আমার অবুঝ মা
আমার শিক্ষিকা মা যখন পড়িয়েছেন
তখন ফেইসবুক, ব্লগ কিংবা ইন্টারনেট ছিল না
ঈশ্বর ছিলেন কিনা সে নিয়ে সংশয় ছিল
কিন্তু বিরোধ ছিল না নানাবিধ ঈশ্বরে বিশ্বাসীদের।
তাহমিনা আর দিপালীদের মধ্যে টিফিন বিনিময় ছিল
ইস্কুলের পাশে দানেশ মিয়ার দোকানের বাঁশের বেঞ্চে
হুক্কা বিনিময় ছিল রহমালি আর পরেশ কাকার।
থৈ থৈ বর্ষায় বদর বদর মুখে ছিল ঢেউয়ে পরা মাঝিদের
জারি-সারি গানের সাথে নৌকা বিলাস ছিল এক মঞ্চেই।
কাদের মিয়ার অপূর্ব অভিনয় ছিল রাজা হরিশ্চন্দ্রের
পুত্র রোহিতাশ্বের লাশ নিয়ে শৈব্যা চরিত্রে মাহতাবের
ছিল গগনবিদারী কান্না; ছিল মন্টু কাকার বিষাদসিন্ধু পাঠ।
প্রবল কালবোশেখের ঝড়ে কিংবা তীব্র খরদাহে
বৃষ্টির প্রার্থনায় ছিল না কোনো ধর্মের রঙ।
প্রার্থনার বাণী ছিল ভিন্ন কিন্তু বিশ্বাস ছিল
সব আকুতিই একজনের কাছে পৌঁছে একদিন।
তখন একবারও মনে হয়নি হিন্দু পুরাণ আর
মুসলিম কোরআনের ভেদাভেদ কোথায়?
তখন লক্ষ্ণীর ঘটের একপাশে থাকতো নূরুদ্দিনের নৈবেদ্য
সাইঁবাবার দরগায় দিতেন নরেশবাবু শনি কাটাবার মানত।
বিরোধ ছিল না মানতে -নৈবেদ্যে। কারণ, তখনও ধর্ম ছিল
ধর্মগ্রন্থও ছিল যার যার, কিন্তু ঈশ্বর ছিলেন সবার।
তখন পূজা –পার্বন ঈদ- মোহররমে কোন দ্বন্ধ ছিল না
ধর্ম ছিল, ধর্ম বিশ্বাসও ছিল কিন্ত ছিল সব পেছনের
সামনে ছিল উৎসব, ছিল উদযাপন ;
চৈত্র সংক্রান্তির মেলা-হালখাতা –পহেলা বৈশাখ
নবান্ন কিংবা পৌষমেলায় ধর্মের কোন আবরণ ছিল না
কিন্তু আভরণ ছিল বাহারি ধূতির-লুংগিপাঞ্জাবির- শাড়ির-গহনার
অহংকার ছিল সম্মিলনের; গর্ব ছিল সংস্কৃতির।
বয়সের ভারে পিছিয়ে পড়ে একদিন অবসরে গেলেন মা
নূতনকে পথ করে দিলেন সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে।
তারপর দশক এগুলো একশ’ বছরকে পিছিয়ে দিয়ে
ইন্টারনেট এলো, ফেইসবুক, টুইটার, ব্লগ
আঙুলের চাপে গোটা বিশ্ব চোখের সামনে।
বয়সের ভারে নতজানু মায়ের সে কী উচ্ছ্বাস!
একটি শব্দার্থ খুঁজতে সেকালে যেখানে সারা বই পইপই
কত কষ্টে দেশ-মহাদেশ- সাগর- মহাসাগর খোঁজা;
অথচ কত সহজেই সংশয়ের উত্তর মেলে আজকাল
কত সহজেই অজানাকে জানা, সংশয় থেকে বিশ্বাস কত সহজেই।
অথচ আমার শিক্ষিকা মায়ের কিছুতেই বিশ্বাস হয় না,
দিন এগুচ্ছে কিন্তু মানুষ কেন যাচ্ছে পেছনে তবে?
হাঁপানির হাঁপর টেনে প্রশ্ন করেন মা
ফেইসবুক- ব্লগ- টুইটার- ইন্টারনেট- দ্রুতগতি
প্রগতি, আঙুলের চাপে গোটা বিশ্ব;
মানুষে মানুষে যদি না থাকে বিশ্বাস
এ আধুনিকতার সত্যি কি মানে আছে কোনো?


