রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

নন্দিনী অধিকারীর গল্প ‘স্বপ্নের তারাগুলি’

“ওয়েল কাম টু ব্যাঙ্গালোর স্যর, ম্যাডাম। আয়্যাম ইয়োর ড্রাইভার কাম ট্যুর গাইড, রাজকুমার।”

ব্যাঙ্গালুরু এয়ার পোর্টে এভাবেই তার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ। আমাদের গন্তব্য কুর্গ। পশ্চিমঘাট পর্বতের কোলে কর্ণাটকের কোদাগু জেলার সুন্দর পার্বত্য শহর।

রাজকুমারের গাড়িতে উঠেই মন প্রসন্নতায় ভরে গেল। যেন সকাল সকাল দক্ষিণ ভারতের কোন মন্দির দর্শনে এসেছি। চন্দন আর কুঙ্কুমের হালকা সুরভি, সঙ্গে খুব মৃদু ভ্যলুমে শুভলক্ষ্মীর কণ্ঠে মীরার ভজন। আমি আর প্রতিম চোখ চাওয়াচাওয়ি করলাম।

গাড়ি ব্যাঙ্গালোরের ব্যস্ত পথ ছাড়িয়ে সবুজ পথ ধরল। পথে পড়ল রামনগর। রাজকুমার বলল, “শোলের গব্বর সিংয়ের ডেরা তৈরি হয়েছিল এখানেই। এটাও এখন একটা ট্যুরিস্ট স্পট হয়ে গেছে”। ছড়ানো, ছিটোন বড় বড় পাথরের টুকরোয় জায়গাটা একেবারেই অন্যরকম। রুক্ষতার আবরণে জড়ানো।

রামনগর পেরোতেই রাস্তার ধারে ধারে আমাদের ছোটবেলার খেলনার রঙিন পশরা। কাঠের তৈরি রঙিন ঝুমঝুমি, গাড়ি, খেলনাবাটি, বাড়িঘর, পুতুল, হাতিঘোড়া। দোদুল দুল বড় কাঠের ঘোড়া, ছোটবেলায় যার পিঠে দুলেছি। আমাকে উল্লসিত দেখে রাজকুমার জানাল, “এই খেলনাগুলো এই রামনগর জেলাতেই তৈরি হয়। সেই টিপু সুলতানের সময় থেকে। সুলতানী শখেই সেসময় থেকেই পুতুলগড়ার কারিগরদের কাজের গুরুত্ব বাড়ল। রুজি রোজগার হল। রামনগরের খেলনা পৌঁছল কত ছোটদের খেলাঘরে।”

গাইডদের এ খবরও জানতে হয়! টিপু সুলতানের পুতুল প্রীতিও রাজকুমারের অজানা নয়! অথচ তার ছোটোবেলার জগতে না ছিল রঙিন গাড়িঘোড়া, না খেলনাপুতুল।

আমি ঐ রঙিন হাতছানির লোভ সামলাতে পারলাম না। গাড়ি দাঁড় করিয়ে কতগুলি রঙিন কাঠের বালা কিনলাম।

এরপরের পথ আরো সবুজ, মসৃণ। সঙ্গে রাজকুমারের মধ্যম গতির ড্রাইভারি। বেলা বাড়তে গাড়ির ভিতরে জগজিৎ সিং, যেসু দাস, হরিহরণের গজলের মূর্ছনা।

এরপর আরো তিনদিন রাজকুমারের সঙ্গে আমাদের কুর্গ ভ্রমণ। কফি ক্ষেতের চোখ জুড়নো সবুজ উপত্যকায় চোখের ক্লান্তি দূর হল। কাবেরী নদীতে ভেলায় ভাসলাম। অ্যাবি জলপ্রপাতের সামনে ছবি তোলা হল। মেঘের ঘেরাটোপে কাবেরী নদীর উৎসস্থলে চুড়োকরে চুলবাঁধা, কাসাভু শাড়িপরা মেয়েরা পুজো দিতে এল। বৌদ্ধ মন্দির দর্শন হল… যতটুকু তিনদিনে দেখে নেওয়া যায়, সবটাই রাজকুমার দেখালো। রাজকুমারের কথায়, এটাই স্বর্গ। তার স্বপ্নের বাসভূমি।

তার বাহনটিও ছিল সন্তানের মত। পরম যত্নে তার লালনপালন করত সকালসন্ধ্যে। ঝকঝকে তকতকে গাড়িটিতে তার ভালোবাসার স্পর্শ লেগে থাকত।

সন্ধ্যেবেলা কাঠের সুন্দর বাংলোর হাতায়, তারাভরা নীল আকাশের নীচে বসে রাজকুমার তার জীবনের গল্প শোনাত আমাদের। তখন বাতাসে বাংলোর বাগান থেকে ভেসে আসত ফুলের গন্ধ। কিচেন থেকে কেরালার রাঁধুনির কারিপাতার ফোড়ন আর নারকেল দুধের চিকেন স্টুয়ের সৌরভ।

ব্যাঙ্গালোরের দরিদ্র, কন্নড় পরিবারের ছেলেটির নামটিই ছিল যেন তার কাছে উপহাস। অনেক ভাইবোনের সংসারে খাওয়াপরাই অপ্রতুল ছিল। তাই পড়াশোনার ইতি ক্লাস ফাইভেই। সেই কচি বয়সেই কাকার হাত ধরে মুম্বাই পাড়ি। দুটো পয়সা রোজগারের আশায়। সেখানে দিনের বেলা চার্চগেট স্টেশনে জুতো পালিশের কাজ। রাতে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে স্বপ্ন দেখা। যেভাবেই হোক নিজের ভাগ্য ফেরাতেই হবে। তারপরে অনেক ঘাটের জল খেয়ে কি করে জানি তাজ হোটেলের গাড়ির ড্রাইভারের হেল্পার হয়ে উঠেছিল রাজকুমার। পরের সুযোগে ড্রাইভারের পদে উত্তরণ।সেখানেই ইংরিজি এবং হিন্দি বলায় পারদর্শিতা অর্জন করেছিল প্রাণের দায়ে। একটি সুস্থ, সুন্দর রুচির প্রকাশ হল। হয়তো নিজের মধ্যেই সে লালন করত বাল্যাবধি। বেশ কয়েক বছর মুম্বাই বাসের পর, কিছু পয়সা সঞ্চয় করে আবার ব্যাঙ্গালোরে ফিরে এল রাজকুমার। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে চাপল। কুর্গের ভ্রমণ সংস্থায় কাজ নিল। মুম্বাই তাজের নোনা হাওয়া লেগে রাজকুমার ততদিনে চোস্ত ইংরিজী বলা, কেতাদুরস্ত এক মানুষ।

“মুম্বাইয়ের ঠাটঠমক, ব্যাঙ্গালোরের সফিস্টিকেশন আমাকে আর টানে না স্যর। কুর্গ আমার স্বপ্নের দেশ। ভালোবাসার জায়গা। এখানকার ভিজে, সবুজ মাটির মায়ায় আমি জড়িয়ে পড়ছি”, এ’কথা বলতে বলতে রাজকুমার কেমন উদাস হয়ে যায়।

স্বপ্ন দেখা এখনো শেষ হয় নি রাজকুমারের। কুর্গে নিজস্ব একটি ভ্রমণ সংস্থা খোলার ইচ্ছে আছে তার। এই নিরালা, সবুজ স্বর্গরাজ্যে হবে তার নিজের একখন্ড জমি। যেখানে চাষ হবে কমলালেবু, কফি। রাজকুমার, তার বাবা-মা, পুরো পরিবার সবাই মিলে এই সবুজ উপত্যকায় বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে সে। আরো একটি দুরাশা, যেটি আকাশের তারার মতই অনেক উঁচুতে, সেটি হল একটি মার্সিডিসের মালিক হওয়া। জানিনা, তার স্বপ্ন পূরণ কবে হবে?

তবে, তারাভরা নীল আকাশের নীচে বসে সে যখন ঐ স্বপ্নের কথা বলত, তখন কেমন জানি আমার ভিনসেন্ট ভ্যানগগের এই starry night ছবিটির কথা মনে হত। কেউ অসাধারণ প্রতিভা নিয়ে, অসামান্য সৃষ্টির পরেও জীবনে প্রতিষ্ঠা পায় না। কেউ শূন্য থেকে শুরু করে তারা ছুঁতে চায়। কোন তারা খসে পড়ে মাঝপথেই, কোন তারা তার অক্ষপথ পরিবর্তন করে। কোন কোন তারা আজীবন আমাদের আলো দিয়ে যায়, আর আমরা সেই আলোয় আলোকিত হতেই থাকি, হতেই থাকি….।

লেখক পরিচিতি

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা