হরিশংকর জলদাসের উপন্যাসের গতানুগতিক যে ধারার সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত, তার চেয়ে বেশ অনেকটাই ভিন্ন গল্প আর ভিন্ন চরিত্রদের নিয়ে এ উপন্যাস। শুধু সমাজের নিম্নবর্গের কাহিনিই নয়, এই লেখক যে সমাজের উঁচু স্তরের মানুষের জীবনের আখ্যান বুননেও দক্ষ, তার প্রমাণ এই ১৬/১৭ লাভ লেন।
চট্টগ্রামের লাভ লেনের ১৬/১৭ নম্বরের একটি বাড়িকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় কিছু মানুষের জীবন। মুকুন্দ মুহুরী এ বাড়ির কর্তা। অনেক সংগ্রাম করেই এত দূর উঠে এসেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর সবকিছু বিক্রি করে শহরে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে কাঠখড় কম পোড়াতে হয়নি তাকে। অনেক কষ্টে অর্জন করা এ সম্মান-প্রতিপত্তি, সামাজিক অবস্থান সে কিছুতেই হারাতে চায় না, এমনকি তাতে যদি নিজের অতি আদরের মেয়ে দিশার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে হয়, তবু না। সমাজের ওপরের স্তরে উঠে মুকুন্দ ভুলে যায়, সে–ও কোনো এক সময় ওই নিচুদের কাতারেই ছিল, যাদের সহায়তায় মুকুন্দের এই উত্থান, মুকুন্দ তাদের বিপদে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারে না। ভেতরে-ভেতরে এসব হতাশা আর অপরাধবোধ মুকুন্দকে কুরে কুরে খেলেও বাস্তব জীবনে সমাজের বেঁধে দেওয়া রীতিনীতির বাইরে সে যেতে পারে না। আর তাই তো সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও জেলেপুত্র ব্রজেন ডায়াসকে জামাতা হিসেবে মেনে নিতে পারে না মুকুন্দ।
উপন্যাসটির নাম শুনেই মনে হয়, এটি বুঝি কোনো প্রেমের উপন্যাস, কিন্তু আদতে এ উপন্যাসের পাতায় পাতায় অপ্রেম, হতাশা আর না-পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস লেগে আছে। প্রেম মানবজীবনের পরম আরাধ্য, তবু অপ্রেমের সঙ্গে কেন কাটাতে হয় জীবন? কেন খুব কাছাকাছি থেকেও কখনো চেনা হয়ে ওঠে না পরম প্রিয় মানুষটিকেও? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছেন হরিশংকর জলদাস ১৬/১৭ লাভ লেন-এর মাধ্যমে।
উপন্যাসের আরেকটি চরিত্র সিরাজ। পেশায় সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিবাহিত, তবু কিশোর বালকের মতো করে তিশার প্রেমে জড়িয়ে যায় সে। তিশাও তাকে ভালোবাসে। তবে সংসারভোলা নারী হতে নারাজ এই মেয়ে। তাই বাবার পছন্দে সে ঘর বাঁধে বেঢপ চেহারার নিখিলের সঙ্গে। একদিকে তিশা আর নিখিল, অন্যদিকে সিরাজ ও তার স্ত্রী—সীমাহীন অপ্রেম লোমশ এক অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তাদের মাঝখানে।
হরিশংকর জলদাস সুলেখক। নিজের নানা উপন্যাসে তিনি নিম্নবর্গের মানুষের জীবনের সুগভীর আলেখ্য দক্ষতার সঙ্গে পাঠকের সামনে তুলে এনে প্রশংসা কুড়িয়েছেন, তবে ১৬/১৭ লাভ লেন পড়তে গিয়ে মনে হলো, লেখক হিসেবে এখানে বোধ হয় তিনি খানিকটা তাড়াহুড়ো করেছেন। চরিত্রগুলো আরেকটু ডানা মেলতে পারত, সংলাপগুলো আরেককটু গভীর হতে পারত। আর শুরুর সেই মিষ্টি কণ্ঠের শ্রেয়সীর গল্পটুকু আমাদের না বলে কিছুটা কি অবিচার করলেন না লেখক! শ্রেয়সীকে দিয়ে গল্পের সূচনা হওয়ায় এ চরিত্র নিয়ে পাঠকের প্রত্যাশা তেমন কোনো দিশা পেল না। তবে পাওয়া না-পাওয়ার এ আখ্যানেও কিছু স্নিগ্ধমধুর স্বপ্ন পূর্ণতা পায়, বেঁচে থাকে চিরকাল। দিশা আর ব্রজেন ডায়াসের প্রেম পাঠকদের তা-ই শেখায়।


