শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

ভজন সরকারের উপন্যাস ‘চন্দ্রমুখী জানালা’

এক

ত্রিশ বছর পরে

স্বাধীনতার এত বছর পরে পড়ন্ত বেলায় বাবাকে স্বাধীন বাংলার’ ছেড়ে কেন যেতে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর তাকে কেউ দিতে পারছে না।

বাবা কবে ভারত গিয়েছিলেন আমার মনে নেই। শুনেছি দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে একবার ইন্ডিয়া গিয়েছিলেন আমার মাতৃকুলের সবাইকে জানান দিতে যে, তিনি বেঁচে আছেন। পাকিস্তানি হানাদার কিংবা দেশিয় রাজাকারের হাতে তার অপমৃত্যু হয়নি। এ কথা নাকি লোকমুখে সুদূর কলকাতাতেও চাষ হয়ে গিয়েছিল যে, মানিকগঞ্জের এক অজ পাড়াগাঁয়ের বটগাছে পাকিস্তানি মিলিটারিরা এক জনকে ঝুলিয়ে রেখেছে। কালো চেহারার ছয় ফুট মানুষটির ক্ষতবিক্ষত দেহ প্রথমে গুলি করে ঝাঁঝরা করা হয়েছে। তারপর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আরও বীভৎস করার চেষ্টা হলেও ঝুলিয়ে রাখা মানুষটিকে এলাকার সবাই চিনেছে। মৃত্যুর কথা যেমন হু হু বাতাসের বেগে চারিদিকে ছড়ায়, বাবার মৃত্যু সংবাদটিও তেমনি কলকাতা আদি ছড়িয়েছিল তখন।

এ মুক্তিযোদ্ধাটি নিজের জীবন বিপন্ন করে সদ্য জন্য নেয়া তার কন্যা সন্তানকে দেখতেই নাকি রাতের অন্ধকারে গ্রামে এসেছিলেন। যদিও তাঁর জানা ছিল পাকিস্তানি মিলিটারি ও তাদের সহযোদ্ধা আল-বদর আল-শামসের এলাকায় আনাগোনা। তবুও বড় এক অপারেশনের আগে সদ্য ভূমিষ্ট হওয়া কন্যা সন্তানকে দেখার ইচ্ছে অবদমিত করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই বর্ষাকালের থই থই জল পেরিয়ে বিলাঞ্চলের গ্রামটিতে এসে তিনি নাকি তাঁর কন্যা সন্তানটির দেখাও পেয়েছিলেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের শিশুটির মাথায় হাত রেখে তিনি। বলেছিলেন, আর একটু পরে এলেই তো স্বাধীন একটি দেশে জন্য নিতে পারতিস, পাকিস্তানে জন্ম নেবার কলঙ্ক মাথায় নিতে হতো না তোকে। ”

এটা থেকে ধরে নেওয়া যায়, নিহত মুক্তিযোদ্ধাটি আগস্ট কিংবা সেপ্টেম্বর মাসের কোনো এক রাতে তাঁর সন্তানকে দেখতে এসেছিলেন। কন্যা সন্তানটিকে দেখার কিছুক্ষণ পরেই তিনি বাড়ি থেকে বের হন এবং বিলের শেষ মাথায় রাজাকার ও পাকিস্তানি মিলিটারির প্রতিরোধের মুখে পড়ে আহত হন। পরে মৃত্যুবরণ করেন।

এ সংবাদটি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল তখন আমার ছোট বোনটির জন্মও সে বছরই আগষ্ট মাসে। মায়ের সন্তান সম্ভাবনার কথা কলকাতার সবাই জানতেন। তাই আনন্দবাজারের সংবাদটি পড়ে বাবার মৃত্যুর ব্যাপারে আমার মা সবাই নিশ্চিত হয়েছি মায়ের আত্মীয়-স্বজনেরা গয়ায় গিয়ে নাকি পিন্ড দানও করে এসেছিলেন আত্মার সদগতির উদ্দেশ্যে?

স্বাধীনতার মাস কয়েক পরে বাবা বেঁচে আছেন যে কথাটি জানানোর জন্যেই কলকাতা গিয়েছিলেন তখন। আমার দাদু বাবার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে গয়ায় গিয়ে যে পিও দান করেছিলেন, সে দানের দক্ষিণা ফেরত না চাইলেও বাবার ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসেই নদীয়া জেলার তারকনগরের এক প্রতিষ্ঠিত হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষকের পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাবার ধমনীতে তখন সদ্য-স্বাধীনতার রক্ত। বাবা নাকি আমার দাদুকে উল্টো প্রস্তাব দিয়েছিলেন, “আপনিই বরং ফিরে চলুন। ৬৫-তে দাঙ্গার সময়ে ফেলে আসা পুরনো ঢাকার বনেদী প্রণোজ হাইস্কুলের সেকেন্ড মাস্টারের চাকরিটাই আপনাকে ফেরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা যাবে।”

“উদ্ধত ব্যবহারই বটে ছোকড়ার”, স্বাধীনতার প্রায় তিন দশক পরে বুড়োর সঙ্গে দেখা হলে তিনি কলকাতার বাড়িতে বসে আমাকে একথা বলেছিলেন। আমি প্রতিবার যেমন হই এবারও বাবার দেশ প্রেমের চেতনায় গর্বিত হয়ে হেসেছিলাম। যদিও তখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কিয়দংশমাত্র অবশিষ্ট ছিল।

সে বছর বাবা কলকাতা থেকে অনেক কিছু এনেছিলেন বাড়ির সবার জন্য আমার জন্য এনেছিলেন ছোট এক জোড়া পিওর লেদারের জুতো। যুদ্ধ চলাকালীন ৯ মাস না দেখা আমি যে আর ছোটটি নেই, মুক্তিযোদ্ধা বাবা সেকথা বেমালুম ভুলে ছিলেন। তাই ছোট পিওর লেদারের জুতোজোড়া আমার আর পায়ে দেওয়া হয়নি কোনোদিন। প্রথম পাওয়া বিদেশি জিনিস ব্যবহার করতে না পারার সে আক্ষেপ এখনও আমার আছে।

একেবারেই শিশুর মাপে বানানো সুন্দর জুতা জোড়া আমি সযত্নে রেখেছি অনেকদিন। বাবার ব্রাশ নিয়ে বাবার মতো করে পালিশ করে ঝকঝকে তকতকে করে জুতো জোড়াটিকে তাকে তুলে রেখেছি বহুদিন। জুতোজোড়া যেন তখন আমার কাছে না দেখা কলকাতার প্রতিচ্ছবি। শিশু বয়সে শোনা মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য রোমাঞ্চকর কাহিনির মতোই ওই জুতো জোড়াও তখন আমার এক শিহরিত সম্পদ। বাবা যখন বলতেন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন একটি দেশের কথা, আমি তখন ভাবতাম আমার জীবনের প্রথম পাওয়া সে জুতোজোড়ার কথা। যদিও অর্জন আর পাওয়ার মধ্যে যে পার্থক্যটি আছে তা আমি তখনও বুঝিনি। দীর্ঘদিন পরে এসেও যে সঠিক বুঝেছি সেটাও বলা যাবে না।

কাকতালীয় ভাবেই ১৯৭৫-এর পরে বাবার কেনা সে ছোট জুতোজোড়া আমি আর খুঁজে পাইনি। না, কোথাও পাইনি না। বাড়ির আনাচে কানাচে, উঠোনের খানাখন্দে, এমনকি মায়ের গয়নার বাক্সেও। কোথাও পাওয়া যায়নি এক মুক্তিযোদ্ধার কেনা এক জোড়া ছোট পিওর লেদারের জুতো। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মতো মুক্তিযোদ্ধার কেনা সে জুতোজোড়াও যেন হারিয়ে গিয়েছিল একই সময়ে। কিন্তু ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসের বাবার ভারতযাত্রার সে কথাকাহিনি আজও পুবের জানালা দিয়ে চাঁদের আলোর মতো আমাকে উদ্ভাসিত করে।

( চলবে )

লেখক পরিচিতি

ভজন সরকার
ভজন সরকার
ভজন সরকারের জন্ম বাংলাদেশের ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের মামাবাড়িতে । বেড়ে উঠেছেন মানিকগঞ্জ জেলার পশ্চিমের জনপদে ।বাবা-মা দু’জনেই স্কুল শিক্ষক । ভজন সরকার মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনে। তারপর ঢাকা কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়(বুয়েট) এবং কানাডার উইন্ডসর ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পুনরায় স্নাতক এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর শেষে কানাডায় স্থানীয় সরকারী সংস্থায় প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন কানাডার ওন্টারিও প্রদেশের হ্যামিল্টন শহরে। বর্তমানে সিটি অব হ্যামিল্টনের ৩০ বছরের মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত। প্রথম বই ‘বিভক্তির সাতকাহন’ ‘মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশের পরই ব্যাপকভাবে আলোড়িত এবং আলোচিত সবমহলেই। প্রধানত কবি হ’লেও লিখছেন নিবন্ধ, কলাম ও উপন্যাস বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং সাপ্তাহিক পত্রিকায়। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হ’লোঃ বিভক্তির সাতকাহন ( প্রবন্ধ)- মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী; ক্যানভাসে বেহুলার জল ( কাব্য)- নন্দিতা প্রকাশ; বাঁশে প্রবাসে ( প্রবন্ধ রম্যরচনা)- নন্দিতা প্রকাশ ; রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে বসবাস (প্রবন্ধ)- নন্দিতা প্রকাশ; চন্দ্রমুখী জানালা ( উপন্যাস) - নন্দিতা প্রকাশ ।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা