রবিবার, মে ২৪, ২০২৬

নববর্ষ আমাদের আজন্ম উত্তরাধিকার

এম আর লিটন

বাংলা নববর্ষ কারও অনুমতির ধার ধারে না। আপনি উৎসব পালন করুন আর না-ই করুন, বৈশাখ আসবেই। প্রকৃতির আপন খেয়ালে হাওয়া দেবে। ধুলো উড়িয়ে ঝড় আসবে। কাঠফাটা রোদ উঠবে। গরমের তীব্রতায় জনজীবন অতিষ্ঠ হবে। আবার প্রকৃতিই প্রশান্তি দেবে। ফুল ফুটবে। পাখি গান গাইবে। বাজারে আসবে টসটসে দেশি ফলমূল। মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়াবে। বৈশাখ এভাবেই নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। এটি কোনো লৌকিকতা নয়। এটি এই জনপদের রক্তে মিশে থাকা এক অমোঘ নিয়ম।

মানুষের আত্মপরিচয় অনেক গভীর। আমরা সন্তানদের নাম রাখি বৈচিত্র্যময় সব ভাষায়। কেউ আরবি নাম পছন্দ করি। কেউ ফার্সি বা উর্দু নাম রাখি। কেউবা ঝোঁকেন ইংরেজি নামের দিকে। আভিজাত্য দেখানোর চেষ্টা থাকে সবার মাঝে। মজার ব্যাপার হলো, ওই নামের গূঢ় অর্থ আমরা শেষ পর্যন্ত নিজের মাতৃভাষাতেই খুঁজি। মনের তৃপ্তির জন্য বাংলার কাছেই ফিরতে হয়। একটি সুন্দর নামের মাহাত্ম্য আমরা তখনই টের পাই, যখন বাংলায় তার মানে খুঁজে পাই। বাংলা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়। এটি আমাদের চিন্তার শেষ আশ্রয়।

মানুষের পরিচয় নানাভাবে বদলায়। কেউ ভালো থাকার আশায় বিদেশে পাড়ি জমায়। ভিনদেশি সংস্কৃতি আপন করে নেয়। দাপ্তরিক কাগজপত্র মানুষকে তার আসল পরিচয় মনে করিয়ে দেয়। পৃথিবীর যে প্রান্তেই যান, আপনার আদি পরিচয় বদলাবে না। জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র সব জায়গায় লিখতে হয় বাংলাদেশ। পাসপোর্টের পাতায় আপনাকে লিখতে হয় ‘জন্মসূত্রে বাংলাদেশি’। এই শব্দগুলো একজন মানুষের আসল সত্তা। নাগরিকত্বের শত আইনের ভিড়ে এটিই সবচেয়ে বড় সত্য। বিদেশের চাকচিক্য এই সত্য আড়াল করতে পারে না। অন্য ভাষায় কথা বললেও নিজের শিকড় প্রকাশ করতে হয় এই দেশের নাম দিয়েই।

আমাদের সমাজ এখন পরিচয়ের সংকটে ভোগে। সংস্কৃতি ও ধর্মকে অনেকে মুখোমুখি দাঁড় করান। বাস্তবতা অনেক সহজ। বৈশাখের তপ্ত রোদ কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়। বর্ষার বৃষ্টি সবার জন্য সমান ঝরে। প্রকৃতির এই দানগুলো কোনো সাজানো কথার ধার ধারে না। এগুলো স্রেফ ঘটে যায়। বাংলা ভাষাও ঠিক তেমন। এটি আমাদের প্রতিটি নিশ্বাসে মিশে আছে। একে আলাদা করে প্রমাণ করার দরকার পড়ে না। এটি আমাদের মজ্জাগত এক টান।

বৈশাখী হাওয়া মনে করিয়ে দেয় আমরা এই মাটির। এই সত্য অস্বীকার করার কোনো পথ নেই। ঋতু আসে ঋতুর নিয়মে। মানুষের পরিচয় টিকে থাকে তার আপন শক্তিতে। বাঙালিত্ব কোনো সস্তা পোশাক নয়। এটি এক আজন্ম উত্তরাধিকার। নিজের শিকড়কে চেনা ও তাকে শ্রদ্ধা জানানোই বড় গুণ।

মানুষের জীবনে অনেক ব্যস্ততা। আমরা প্রযুক্তির পেছনে ছুটি। আধুনিক হওয়ার প্রতিযোগিতায় নামি। দিনশেষে প্রতিটি মানুষের শেষ গন্তব্য তার জন্মভূমি। বাংলার আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা মানুষের হৃদয়ে এই সত্যটি খোদাই করা থাকে। নববর্ষ ওই সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমাদের খাবার, ভাষা, পরিচয়–সবই এই ভূখণ্ডকে ঘিরে।

রোদে পোড়া দুপুরে ধুলো ওড়া বৈশাখী হাওয়ায় আমাদের সত্তা বারবার সজীব হয়। এই মাটির কঠোরতা আর কোমলতা মিলেই আমাদের চেহারা। প্রতিটি মুহূর্ত এই নাড়ির টানের কথা মনে করায়। আপনি চাইলেও আপনার পরিচয় মুছে ফেলতে পারবেন না। এটি আপনার শরীরের রক্তে প্রবহমান।
নিজের নামের অর্থ বাংলায় খোঁজা কোনো লজ্জার বিষয় নয়। এটি ভাষার শক্তি। আমাদের বাপ-দাদারা এই ভাষাতেই স্বপ্ন দেখতেন। আমরাও ওই স্বপ্ন বয়ে বেড়াচ্ছি। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন কেউ নিজেকে বাংলাদেশি পরিচয় দেয়, তখন তার চোখেমুখে একধরনের গর্ব ফুটে ওঠে। এই গর্বের ভিত্তি আমাদের হাজার বছরের পুরোনো সংস্কৃতি।

বৈশাখী ঝড় মনের জঞ্জাল ধুয়ে দেয়। নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়। আম, জাম, বাঙ্গি, কাঁঠাল, লিচু ও আনারসের মিষ্টি স্বাদে ভরে ওঠে বাংলার চারপাশ। এই অতি সাধারণ বিষয়গুলোই আমাদের অসাধারণ পরিচয়ের অংশ। আমরা আধুনিক হতে পারি। কিন্তু আমাদের মূলে রয়েছে এই বাংলা। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসে বাংলা মিশে থাকে।

বৈশাখ আসবে, রোদ দেবে, ঝড় দেবে, এটিই ধ্রুব। আমাদের পরিচয় হবে বাংলাদেশি–এটিই সত্য। এই সহজ সত্যগুলো নিয়ে বেঁচে থাকাই প্রকৃত জীবন। শিকড়হীন মানুষ যেমন বাঁচেন না। পরিচয়হীন জাতিও এগোতে পারে না। আমরা মাটির ঘ্রাণ চিনি। ঝড়ের গর্জন চিনি। আমরা ভাষার সুর চিনি। এই পরিচিত ভুবনেই আমাদের পরম শান্তি। নববর্ষ ওই শান্তির খবর নিয়ে আসে। এটি আমাদের শিকড়ের কাছে ফিরিয়ে নেয় বারবার।

আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি ধাপে বাংলা ও হাজার বছরের ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। প্রকৃতি ও দাপ্তরিক পরিচয় উভয় ক্ষেত্রেই আমরা মাটির কাছে ঋণী। এই ঋণ স্বীকার করেই আমাদের পথ চলতে হবে। নববর্ষে ওই ঋণের কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি এক অনিবার্য ও চিরন্তন সত্য। এই সত্যকে আঁকড়ে ধরেই আমরা আগামীর পথে এগিয়ে যাব। বাঙালির জয়গান হবে নিজ ভাষায়, নিজ পরিচয়ে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

লেখক পরিচিতি

এম আর লিটন
এম আর লিটন
তরুন কবি ও সংগঠক ৷ সম্পাদক ও অনলাইন এক্টিটিভিস্ট ৷ ব্যস্ততার মাঝেও লিখে চলেছেন অবিরত ৷

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা