পংকজ পাল
পাহাড়ের ভোরে এক অন্যরকম নরম আলো। নদীর জলে ফুল ভাসে, আর মানুষের চোখে ভাসে প্রার্থনা। কেউ নীরবে, কেউ হাসিতে—কিন্তু সবার ভেতরেই এক অদ্ভুত শান্তি। এ যেন শুধু একটি উৎসব নয়, একসাথে বেঁচে থাকার গভীর উপলব্ধি।
ফুল বিজু
প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞতার দিন বিজুর শুরুটা হয় ফুল বিজু দিয়ে। চৈত্রের শেষ প্রহরে পাহাড়ি জনপদে ফুল তোলার এক মধুর আয়োজন দেখা যায়। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ—সবাই ভোরে নদী বা ঝর্ণার ধারে গিয়ে ফুল ভাসিয়ে দেয় জলে।
এটি কেবল রীতি নয়—এ যেন প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর এক সহজ ভাষা। গত বছরের সব দুঃখ, ক্লান্তি, গ্লানি যেন সেই জলের স্রোতে ভেসে যায়। আর নতুন বছরের জন্য আসে শুভকামনা, নির্মলতার প্রতিশ্রুতি।
মূল বিজু
ঘর, মন আর সম্পর্ক পরিশুদ্ধির সময় দ্বিতীয় দিন, মূল বিজু, উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু। এদিন ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা হয়, নতুন পোশাক পরা হয়, আর রান্না হয় ঐতিহ্যবাহী খাবার—বিশেষ করে ‘পাজন’, যেখানে থাকে নানা সবজির সমাহার। এখানে একটা দারুণ দর্শন লুকিয়ে আছে—শুধু ঘর নয়, মনও পরিষ্কার করতে হয়। সম্পর্কগুলোকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে হয়। পুরনো অভিমান ভুলে গিয়ে একসাথে বসে খাওয়া—এই সাধারণ দৃশ্যটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে গভীর মানবিক শিক্ষা।
গোজ্জ্যাপুজ্জে বিজু
আত্মার শুদ্ধি আর আশীর্বাদের দিন শেষ দিন গোজ্জ্যাপুজ্জে বিজু—যেখানে জল হয়ে ওঠে পবিত্রতার প্রতীক। বড়দের গায়ে পানি ঢেলে আশীর্বাদ নেওয়া হয়, ছোটদের জন্য থাকে ভালোবাসা আর মঙ্গলকামনা। এই দিনে বোঝা যায়—জীবন আসলে এক ধারাবাহিক সম্পর্কের বুনন। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর মমতা ছাড়া সেই বুনন টেকে না।

বিজু
সংস্কৃতির চেয়েও বড় এক জীবনদর্শন বিজু শুধু চাকমা বা অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উৎসব নয়—এটি এক মানবিক পাঠশালা। এখানে শেখানো হয়—
প্রকৃতির সাথে কিভাবে সহাবস্থান করতে হয় কিভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয় কিভাবে ভ্রাতৃত্ব আর সম্প্রীতির সেতু গড়ে ওঠেপাহাড়ের এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ আর প্রকৃতি আলাদা কিছু নয়, তারা একে অপরের পরিপূরক।
শেষকথা
আজকের এই ফুল বিজুর দিনে, নদীর জলে ভেসে যাক সব হিংসা, বিদ্বেষ, বিভাজন। ফিরে আসুক মানুষের মাঝে মানুষের টান। পাহাড়ের মতো দৃঢ় হোক আমাদের সম্প্রীতি, আর ফুলের মতো কোমল হোক হৃদয়। ঐক্যের সেই নরম সুর আবার বাজুক—
মানুষে মানুষে, প্রাণে প্রাণে।


