রফিকউদ্দিন আহমদ
যে মানুষটি ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন
তিনি কোনো বিপ্লবী ভাষণ দিয়ে শুরু করেননি।
শুরুটা ছিল খুব সাধারণ।
একটি গ্রাম, একটি পরিবার,
মায়ের মুখে শেখা বাংলা শব্দ,
বাবার ছাপাখানায় ছড়িয়ে থাকা কালির গন্ধ।
জীবন তখন পড়াশোনা, কাজ
আর আসন্ন বিয়ের বাজারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ।
কিন্তু কিছু সময় মানুষকে ডাক দেয়
তার ব্যক্তিগত জীবনের বাইরে।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে
ঢাকার বাতাসে সেই ডাক স্পষ্ট ছিল।
রাষ্ট্র চেয়েছিল ভাষা বদলাতে,
আর মানুষ বুঝেছিল
ভাষা বদলালে আত্মাটাই হারিয়ে যাবে।
২০ ফেব্রুয়ারির রাতে সতর্কতা এসেছিল।
ভগ্নিপতির কণ্ঠে ভয় ছিল,
কারণ শহরটা অস্বাভাবিক রকম উত্তপ্ত।
কিন্তু রফিক জানতেন,
এই উত্তাপ থেকে পালানো যায় না।
তিনি জানতেন,
সব বড় সিদ্ধান্তেরই একটা মূল্য থাকে।
২১ ফেব্রুয়ারি তিনি বেরিয়েছিলেন
বিয়ের বাজার করতে নয়,
নিজের ভাষাকে বাঁচাতে।
১৪৪ ধারা ভাঙার মুহূর্তে
তিনি আর একজন ব্যক্তি ছিলেন না,
তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি কণ্ঠের অংশ।
মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে
যখন পুলিশ বন্দুক তোলে,
তখনও তিনি পিছু হটেননি।
গুলিটা শুধু মাথার খুলি ভাঙেনি,
ভেঙে দিয়েছিল শাসকের মিথ।
রক্ত মাটিতে পড়তেই
বাংলা ভাষা প্রথম শহীদকে পেয়ে যায়।
তিনি পড়ে থাকেন রাস্তায়,
আর ইতিহাস উঠে দাঁড়ায়।
মৃত্যুর পরও তাকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হয়নি।
লাশ লুকানো হয়,
পরিবারকে দূরে রাখা হয়।
রাতের অন্ধকারে আজিমপুরে
নীরবে কবর দেওয়া হয়
একজন মানুষকে,
যিনি দিনে দিনে হয়ে উঠেছিলেন প্রতীক।
বছর কেটে গেছে।
রাষ্ট্র বদলেছে, মানচিত্র বদলেছে।
কিন্তু তাঁর নাম বদলায়নি।
গ্রাম তাঁর নামে,
সেতু তাঁর নামে,
পথচিহ্ন তাঁর নামে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
একটি ভবন আজও বলে দেয়
এই নাম শুধু ইতিহাস নয়, দায়িত্ব।
রফিকউদ্দিন আহমদ প্রমাণ করেছিলেন,
ভাষার জন্য মরতে হয় না সব সময়,
কখনও কখনও
ভাষাই মানুষকে বেছে নেয়
মরবার জন্য।


