“হাজার বছর ধরে “প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান রচিত একটি কালজয়ী সামাজিক উপন্যাস। ১৯৬৪ সালে এ উপন্যাসটির জন্য তিনি আদমজী পুরষ্কারে সম্মানিত হন।
এই উপন্যাস টি-তে ফুটে উঠেছে পরীর দিঘি পারে গ্রামের হাজার বছরের সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গড়ে ওঠা একটি পরিবারের, একটি গ্রামের সমসাময়িক বিষয়গুলো । গ্রামের আবহমানকালের জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন জহির রায়হান। “হাজার বছর ধরে” উপন্যাসে এই গ্রামের গোড়াপত্তন কবে হয়েছে কেউ জানেনা। হাজার বছর আগে গোড়া পত্তন হওয়া গ্রামে বন্যায় ভেসে আসা কাশেম সিকদার কয়েক বিঘা জমি কিনে গড়ে তোলেন শিকদার বাড়ি ।এই সিকদার বাড়ি এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য বিষয়। এই উপন্যাসে কয়েকটি কেন্দ্রীয় চরিত্র রয়েছে যেমন মকবুল বুড়ো , মন্টু মিয়া, ও টুনি তাছাড়াও রয়েছে গনু মোল্লা, ফকিরের মা ও আম্বিয়া।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র টুনি। আনন্দ-উচ্ছ্বল এই গ্রামীণ মেয়েটির সংসার শুরু হয়েছিল বুড়াে মকবুলকে নিয়ে। নারী জীবনের দুর্গতির বােঝা বয়ে চলা জীবনে যুবক মন্টু যে আলােড়নের সৃষ্টি করেছিল তাতে টুনি চরিত্রের স্বরূপ লক্ষ করা যায়। মন্টু ও টুনির মনের গতিপ্রকৃতি নির্ণয়ই উপন্যাসের প্রধান দিক। টুনি চরিত্রটি লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রিত করেছেন।
এখানে চরিত্রগুলাে আবহমান বাংলাদেশের মানুষের অকৃত্রিম পরিচয় তুলে ধরেছেন। কালের পরিবর্তনের ছাপ গ্রামীণ জীবনে পড়ে নি। সে জীবন যেন বরাবরের মতােই বয়ে গেছে। গ্রামীণ জীবনের চিরসঙ্গী দারিদ্র্য, ঝগড়া বিবাদ যেন অপরিবর্তনীয়ভাবে দেখা দিয়েছে। ভালােবাসার চিরন্তন রূপটিই এখানে প্রত্যক্ষ করা যায়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের একটি চিরন্তন রূপ উপন্যাসে অত্যন্ত সহজ সরলভাবে ফুটে উঠেছে।
তিনি উপন্যাসের মাধ্যমে গ্রাম বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন এছাড়াও ওই সময় গ্রামের মানুষ কলেরা, ডায়রিয়াকে ওলাবিবি নামে ডাকতো অর্থাৎ ওলাবিবি যে গ্রামে যেতো সেই গ্রামের সকলকে উজার করে দিত । এছাড়াও তিনি মকবুল বুড়োর পরিবারের কাহিনী, নারী নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ,কঠিন অচলায়তন সমাজে যাই হোক নারীর কোন অধিকার নাই, নারী হাতের পুতুল মাত্র ,পুরুষ তাকে যেমন চায় তেমন নাচায় । সমাজের আনাচে-কানাচে বাস করে কুসংস্কার এই বিষয়গুলো সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গ্রামের সামাজিক চিত্র যারা মুরুব্বী ছিল তারা সব সময় বহুবিবাহ করত উপন্যাসে তার প্রতিনিধিত্ব করছিলো মকবুল বুড়া। তিনি তার ঘরে বাহিরে জমির সব কাজ করাতেন তার বউদের দিয়ে ।এটি ছিল নারী নির্যাতনের অন্যতম লক্ষণ । টুনি ছিল মকবুলের সবথেকে ছোট বউ যে সমাজের বাঁধাধরা নিয়মগুলো মানতে চাইতো না তাছাড়া মকবুল বুড়ো তার দাদুর বয়সের হওয়াই তার প্রতি কোনো আকর্ষণ কাজ করতো না । টুনি ভালবাসে তার দূর সম্পর্কের দেবর মন্টুকে। তারা একসাথে রাতের বেলা শাপলা তুলতে যেতো,মাছ ধরতো হেসে খেলে বেড়াতো, কিন্তু মন্টু ছিলো একা তাই তার জন্য যখন বিয়ে ঠিক করা হলো তখন টুনি সেটা সহ্য করতে না পেরে মকবুলকে উসকে দিয়েছে মন্টুর জন্য দেখা মেয়েকে বিয়ে করতে এবং সে ঘটনার রেশ ধরে মকবুল মিয়া মারা যায়। কিন্তু কালের পরিক্রমায় মন্টু বিয়ে করে করিম শেখের বোন আম্বিয়া কে ।
জীবনের হাটে সকল বেচাকেনা শেষ করে একদিন আকর্ষিকভাবে কোথায় যেন হারিয়ে যায় ওরা। ধীরে ধীরে রাত বাড়তে লাগল ,চাঁদ হেলে পড়ল পশ্চিম আকাশে, উঠানের ছায়াটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হল। রাত বাড়ছে হাজার বছরের সেই পুরনো রাত।
এখানে কালের আবর্তে সময় গড়ায় প্রকৃতিতেও পরিবর্তন আসে তবে শুধু পরিবর্তন আসে না অন্ধকার আমাদের কুসংস্কারচ্ছন্ন গ্রাম বাংলায় ৷


