এগার
রাজাকার বাহিনীর হানা
কালু রাজাকারের নেতৃত্বে দোনলা বন্দুক হাতে অচেনা চেহারার লোকগুলো বাড়িতে ঢুকেই বাবাকে খুঁজতে আরম্ভ করলো। বড় ও সেজো জ্যেঠামশাই দুজনে তখনো বাইরের বাড়িতে দাঁড়িয়ে। কালু রাজাকারের দিকে তাকিয়ে অচেনা লোকেরা বুঝলো, এদের দুজনের কেউ-ই মাস্টার মশাই নন, যাকে ধরে নিতেই তারা এ বাড়িতে এসেছে।
একজন বলে উঠলো, “শালা মালাউনের বাচ্চাটা কোথায়?”
সেজো জ্যেঠামশাই কালুর দিকে তাকিয়ে বললো, “তোমরা কাকে খুঁজছো?”
কালু রাজাকার আমতা আমতা করে উত্তর দিল, “স্যার কোথায়?”
সেজো জ্যেঠামশাই বললো, “তোমরা যে এ বাড়িতে এসেছ শওকত ভাই জানেন?”
শওকত ভাই মানে ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান শওকত আলীর কথা বোঝালেন সেজো জ্যেঠামশাই। কালুর পাশ থেকে একজন হঠাৎ বলে উঠলো, “শালা মালাউনের বাচ্চার বেজায় সাহস হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। হিন্দু বাড়িতে আসতে শওকত চেয়ারম্যানের কাছ থেকে পারমিশন নিতে হবে? তোদের চোদ্দগোষ্ঠীর ভাগ্য যে পাকিস্তানি মিলিটারি সাথে আনি নাই।”
বলেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেজো জ্যেঠামশাইকে কাঠের বন্দুক দিয়ে আঘাত করতে উদ্যত হলো। প্রায় ছয় ফুটের বিশাল দেহের সেজো জ্যেঠামশাই হাত দিয়ে বন্ধুকের সামনের অংশ ধরে আবার ছেড়ে দিলেন।
বড় জ্যেঠামশাই পরিস্থিতি হালকা করতে কালু রাজাকারকে বললেন, “কালু তুমি আমাদের পরিচিত। কতদিন আমাদের বাড়িতে এসেছো। তোমার স্যারকে দরকার, তুমি কিংবা শওকত খবর পাঠালেই তো হতো। রাজাকার নিয়ে বাড়িতে আসার প্রয়োজন ছিল কি?”
কালু রাজাকার কোনো উত্তর না দিয়ে বাড়ির ভিতরের দিকে চলে যেতে সবাইকে নির্দেশ দিল। অচেনা রাজাকারগুলোও কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে সবগুলো ঘরে খোঁজাখুজি আরম্ভ করে দিল।
ইতিমধ্যে বাড়িতে থাকা আরেক জ্যেঠামশাই আর তিন জ্যেঠাতো ভাই ঘরের ভিতর থেকে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। বড় জ্যেঠামশাইর দিকে চোখাচোখা করছেন, তিনি কোনো নির্দেশ দেন কি না জানার জন্য। বড় জ্যেঠামশাই প্রতিরোধের কোনো ইঙ্গিতই দিলেন না।
সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও বাবাকে না পেয়ে সবাই আবার বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে।
একজন বললো, “শালা ভেগে গেছে।”
আরেকজন কালু রাজাকারের সাথে দূরে গিয়ে একটু শলাপরামর্শ করে সবচেয়ে ছোট জ্যেঠাতো ভাই ফণীন্দ্রকে করে জাপটে ধরে বেঁধে ফেললো। ক্লাশ টেনের ছাত্র ফণীন্দ্র একটু বাধা দিতেই কাঠের বন্দুক দিয়ে মুখে এমন জোরে মারলো যে ফণীন্দ্রের নাক ফেটে দরদর করে রক্ত পড়তে আরম্ভ করল।
সেজো জ্যেঠামশাই ধুতির আঁচল দিয়ে ফণীন্দ্রর মুখের রক্ত মুছিয়ে দিতেই আরেকজন সেজো জ্যেঠামশাইকেও মাথায় মারলো। দাঁড়িয়ে থাকা অন্য রাজাকারেরা মুহূর্তেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট জ্যেঠামশাই ও অন্য দুই জ্যেঠাতো ভাইকে পিঠমোড়া করে বেঁধে ফেলল কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই। সবাই বড় জ্যেঠামশাইর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে অথচ নির্বিকার বড় জ্যেঠামশাই রাজাকারদেরকে প্রতিরোধ করার কোনো নির্দেশই দিলেন না।
প্রায় বিনা প্রতিরোধেই সবল সক্ষম পাঁচজন মানুষকে ওরা বন্দুকের বাট আর লাথি মেরে মেরে হাত পা বেঁধে মাটিতে শুইয়ে দিল। বাড়িতে থাকা ঠাকুরমা ও পিসিমা সবার চিৎকারে আর ঘরে লুকিয়ে থাকতে না পেরে বাড়ির উঠোনে চলে এলেন। আহত পাঁচজনের গোঙরানির সাথে ঠাকুরমা ও পিসিমার চিৎকার এক
ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করলো। বড় জ্যেঠামশাই তখনো কালুর সাথে দেনদরবার করছেন যাতে ওরা আর কিছু না করে এখান থেকে চলে যায়। কালু কিছুতেই বাবাকে ছাড়া যাবে না। কালু
বললো, “স্যার বাড়িতেই লুকিয়ে আছে। আপনি মিথ্যে কথা বলছেন।”
বড় জ্যেঠামশাই বললেন, “বাড়িতে থাকলে কি এতগুলো মানুষের আর্তচিৎকারের পরেও ও সামনে না এসে পারে? তুমি তোমার স্যারকে তো চেনো।”
কালু রাজাকার কিছুতেই বাবাকে না ধরে এমনি এমনি চলে যেতে রাজি না।
অবশেষে বললো, “আপনাকে ও এদের পাঁচজনকে ইউনিয়ন বোর্ডে নিয়ে যাব।
মিলিটারি ভবানিপুর গেছে, আসতে সন্ধ্যা হবে। এর মধ্যে স্যার যদি ইউনিয়ন বোর্ড অফিসে না যায়, তবে আপনাদের সবাইকে মিলিটারির হাতে তুলে দেব।”
একথা বলেই কালু রাজাকার চোখ ইশারায় সবাইকে নৌকায় ওঠাতে নির্দেশ দিল। কালুর কথার সাথে সাথে অন্যান্য রাজাকারেরা টেনে হিচড়ে সবাইকে নৌকায় তুলতে লাগল।
ঠাকুরমা-পিসিমা কালুর কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা ভিক্ষা করছে। কিন্তু কালু রাজাকারের মন কিছুতেই নরম হলো না। ঠাকুরমা তার তিন ছেলে ও তিন নাতিকে বাঁচাতে ঘরের যা কিছু আছে সব কালুকে দিতে চাইলেও সেদিকে ওদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এদিকে একে একে আহত সবাইকে টেনে হিঁচড়ে নৌকায় তোলা হলো। সবার শেষে বড় জ্যেঠামশাই নিজে হেঁটে হেঁটেই নৌকার দিকে এগিয়ে গেল।
সবচেয়ে আহত ফণীন্দ্র “জল খাব” বলে কার্তস্বরে গোওড়াচ্ছে। একজন রাজাকারের দয়া হলো। কাছেই টিউবওয়েল থেকে নৌকায় থাকা মাটির পাত্র ভরে জল নিয়ে মুখে ঢেলে দিল।
ঘাটোর্ধ বয়সের ঠাকুরমা ছেলে ও নাতিদেরকে রক্ষা করতে শেষ চেষ্টায় নিজেও নৌকায় উঠে বসলো। এক রাজাকার জোর করে ঠেলে-ধাকে বুড়িকে নৌকা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিল কাদাজলের ভিতর। নৌকাটি সবাইকে নিয়ে বাড়ির ঘাট থেকে দূরে চলে যেতে লাগলো।
এদিকে আহত পাঁচজনের মধ্যে ফণীন্দ্রের অবস্থা খুবই খারাপ। ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ে নৌকার পাটাতন ভেসে যাচ্ছে। অন্য চার জনের অবস্থাও ভালো মনে হলো না। নৌকার ভিতর এক নারকীয় অবস্থা। কালু রাজাকারের সঙ্গে আসা অচেনা লোকগুলো নৌকার ছইয়ের উপরে পজিশন নিয়ে আছে যদি বাবার নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী আক্রমণ করে বসে এ আশঙ্কায়। অথচ কোথাও কাউকে দেখা গেল না। ভরা বর্ষাকালের দুপুরের নিস্তব্ধতা বাড়ি থেকে ভেসে আসা ঠাকুরমা-পিসিমার কান্নায় ভারী হয়ে উঠলো।
নৌকা আস্তে আস্তে দূরে চলে যাচ্ছে। একটি পরিবারের এতগুলো মানুষের সমূহ মৃত্যু চিন্তায় বড় জ্যেঠামশাই আতঙ্কগ্রস্থ হয়েও শেষ চেষ্টা করতে লাগলেন।
বড় জ্যেঠামশাই কালুকে বললো, “আর একটু পরেই হয়ত আমার ভাই- ভাতিজাদের অনেকেই মরে যাবে। কালু তুমি তো আমাকে জানো, শওকত চেয়ারম্যান আর আমি খুব ছোটবেলার বন্ধু। এক সাথে স্কুলে পড়েছি। শওকত আমার সাথে অন্তত এতখানি বিশ্বাসঘাতকতা করবে আমার বিশ্বাস হয় না। জানি না শওকত তোমাদের এ অপারেশনের কথা জানে কি না? জানলে আমাদের বাড়ির পাঁচজন মানুষকে মেরে ফেলার জন্য তোমাদের পাঠাতো বলে আমার মনে হয় না।”
কালু রাজাকার বড় জ্যেঠামশাইয়ের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইলো। বড় জ্যেঠামশাই আবার বলতে শুরু করলেন, “তার চেয়ে তুমি আমাদের ছেড়ে দাও। আমি কথা দিচ্ছি তুমি টাকা-পয়সা যা চাও, আমি একা একা তোমাকে দিয়ে আসবো। ‘তোমার স্যার’ জানবে না। আর ও যাতে থানায় গিয়ে দেখা করে সে ব্যবস্থা আমি করবো।”
কালু অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। ততক্ষণে নৌকা গ্রামের পূর্বদিকের খালের প্রায় মাঝামাঝি চলে এসেছে। আর একটু পরেই নিমাইবিলে পড়বে। কালু নৌকার পেছনের মাঝিকে ইশারা করলো। নৌকাটি আবার আমাদের বাড়ির ঘাটের দিকে রওনা হলো।
নৌকা ঘাটে ভিড়তেই আহত পাঁচজনকে চ্যাংদোলা করে নৌকা থেকে নামিয়ে দিয়ে নৌকাটি আবার খাল পেরিয়ে নিমাইবিলের দিকে চলে গেল।
বাড়িতে তখন আহত সবাইকে বাঁচিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। বাবাও কচুরিপানার জঙ্গল থেকে ভেজা শরীরে বাড়িতে উঠে এসেছে। ঠাকুরমা-পিসিমা ঘরে শুকিয়ে রাখা সাদা ধুতি ছিঁড়ে সবার ক্ষতস্থান জড়িয়ে দিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বাবা ও বড় জ্যেঠামশাই সবাইকে বাঁচিয়ে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন।
পাঁচজন আহত মানুষের আর্তচিৎকারে বাতাস ভারী হয়ে এলো। ভরা বর্ষার থই থই জলে কান্নার প্রতিধ্বনি যেন ভাদ্রমাসের গুমোট গরমকে আরও অসহ্য করে তুললো। রাজাকারের নৌকা চলে যেতে দেখে অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়াতে এগিয়ে এলো। বহেরাতলি থেকে যে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যের হাত বাড়াতে এগিয়ে আসার কথা ছিল বাবা ওদের না দেখে বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। জ্যেঠামশাইয়ের বোকামির জন্যই যে প্রতিরোধ করা গেল না, সে কথাই আহত সবাই কান্নার সাথে সাথে বলতে লাগলেন। বাবাও নিজের পালিয়ে যাবার সিদ্ধান্তকে কিছুতেই মানতে পারছেন না।
এভাবেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল। সন্ধ্যের দিকে বহেরাতলির মুসলমান পাড়া থেকে বড়মাসহ আমরা সবাই চলে এলাম। থানা সদরে আহতদের নেয়ার সাহসও কারো নেই। গ্রামের হোমিওপাথি ডাক্তার জিতেন বাবুর চিকিৎসার উপর নির্ভর করেই সেদিন রাত্রি কাটিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো।


