রবিবার, মার্চ ১৫, ২০২৬

মানবিক মানুষের লেখক শরৎচন্দ্র

পংকজ পাল

বাংলা সাহিত্যের আকাশে যেসব নক্ষত্র আজও দীপ্তিমান, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম। জন্মের দারিদ্র্য, জীবনের টানাপোড়েন, সমাজের বৈষম্য—সবকিছুর মাঝেও তিনি খুঁজে নিয়েছিলেন মানুষের গল্প। সেই গল্পই তাঁকে করেছে সর্বাধিক পাঠকপ্রিয় লেখক, মানুষের লেখক।


শৈশব ও বেড়ে ওঠা

১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে জন্ম শরৎচন্দ্রের। পরিবার ছিল আর্থিক দিক থেকে দুর্বল। কলকাতার রিপন কলেজে পড়াশোনা শুরু করলেও শেষ করা সম্ভব হয়নি। জীবন তাকে ঠেলে দেয় একের পর এক চ্যালেঞ্জে। কর্মসংস্থানের জন্য বর্মায় (মায়ানমার) দীর্ঘকাল কাটাতে হয়েছিল, আর সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর লেখাকে করেছে বহুমাত্রিক।


সাহিত্যকর্মের পরিসর

শরৎচন্দ্রের কলম যেন সমাজের দর্পণ। নারী-পুরুষের টানাপোড়েন, প্রেম ও বিশ্বাসঘাতকতা, দারিদ্র্য ও শোষণ—সবই জায়গা পেয়েছে তাঁর রচনায়।

  • উপন্যাস: শ্রীকান্ত, চরিত্রহীন, গৃহদাহ, দেনা-পাওনা, পথের দাবী, পল্লীসমাজ।
  • গল্প: মহেশ, আনন্দমঠে নয়, নারায়ণী, মন্দির প্রভৃতি।
  • “পথের দাবী”: রাজনৈতিক চেতনা ও বিপ্লবী বার্তার জন্য ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

নারীচরিত্রের আলাদা মহিমা

শরৎচন্দ্র ছিলেন নারীমনের অদ্বিতীয় অনুবাদক। চরিত্রহীন এর কিরণময়ী, গৃহদাহ এর অচলা কিংবা শ্রীকান্ত এর রাজলক্ষ্মী—সব চরিত্রই সমাজের বাঁধাধরা ধারণার বাইরে দাঁড়িয়ে সংগ্রামী, আত্মত্যাগী ও দৃঢ়চেতা। নারীকে তিনি করুণার নয়, বরং আত্মমর্যাদা ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে দেখিয়েছেন।


ভাষাশৈলী ও জনপ্রিয়তা

তাঁর ভাষা ছিল সহজ, সরল অথচ আবেগময়। পাঠককে টেনে নেওয়ার জন্য কোনো আড়ম্বরের প্রয়োজন পড়েনি। সাধারণ মানুষও তাঁর লেখা পড়ে নিজের জীবনের সঙ্গে মিল খুঁজে পেতেন। এ কারণেই তিনি শহর থেকে গ্রাম, শিক্ষিত থেকে অশিক্ষিত—সব পাঠকের কাছেই সমান প্রিয় ছিলেন।


সংস্কারবিরোধী কলম

সমাজসংস্কারক হিসেবেও শরৎচন্দ্র ছিলেন উজ্জ্বল। অস্পৃশ্যতা, সামন্ততান্ত্রিক প্রথা, নারীর অধিকারহীনতা—সবকিছুর বিরুদ্ধে তিনি সরব হয়েছেন সাহিত্যে। সাহিত্য পরিষদের সভাপতি হিসেবে তিনি এক নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যের দিকে টেনে এনেছিলেন।


শেষ অধ্যায়

১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি শরৎচন্দ্র প্রয়াত হন। তবে তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্য আজও বাঙালির বুকের ভেতর বেঁচে আছে। তাঁর উপন্যাসগুলো চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে বহুবার, নাটক ও মঞ্চে এখনও বাজে তাঁর চরিত্রদের সংলাপ।


সমাপ্তি

শরৎচন্দ্র ছিলেন মানুষের কণ্ঠস্বর। প্রেম, প্রতিবাদ, দুঃখ-বেদনা আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুর মিলনে তিনি সৃষ্টি করেছেন এমন এক সাহিত্যধারা, যা সময়ের সীমা পেরিয়ে আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি শুধু লেখক নন, সমাজের বিবেক, মানুষের মনের অমোঘ অনুবাদক।

লেখক পরিচিতি

পংকজ পাল
পংকজ পাল
তরুণ গল্পকার ও কবির জন্ম ১৫ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলায় ৷ বি.এস.সি (অনার্স), এম.এস.সি ; এল.এল.বি; শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন ৷ তার প্রকাশিত একক গ্রন্থ দুইটি ৷ কাব্যগ্রন্থ-'নিঃসঙ্গতার মেঘমালা' ও গল্পগ্রন্থ-'আকাশের নীল রং' এবং যৌথগ্রন্থ-চল্লিশের বেশি ৷ জেলার উদীচী, প্রগতি লেখক সংঘ, খেলাঘর, প্রথম আলো বন্ধুসভা, উত্তরণসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন ৷ বর্তমানে সম্পাদনা করছেন-'পলিমাটি','অন্তরঙ্গ 'ও 'চিন্ময়ী'৷ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে জেলা পর্যায়ে আয়োজিত ৩১তম বিজ্ঞান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সপ্তাহ ২০০৯-১০ খ্রিস্টাব্দে সিনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান, কবিতা সংসদ সাহিত্য পদক-২০১৪, বাংলাদেশের লেখক-'লেখক ডিরেক্টরি'র অন্তর্ভূক্ত-২০১৪, কাব্য চন্দ্রিকা একাডেমি পদক-২০১৭, লিখিয়ে কাব্য সাহিত্য সম্মাননা-২০১৮, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন স্মারক-২০১৮, কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি স্মারক ও সম্মাননা-২০২২ পেয়েছেন ৷ মেইল : pankajprenoy@gmail.com/ paulpankaj864@gmail.com

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা