১৯৪৮ সালের ৫ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-প্রয়াত অক্ষয় কুমার রায়,মাতা-দিভা রায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি রাজবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে ২০০৫ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা,সাময়িকীতে ও যৌথ গ্রন্থে কবিতা,গল্প,নাটক প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর অসংখ্য ফাইলবন্দী লেখা থেকে প্রথম গল্পগ্রস্থ ‘শতাব্দীর ক্ষুধা’ একুশে বইমেলা‘১৫ তে প্রকাশ হয়েছে। পরবর্তী বছর একক কাব্যগ্রন্থ 'রংধনু' প্রকাশিত হয়েছ ৷ তিনি অন্তরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ৷ তিনি শিল্প সাহিত্য ও মননের অনলাইন মাসিক'পলিমাটি'র উপদেষ্টা সম্পাদক ৷ এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। বিভিন্ন সংগঠন হতে বহু সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন ।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা