বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক অভিধান অনুযায়ী রথ অর্থ চক্রযুক্ত যান; গাড়ি ৷ প্রাচীন অশ্বাদি-বাহিত যান ৷ প্রাচীন যুদ্ধ শকট বা যান ৷ হিন্দু দেবতা জগন্নাথের যান ৷ সহজভাবে চাকাযুক্ত ঘোড়া টানা হালকা যাত্রীবাহী গাড়ি ৷ এই গাড়িতে দুটি বা চারটি চাকা থাকতে পারে ৷ সাধারনত অভিজাত শ্রেণীর ঘোড়ার গাড়িকে রথ বলা হয় ৷ পৌরাণিক কাহিনীতে রথের ব্যবহার দেখা যায় যুদ্ধক্ষেত্রে ৷ মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সেনা নায়কেরা রথে চড়ে নিজের যুদ্ধ করেছেন এবং সেনাবাহিনীকে পরিচালনা করেছেন ৷
রথযাত্রা :
সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে রথ শব্দের অর্থ কিছুটা ভিন্ন ৷ শ্রদ্ধার দিক থেকেও উপরে ৷ তাদের কাছে রথ একটি কাঠের তৈরি যান, যাতে চড়ে স্বয়ং ভগবান এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করেন ৷ ভগবানের এই রথ আহোরনই রথযাত্রা নামে পরিচিত ৷ এই পবিত্র উৎসবটি প্রত্যেক বছর নির্দিষ্ট সময়ে উদযাপিত হয়ে থাকে ৷
হিন্দুদের অন্যতম প্রধান উৎসব হলো রথযাত্রা ৷ শাস্ত্রীয় মতে আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে জগন্নাথ (শ্রীকৃষ্ণ),সুভদ্রা ও বলরাম রথে চড়ে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পত্নী গুন্ডিচার বাড়ি যান (সেটাকে বলা হয় জগন্নাথের মাসির বাড়ি) এবং সাতদিন পরে সেখান থেকে আবার নিজের মন্দিরে ফিরে আসেন ৷ স্থানীয়ভাবে এটি মাসির বাড়ি যাওয়া নামেও পরিচিত ৷ রথে চড়ে ওই গমন (সোজা) ও প্রত্যাগমনকে উল্টো রথ বলা হয় ৷
অন্যান্য নাম :
রথযাত্রা পতিত-পাবন যাত্রা, নব যাত্রা, গুন্ডিচাযাত্রা, মহাবেদী যাত্রা ও নন্দীঘোষ যাত্রা নামেও পরিচিত ৷
রথের আরোহী :
রথ যাত্রায় জড়িয়ে আছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নাম ৷ প্রথমেই জানিয়ে রাখি জগন্নাথ এবং শ্রীকৃষ্ণ ভগবান বিষ্ণুরই দুই রূপ ৷ বলরাম বা বলভদ্র, শ্রীকৃষ্ণ বা জগন্নাথ এবং সুভদ্রা দেবী এই তিনজন একে অপরের ভাই বোন ৷ পুরাণে এমনটা বর্ণিত যে— তাঁদের তিন ভাইবোনের ঘনিষ্ঠ এবং স্নেহ পরায়ন সম্পর্কের জন্যই তাঁরা পূজনীয় ৷ রথযাত্রাও তাঁদেরকে কেন্দ্র করেই ৷
রথ যাত্রার প্রচলন :
রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল প্রায় সত্য যুগে বহু বছর আগে ৷ সে সময় ওড়িশা ছিল মালবদেশ ৷ সেই মালব দেশের অবন্তী নগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন ৷ যিনি ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথ রূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন ৷ পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীর এই জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ করেন ও রথ যাত্রার প্রচলন করেন ৷
মালব রাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন পরম বিষ্ণুভক্ত ৷ তিনি শ্রী ক্ষেত্রে একটি মন্দির করেছিলেন যা বর্তমানে জগন্নাথ ধাম নামে পরিচিত ৷ একদিন এক তেজস্বী সন্ন্যাসী তার রাজবাড়ীতে পদার্পণ করলেন ৷ রাজা সন্ন্যাসীর পরম সেবা-যত্ন করলেন ৷ সন্ন্যাসী ভারতবর্ষের নানা তীর্থের কথা বলে, পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের নীল পর্বতে ভগবান বিষ্ণুর পূজার কথা জানালেন ৷ এখানে ভগবান বিষ্ণু গুপ্তভাবে শবরদের (সাঁওতাল) দ্বারা নীলমাধব রূপে পূজিত হচ্ছেন ৷ নীলমাধব সাক্ষাৎ মুক্তি প্রদায়ক, তিনি মোক্ষ প্রদান করেন ৷
সন্ন্যাসীর কথা শুনে রাজা ভগবানের রূপ দর্শনে আকুল হলেন ৷ রাজা তার পুরোহিতের ভাই বিদ্যাপতিকে শবরদের রাজ্যে গিয়ে নীলমাধবের সন্ধান করে আনতে বললেন ৷ শবররাজ বিদ্যাপতিকে সাদর অভ্যর্থনা করে, অতিথি চর্চা করার জন্য কন্যা ললিতাকে দায়িত্ব দেন ৷ কয়েকদিন থাকার পর বিদ্যাপতি শবর রাজা বিশ্বাবসুর কন্যা ললিতার প্রেমে পড়েন ৷ ললিতা আর বিদ্যাপতির বিয়ে হয় ৷ এবার বিদ্যাপতি শ্বশুরের কাছে নীলমাধব দর্শনের অভিপ্রায় জানান কিন্তু শশুর তাকে বারণ করেন ৷ এদিকে জামাই নাছোড়বান্দা ৷ জামাইয়ের পীড়াপীড়িতে একদিন তিনি রাজী হন কিন্তু শর্ত এই যে বিদ্যাপতিকে চোখ বেঁধে সেখানে যেতে হবে ৷ বিদ্যাপতি রাজি হন কিন্তু গোপনে কিছু সরিষা নিয়ে যান ৷ যাওয়ার সময় সরিষা ফেলতে ফেলতে যান ৷
বিদ্যাপতির উদ্দেশ্য ছিল নীলমাধবকে পুরীতে নিয়ে যাওয়া তাই কিছুদিন পর সরিষা গাছ দেখে সেই পথেই নীলমাধব মন্দিরে পৌঁছান ৷ কিন্তু অন্তর্যামী নীলমাধব বিদ্যাপতির নাগাল থেকে অন্তর্ধান হন ৷
এরপর বিদ্যাপতি রাজাকে খবর পাঠালেন ৷ রাজা খবর পেয়ে সৈন্য সামন্ত নিয়ে নীলমাধব দর্শনে আসলেন ৷
রাজা এসে শুনলেন, নীলমাধব অন্তর্ধান হয়েছেন মতান্তরে শবররাজ সেটিকে লুকিয়ে রাখেন ৷
রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এতে খুব কষ্ট পেয়ে ভাবলেন—প্রভুর যখন দর্শণ পেলাম না তখন এই জীবন রেখে কি লাভ ?অনশনে প্রান ত্যাগ করাই শ্রেয় ৷
এই ভেবে রাজা কুশ শয্যায় শয়ন করলেন ৷সে সময় দেবর্ষি নারদ মুনি উপস্থিত হয়ে রাজাকে বললেন— “হে রাজন, তোমার প্রাণ ত্যাগের প্রয়োজন নাই ৷ ভগবান জগন্নাথ দেব দারু ব্রম্ম রূপে তোমার পূজা পাবেন ৷ স্বয়ং পিতা ব্রম্মা একথা আমাকে জানিয়েছেন ৷”
রাজা শুনে শান্তি পেলেন ৷ এক রাতে রাজা স্বপ্নে ভগবান বিষ্ণুর আদেশ পেলেন ৷ স্বপ্নে ভগবান শ্রী হরি বললেন—”হে রাজন, তুমি আমার প্রিয় ভক্ত ৷ ভক্তদের থেকে আমি কদাপি দূর হইনা ৷ আমি সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে তোমার নিকট আসছি ৷ পুরীর বাঙ্কিমুহান নামক স্থানে তুমি আমাকে দারু ব্রম্ম রূপে পাবে ৷”
রাজা সেই স্থানে গিয়ে দারু ব্রহ্মের সন্ধান পেলেন কিন্তু তাকে নাড়াতে পারলেন না ৷ রাজার আদেশে হাতি দিয়ে টানা হলো কিছু হলো না ৷ রাজা আবার হতাশ হলেন ৷
ভগবান বিষ্ণু আবার স্বপ্নে জানালেন— “হে রাজন, তুমি হতাশ হইও না ৷ শবররাজ বিশ্বাবসু আমার পরম ভক্ত ৷ তুমি তাকে সসম্মানে এখানে নিয়ে আসো, আরেকটি স্বর্ণরথ আনয়ন করো ৷
রাজা সেই মতো কাজ করলেন ৷ ভক্ত বিশ্বাবসু আসলেন ৷ বিশ্বাবসু,রাজা আর বিদ্যাপতি মিলে দারু ব্রম্মকে তুললেন ৷ ভক্তরা কীর্তন করল ৷ তারপর রথে নিয়ে আসা হল ৷
রাজা সমুদ্রে প্রাপ্ত দারুব্রহ্ম প্রাপ্তির পর গুন্ডিচা মন্দির নির্মাণ করে যজ্ঞ করলেন ৷ যজ্ঞ সমাপ্তে দেবর্ষি নারদ মুনির পরামর্শেই দারুব্রহ্ম বৃক্ষ কাটিয়ে জগন্নাথ,বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ তৈরিতে মনোনিবেশ করলেন ৷ এজন্য অনেক সুতোর কারিগরকে ডেকে পাঠানো হলো কিন্তু বৃক্ষের গায়ে হাতুড়ি, ছেনি ইত্যাদি ঠোকাতেই সেগুলো চূর্ণ হতে লাগল ৷ রাজা মহাসমস্যায় পড়লেন ৷
বিশ্বকর্মা মতান্তরে ভগবান বিষ্ণু এক বৃদ্ধ সুতোরের বেশে এসে মূর্তি তৈরিতে সম্মত হলেন ৷
এই সময় রহস্যময় বৃদ্ধ ছুতোর এসে বললেন—”হে রাজন, আমার নাম অনন্ত মহারানা ৷ আমি মূর্তি গড়তে পারব ৷ আমাকে একটি বড় ঘর এবং ২১ দিন সময় দিন,তবে আমার একটি শর্ত আছে আমি ২১ দিন দরজা বন্ধ করে কাজ করব ৷ সে সময়ে এই ঘরে কেউ যেনো না আসে, কেউ যেনো দরজা না খুলে ৷”
অপরদিকে মোটা পরিশ্রমিকের লোভে যারা এসেছিল তাদের নিরাশ করলেন না অনন্ত মহারানা ৷ তিনি বললেন— আপনি ইতিপূর্বে যেসকল কারিগর এনেছেন তাদের বলুন তিনটি রথ তৈরি করতে ৷
ছদ্দবেশী অনন্ত মহারানা ঘরে ঢুকলে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে সেখানে কড়া প্রহরা বসানো হলো ৷ যাতে কাকপক্ষীও ভিতরে না যেতে পারে ৷ ভেতরে কাজ চলতে লাগল ৷
কিন্তু স্বভাবে নারী জাতির মন চঞ্চল হওয়ায় রানী গুন্ডিচার মন মানেনা ৷ রানী ভাবলেন , আহা কেমনই বা কারিগর বদ্ধ ঘরে মূর্তি গড়ছেন ? কেমন বা নির্মিত হচ্ছে শ্রী বিষ্ণুর বিগ্রহ ? একবার দেখি আসি ৷ না একবার দেখলে বোধহয় কারিগর অসন্তুষ্ট হবে না ৷
এই ভেবে মহারানী ১৪ দিনের মাথায় মতান্তরে ০৯ দিনের মাথায় দরজা খুলে দিলেন ৷ কারিগর ক্রুদ্ধ হয়ে অদৃশ্য হল !
অসম্পূর্ণ জগন্নাথ,বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর মূর্তি দেখে রানী অবাক হলেন ৷ এ কি মূর্তি ? নীল নবঘন শ্যামল শ্রীবিষ্ণুর এমন গোলাকৃতি নয়ন, কালো মেঘের মতো গাত্রবর্ণ দেখে রাজরানী সংজ্ঞা হারালেন ৷
রাজার কানে খবর গেল ৷ রাজা রানীকে খুব তিরস্কার করলেন ৷ বদ্ধ ঘরের মধ্যে থেকে এমন কারিগরের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় বিচক্ষণ মন্ত্রী জানালেন-তিনি সাধারণ মানুষ না ৷ কোন না কোন দেবতা হবেন ৷
জগন্নাথ দেব:
বিষ্ণু ভক্ত রাজা তার আরাধ্য হরির এই রূপ দেখে দুঃখিত হলেন ৷ রাজাকে সেই রাত্রে ভগবান বিষ্ণু আবার স্বপ্নে বললেন— “আমার ইচ্ছায় দেবশিল্পী মূর্তি নির্মাণ করতে এসেছিলেন ৷ কিন্তু শর্ত ভঙ্গ হওয়াতে এইরূপ মূর্তি গঠিত হয়েছে ৷ রাজন,তুমি আমার পরম ভক্ত ৷ আমি এই অসম্পূর্ণ মূর্তিতে তোমার পূজা নেব ৷ আমি দারুব্রহ্ম রূপে পুরুষোত্তম ক্ষেত্রে নিত্য অবস্থান করবো ৷ আমি প্রকৃত হস্ত পদ রহিত,কিন্তু অপ্রাকৃত হস্ত পদ দ্বারা ভক্তের সেবা পূজা শ্রদ্ধা গ্রহণ করব ৷ আমি ত্রিভুবনে বিচরণ করি ৷ লীলা মাধুর্য প্রকাশের জন্য আমি এখানে এইরূপে অধিষ্ঠান করবো ৷ ভক্তেরা আমার এই রূপেই মুরলীধর শ্রীকৃষ্ণ রূপে দর্শন পাবেন ৷ যদি তুমি ইচ্ছা করো তবে ঐশ্বর্য দ্বারা সোনা-রুপার হস্ত পদাদি নির্মিত করে আমার সেবা করতে পারো ৷
সেই থেকে উল্টো রথের পর একাদশীর দিন ঠাকুরের সুবর্ণ বেশ রথের উপর হয় ৷ সেই বেশ দেখলে সাত জন্মের পাপ দূর হয় ৷ যা দেখতে লক্ষ লক্ষ ভক্ত প্রত্যেক বৎসর পুরীতে আসেন ৷
জগন্নাথ দেবের মূর্তি নিয়ে নানা কথা:
জগন্নাথ দেবের মূর্তি নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন আছে, কেন হস্তপদহীন দেহ তাঁর ? কেন এমন অদ্ভুত অবতার তিনি? এ প্রসঙ্গে কঠোপনিষদ বলা হয়েছে— ” না আত্মাং রথিং বিদ্দি শরীরং রথমেঠুত” অর্থাৎ এই দেহই রথ আর আত্মা দেহরূপ রথের রথী ৷
ঈশ্বর থাকেন অন্তরে ৷ তাঁর নির্দিষ্ট কোন রূপ নেই ৷ তিনি সর্বত্র বিরাজমান ৷ বেদ বলেছে—”অবাঙমানসগোচর”অর্থাৎ মানুষ বাক্য এবং মনের অতীত ৷ মানুষ তাই তাঁকে মানব ভাবে সাজায় ৷
এবিষয়ে কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে এর তৃতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে—
“অপানিপাদো জাবানো গ্রহীতা
পশ্যত্যচক্ষুঃ স স্মৃনোতকর্ণঃ ৷
স বেত্তি বেদ্যং ন চ তস্যাস্তি বেত্তা
তমাহুর গ্রং পুরুষং মহাত্তম ৷”
অর্থাৎ তাঁর লৌকিক হস্ত নাই,অথচ তিনি সকল দ্রব্য গ্রহণ করেন ৷ তাঁর পদ নাই অথচ সর্বদাই চলেন ৷ তাঁর চোখ নাই অথচ সবই দেখেন ৷ কান নাই কিন্তু সবই শোনেন ৷ তাঁকে জানা কঠিন ৷ তিনি জগতের আদি পুরুষ ৷ এই বামন দেবই বিশ্বাত্মা,তাঁর রূপ নেই , আকার নেই ৷
উপনিষদের এই বর্ণনায় প্রতীক রূপই হলো— পুরীর জগন্নাথ দেব ৷ তাঁর পুরো বিগ্রহ তৈরি করা সম্ভব হয়নি কারণ তার রূপ তৈরিতে মানুষ অক্ষম ৷ শুধু প্রতীককে দেখানো হয়েছে মাত্র ৷
জগতের নাথ জগন্নাথ সবার:
ভগবান বিষ্ণু বললেন— “হে রাজন, আমার আর এক পরম ভক্ত শবর রাজ বিশ্বাবসু ৷ আমাকে নীলমাধব রূপে পূজা করতো ৷ তারই বংশধররা আমার সেবক রূপে যুগ যুগ ধরে সেবা করবে ৷ বিদ্যাপতির প্রথম স্ত্রীর সন্তানগণ আমার পূজারী হবে আর বিদ্যাপতির দ্বিতীয় স্ত্রী বিশ্বাবসুর পুত্রী ললিতার সন্তান এর বংশধরেরা আমার ভোগ রান্নার দায়িত্ব নেবে ৷ আমি তাদের হাতেই সেবা নেবো ৷”
বিদ্যাপতি প্রথম রাজার আদেশে নীলমাধব সন্ধান করতে গিয়েছিলেন শবরদের দেশে বা সাঁওতাল ৷ যাদের আমরা ছোট বলে অবহেলা করি, ভগবান বিষ্ণু প্রথম তাদের দ্বারাই পূজা নিলেন ৷ অপরদিকে তিনি তাদের হাতে সেবার আদেশ দিলেন, ব্রাহ্মণ ও শূদ্র জাতির একত্রে মেলবন্ধন ঘটালেন স্বয়ং ভগবান ৷ সেজন্যই বলে পুরীতে জাতি বিচার নেই ৷ জগতের নাথ জগন্নাথ সবার ৷ বিদ্যাপতিকে শবরদেশে পৌঁছানোর জন্য এক রাখাল বালক বারবার পথ প্রদর্শন করেছিলেন, সেই রাখাল বালক আর কেউ নয় স্বয়ং বৃন্দাবনের রাখাল রাজা নন্দদুলাল ৷
ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নে ভগবান বিষ্ণুর কাছে প্রতিশ্রুতি দিলেন— “হে মধুসূদন প্রতিদিন মাত্র এক প্রহর অর্থাৎ তিন ঘন্টার জন্য মন্দিরের দ্বার বন্ধ থাকবে ৷ বাকি সময় মন্দিরের দ্বার অবারিত থাকবে যাতে তোমার সন্তান ভক্তেরা তোমার দর্শন লাভ করে ৷ সারাদিন আপনার ভজন চলবে আপনার হাত কদাপি শুষ্ক থাকবে না ৷ ভগবান বিষ্ণু রাজাকে তাই বড় দিলেন ৷ এবার ভগবান ভক্তের পরীক্ষা নিলেন, তিনি বললেন—”এবার নিজের জন্য প্রার্থনা করো তুমি আমার ভক্ত”
প্রকৃত ভক্তরা নিস্কাম, তাই কোন প্রকার সুখ ঐশ্বর্য তারা চান না ৷ রাজা একটি অদ্ভুত বর চেয়ে বললেন—’প্রভু আমাকে এই বর দিন যেন আমার বংশধরেরা কেউ আপনার দেবালয়কে নিজ সম্পত্তি বলে দাবি না করতে পারেন ৷’
ভগবান হরি তাই বর দিলেন ৷ জগন্নাথ মন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, প্রজাপতি ব্রহ্মা ৷ রথযাত্রার প্রচলনের ইতিহাস এটাই ৷
পুরীর রথের কিছু বৈশিষ্ট্য:
স্কন্দপুরাণে সরাসরিভাবে জগন্নাথ দেবের রথ যাত্রার কথা পাওয়া যায় ৷ সেখানে পুরুষোত্তম ক্ষেত্র মাহাত্ম্য কথাটিতে উল্লেখ করে মহর্ষি জৈমিনি রথের আকার, সাজসজ্জা ও পরিমাপ ইত্যাদির বর্ণনা দিয়েছেন ৷ পুরুষোত্তম ক্ষেত্র বলতে পুরীকেই বোঝায় ৷
পুরীতেই জগন্নাথ দেবের মন্দির স্থাপিত ৷ তাই এই মন্দিরকে পবিত্রতম স্থান বলে মনে করা হয় ৷ এর কিছু নিয়ম কানুন আছে—
* প্রতিবছর রথ যাত্রার উদ্বোধন করেন সেখানকার রাজা ৷ রাজত্ব না থাকলেও বংশ-পরম্পরা ক্রমে পুরীর রাজপরিবার আজও আছে ৷ সেই রাজপরিবারের নিয়ম অনুসারে যিনি রাজা উপাধি প্রাপ্ত তিনিই পুরীর রাজা ৷
* জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার পরপর তিনটি রথের সম্মান, পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করেন রাজা এবং সোনার ঝাড়ু ও সুগন্ধি জল দিয়ে রথের সম্মুখভাগ ঝাট দেন ৷
* তারপরই পুরীর রথের রশিতে টান পড়ে ৷ শুরু হয় জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা ৷ তিনজনের জন্য আলাদা আলাদা তিনটি রথ আলাদা নিয়মে তৈরি করা হয় ৷ এবার নিয়মগুলো জানি—
# প্রথমে যাত্রা শুরু করে বড় ভাই বলভদ্র বা বলরামের রথ ৷ এই রথের নাম তাল ধ্বজ ৷ রথটির চৌদ্দটি চাকা, উচ্চতা ৪৪ ফুট,রথের আবরণের রং নীল ৷
# তারপর যাত্রা করে বোন সুভদ্রার রথ ৷ রথের নাম দর্পণদলন ৷ উচ্চতা ৪৩ ফুট ৷ এই রথের মোট বারোটি চাকা ৷ রথের পতাকায় পদ্মচিহ্ন আঁকা হয়েছে তাই রথ টিকে পদ্মধ্বজও বলা হয় ৷ রথের আবরণ লাল ৷
# সর্বশেষ থাকে শ্রীকৃষ্ণ বা জগন্নাথ দেবের রথ ৷এর নাম নন্দীঘোষ ৷ পতাকায় কপিরাজ হনুমানের মূর্তি আঁকা রয়েছে তাই এ রথের নাম কপিধ্বজ ৷ রথটির উচ্চতা ৪৫ ফুট ৷ এতে ১৬ টি শাখা আছে ৷ আবরণের রং হলুদ ৷
তিনটি রথের আবরণের রং আলাদা হলেও প্রতিটি রথের উপরিভাগ লাল রঙের হয়ে থাকে ৷ রথ তিনটি জগন্নাথ মন্দির হতে প্রায় তিন মাইল দূরে গুন্ডিচা মন্দির এর উদ্দেশ্যে রওনা হয় ৷
পুরীর রথের আশ্চর্য দিক:
রথ যাত্রার সময় প্রায় ১৫-২০ লক্ষ হিন্দু ধর্মালম্বী রথ যাত্রায় অংশ নিতে দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসেন পুরীতে ৷ শাস্ত্রে বর্ণিত আছে—”রথস্থ বাম নং দৃষ্টা পুর্নজন্ম ন বিদ্যতে ৷” অর্থাৎ রথের উপর অধিষ্ঠিত বামন জগন্নাথকে দর্শন করলে তার পুর্নজন্ম হয়না তাই রথের দড়ি টানাকেও পুণ্যের কাজ হিসাবে গণ্য করেন ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা৷
ভক্তদের বিবৃতি অনুযায়ী কিছু আশ্চর্য তথ্য রয়েছে
পুরীর রথ উৎসবে—
* পুরীতে রথের সময় এমন কোন বছর নেই যে রথের দিন বৃষ্টি হয়নি ৷
* কোনরকম আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই রথ নির্মাণ করা হয় ৷ বর্তমান সময়ে এত উন্নত প্রযুক্তির বিন্দুমাত্র সহায়তা নেওয়া হয়না রথ তৈরিতে ৷
* রথ নির্মাণের নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য মাপগুলো হাতে নেওয়া হয় কোন গজ ফিতার সাহায্যে নয় ৷ কোন প্রকার পেরেক, নাট-বল্টু, ধাতুর ব্যবহার নেই এখানে ৷
* প্রায় ১৪০০ কর্মী রথ নির্মাণ করেন ৷ এখানে কাউকে আলাদা করে নিয়োগ করতে হয় না কেননা সেই আদিকাল থেকে বংশপরম্পরায় যারা রথ তৈরি করে আসছিল তারা আজও রথ তৈরি করছে ৷
* রথ তিনটিতে বলরাম, সুভদ্রা ও জগন্নাথের মূর্তি থাকে ভেতরে ৷ যা নিম কাঠ দিয়ে তৈরি এবং প্রায় ২০৮ কেজি সোনা দিয়ে সজ্জিত ৷
* রথ তৈরিতে যে সমস্ত কাঠ ব্যবহার করা হয় তার উৎস পুরীর একটি পাশের বন ৷ যে পরিমাণ গাছ থেকে কাঠ আনা হয় তার দ্বিগুণ পরিমাণ গাছ রোপন করা হয় প্রতিবছর ৷
বাংলায় রথযাত্রা:
বাংলায় রথ প্রচলনের আবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন ৷ পুরীর জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা থেকে বাংলায় রথ যাত্রার সূচনা করেন চৈতন্য মহাপ্রভু ৷ চৈতন্য মহাপ্রভু নীলাচল থেকে এই ধারাটি বাংলায় নিয়ে আসেন ৷ চৈতন্য ভক্ত বৈষ্ণবরা বাংলায় পুরীর অনুকরণ করে রথযাত্রার প্রচলন করেন ৷ এখন বাংলার সব জায়গাতেই এই রথযাত্রা অত্যন্ত প্রিয় ৷
বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই রথযাত্রা উদযাপন করা হয় ৷ এতে ধারেকাছের গ্রাম, উপজেলা ও জেলার হিন্দুধর্মাবলম্বীরা সমবেত হন এবং উপভোগ করতে আসে সর্ব বর্ণের মানুষ ৷ বাংলাদেশের ধামরাইয়ের রথ সবচেয়ে বড় এবং বিখ্যাত ৷ ঢাকার ইসকন বর্ণিল রথ যাত্রার আয়োজন করে থাকে ৷
বিশ্বজুড়ে রথযাত্রা:
ভারতের ওডিশা ও পশ্চিমবঙ্গের রথ উৎসব বিশেষ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয় ৷ ভারতের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ রথযাত্রা পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদল শ্রীরামপুর শহরের মাহেশের রথযাত্রা,গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবনচন্দ্র মঠের রথ, কলকাতা ও বাংলাদেশের ইসকনের রথ ৷ এছাড়াও বিশ্বের অনেক হিন্দু এলাকাতেই রথ উৎসব পালন করা হয় ৷ নিউইয়র্ক, টরেন্টো, লন্ডন ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় ৷
তাৎপর্য:
রথকে কেন্দ্র করে মেলা বসে বিভিন্ন স্থানে ৷ এতে নানা ধর্মের,নানা বর্ণের, নানা কর্মের লোকজনের মিলন ঘটে ৷ বিভিন্ন লোকজনের কর্ম সংস্থানের সুযোগ ঘটে ৷ রথের সাথে কলা ও লটকনের বিশেষ সম্পর্ক আছে ৷ তাই প্রচুর কলা ও লটকন বিক্রি করা হয় রথ উৎসবে ৷ শুকনো খাবার—খই-মুড়ি,মুড়কি,জিলাপি, আমিত্তি প্রচুর বিক্রি হয় ৷ হাড়ি পাতিল ,পুতুল, কাপড়ের পুতুল, বাচ্চাদের খেলনা, তৈজসপত্র ও কাঠের জিনিসপত্র বিক্রি করা হয় ৷
এটা সার্বজনীন উৎসব ৷ আনন্দ উৎসব ৷ যেখানে ধনী-গরীব, উচ্চ-নিচু,নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অবাধ মেলামেশায় মেতে ওঠে ৷ শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ শাসিত সমাজ ও শুধুমাত্র উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে রথযাত্রা সীমাবদ্ধ নয় ৷ সমাজের সবার শক্তির সঙ্গে রথের চাকা গতি পায় ৷
সামগ্রিক বিচারে রথযাত্রা সমাজের সামনের দিকে এগিয়ে চলার প্রতীক ৷ সামাজিক ন্যায়-নীতি ও দায়দায়িত্ব থেকে কোন অংশকে বাদ দিলে সমাজের সামনের দিকে এগিয়ে চলার পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে ৷ সমাজ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে ৷ সমাজ তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে ব্যর্থ হয় ৷ ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ যদি নিশ্চিত হয় তবেই সমাজ সামনের দিকে এগিয়ে চলে ৷
এক কথায় বলতে গেলে—রথযাত্রা সমাজকে এক সুরে বেঁধে সমষ্টিগত ভাবে বাঁচতে উদ্বুদ্ধ করে ৷(সংক্ষেপিত)
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
তথ্য সহায়কঃ সনাতন ধর্মীয় বিভিন্ন পুস্তক ও পত্রিকা ৷


