শনিবার, মে ১৬, ২০২৬

স্মরণ : কালীপ্রসন্ন সিংহ,বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ

পংকজ পাল

কালীপ্রসন্ন সিংহ (২৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৪০ – ২৪ জুলাই ১৮৭০; মতান্তরে ১৮৭১) ছিলেন উনবিংশ শতকের বাংলার এক ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক ও সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষক। স্বল্প আয়ু হলেও বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় তাঁর অবদান গভীর, বহুমাত্রিক এবং দীর্ঘকাল প্রভাববিস্তারকারী।

কালীপ্রসন্ন সিংহ জন্মগ্রহণ করেন কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। পারিবারিক ঐশ্বর্য তাঁকে স্বচ্ছলতা দিয়েছিল, কিন্তু তিনি সেই সুবিধাকে ভোগের জন্য নয়, সমাজ ও সাহিত্যের কল্যাণে ব্যয় করেন। সমকালীন কলকাতার সামাজিক বৈপরীত্য, ভণ্ডামি ও অনুকরণপ্রবণতা তাঁর মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। এই অভিজ্ঞতাই পরে তাঁর লেখায় তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ ও মানবিক দায়বোধ হিসেবে প্রকাশ পায়।

বাংলা সাহিত্যে তাঁর অমর কীর্তি হুতোম প্যাঁচার নক্‌শা। এটি উনবিংশ শতকের কলকাতার বাবুসমাজ, সামাজিক ভণ্ডামি, কৃত্রিম আধুনিকতা ও নৈতিক দ্বিচারিতার এক অনবদ্য ব্যঙ্গচিত্র। কথ্য ভাষা, লোকজ রস এবং সূক্ষ্ম বিদ্রূপের মাধ্যমে তিনি সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছেন। এই গ্রন্থ কেবল সাহিত্যকর্ম নয়, বরং সমকালীন সমাজের একটি জীবন্ত দলিল।

তবে কালীপ্রসন্ন সিংহের সাহিত্যিক অবদান শুধু ব্যঙ্গরচনায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সবচেয়ে বৃহৎ ও ঐতিহাসিক উদ্যোগ ছিল সংস্কৃত মহাকাব্য মহাভারত-এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা গদ্য অনুবাদ প্রকাশ। তিনি বিশ্বাস করতেন, মহাভারতের মতো মহাকাব্য কেবল সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সাধারণ বাঙালির কাছেও এই গ্রন্থ পৌঁছানো দরকার।

এই অনুবাদে তিনি সহজ, প্রাঞ্জল ও সাবলীল গদ্য ব্যবহার করেন, যাতে পাঠক অনায়াসে কাহিনি ও ভাবার্থ বুঝতে পারেন। মূল সংস্কৃত পাঠের দার্শনিক গভীরতা ও আখ্যানের ব্যাপ্তি অক্ষুণ্ণ রেখেই তিনি বাংলা ভাষায় তা উপস্থাপন করেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ তিনি সম্পূর্ণ নিজের ব্যক্তিগত অর্থে সম্পন্ন করেন। ছাপা, সম্পাদনা ও প্রকাশনার সব ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে তিনি আর্থিকভাবে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েন। তবুও তাঁর সংকল্প টলেনি।

সমাজসংস্কার ক্ষেত্রেও কালীপ্রসন্ন সিংহ ছিলেন সক্রিয়। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও অনুরাগী ছিলেন এবং বিধবা বিবাহ আন্দোলনের প্রতি দৃঢ় সমর্থন জানান। মতাদর্শের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা দিয়েও তিনি এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এই অবস্থান ছিল সাহসী ও প্রগতিশীল।

এছাড়া তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার নানান উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বহু লেখক, পত্রিকা ও সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টা তাঁর সহায়তায় টিকে থাকার সুযোগ পায়। নিজের লেখার চেয়েও বৃহত্তর পরিসরে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।

মাত্র উনত্রিশ বছরের জীবনে কালীপ্রসন্ন সিংহ যে কর্ম ও আদর্শ রেখে গেছেন, তা বহু মানুষের দীর্ঘ জীবনের সাধনার সমান। তাঁর অকালমৃত্যু বাংলা সাহিত্য ও সমাজসংস্কারের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আজও তাঁর রচনা পড়লে উনবিংশ শতকের সমাজচিত্র যেমন স্পষ্ট হয়, তেমনি তাঁর চিন্তার অনেক দিক আধুনিক সময়েও সমান প্রাসঙ্গিক মনে হয়।

এই কারণেই কালীপ্রসন্ন সিংহ বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তার ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

লেখক পরিচিতি

পংকজ পাল
পংকজ পাল
তরুণ গল্পকার ও কবির জন্ম ১৫ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলায় ৷ বি.এস.সি (অনার্স), এম.এস.সি ; এল.এল.বি; শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন ৷ তার প্রকাশিত একক গ্রন্থ দুইটি ৷ কাব্যগ্রন্থ-'নিঃসঙ্গতার মেঘমালা' ও গল্পগ্রন্থ-'আকাশের নীল রং' এবং যৌথগ্রন্থ-চল্লিশের বেশি ৷ জেলার উদীচী, প্রগতি লেখক সংঘ, খেলাঘর, প্রথম আলো বন্ধুসভা, উত্তরণসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন ৷ বর্তমানে সম্পাদনা করছেন-'পলিমাটি','অন্তরঙ্গ 'ও 'চিন্ময়ী'৷ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে জেলা পর্যায়ে আয়োজিত ৩১তম বিজ্ঞান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সপ্তাহ ২০০৯-১০ খ্রিস্টাব্দে সিনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান, কবিতা সংসদ সাহিত্য পদক-২০১৪, বাংলাদেশের লেখক-'লেখক ডিরেক্টরি'র অন্তর্ভূক্ত-২০১৪, কাব্য চন্দ্রিকা একাডেমি পদক-২০১৭, লিখিয়ে কাব্য সাহিত্য সম্মাননা-২০১৮, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন স্মারক-২০১৮, কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি স্মারক ও সম্মাননা-২০২২ পেয়েছেন ৷ মেইল : pankajprenoy@gmail.com/ paulpankaj864@gmail.com

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা