বাঙালি একটি জাতিগোষ্ঠীর নাম, যাদের একটা সাধারণ বা কমন শেকড় বা মূল আছে, একটা কমন ঐতিহ্য আছে, কমন ভাষা আছে , এক সময় একটা কমন ভূখন্ডও ছিল।
একটি জাতিগোষ্ঠীর মানুষের ধর্ম আলাদা হতে পারে, নাগরিকত্ব আলাদা হতে পারে। কালের বহমানতায় ধর্ম এবং নাগরিকত্ব পরিবর্তনও হতে পারে যেমন, গাংগেয় ব-দ্বীপের বাঙালি জাতির হয়েছে। বাঙালির ধর্ম বিশ্বাস এবং নাগরিকত্ব অনেকবার বদলে গেছে । আগামীতেও দেশ বদলে যেতে পারে, ধর্ম বদলে যেতে পারে; পূর্বেও যেমন বদলেছে।
আজকের বাঙালির যেখানে বাস, তা মূলত বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ। অর্থাৎ বাঙালির সাথে বাংলা বা বঙ্গের কিছুটা মিল দেখা মেলে। অথচ আগে বাংলা বা বঙ্গ বলে আলাদা কোনো অঞ্চল ছিল না। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে দেশের নাম পরিবর্তন হলো। নিকট অতীতে ব্রিটিশ ভারত থেকে ভারত এবং পূর্ব পাকিস্তান হলো এবং পরে এখনকার বাংলাদেশ। অধিকাংশ বাঙালির নাগরিকত্ব বদল হলো মাত্র ৭০ – ৮০ বছরেই বেশ ক’বার।
ধর্ম বিশ্বাসও বদল হয়েছে অধিকাংশ বাঙালির বেশ কয়েকবার। অধিকাংশ বাঙালির বর্তমান ধর্মীয় বিশ্বাস যা মূলত সনাতন ( হিন্দু), বৌদ্ধ এবং ইসলাম ( মুসলমান) , সেটাও নানা সময়ে বদলেছে।
দেশ বদল হয়েছে, ধর্ম বিশ্বাস বদল হয়েছে কিন্তু আমাদের জাতিসত্ত্বা যার নাম বাঙালিত্ব, সে বাঙালি পরিচয় বদল হ’বার নয়।
তাই নাগরিকত্ব বিচারে আমরা কেউ বাংলাদেশী, কেউ ভারতীয়, কেউ আমেরিকান, কেউ কানাডিয়ান, কেউ কেউ অন্যান্য দেশের নাগরিক। আবার ধর্ম বিশ্বাসে কেউ সনাতনী বা হিন্দু, কেউ মুসলমান, কেউ বৌদ্ধ, কেউ খৃস্টান ,কেউ ধর্ম বিশ্বাসই করি না। কিন্তু জাতিসত্ত্বায় আমরা সবাই বাঙালি। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেনো, যে মত বা পথ অনুসরণ করি না কেনো, আমাদের বাঙালি পরিচয় ঘুচবার নয়। আমরা হাজারো চেষ্টা করেও ব্রিটিশ, জার্মান, ডাচ কিংবা আফ্রিকান হতে পারবো না।
আজ যারা বাঙালির কৃষ্টি-ঐতিহ্যকে অস্বীকার করতে চায়, তারা হাজারো চেষ্টা করেও আরব, আফগান, পাঞ্জাব, তামিল কিংবা ইউরোপিয়ান হতে পারবে না। ধর্ম শাখা মাত্র; মূল গাছটি নয়। মূল বা শেকড় হলো নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট, যার নাম বাঙালি জাতিসত্বা।
পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা উদযাপন নিয়ে বাংলাদেশে যা হচ্ছে, এগুলো নিছক নিজের শেকড় অস্বীকার করার অপচেষ্টা মাত্র। এ রকম অপপ্রয়াস ইতিহাসের পরতেপরতে লেখা আছে কিন্তু সফল হয়নি। কারণ, মানুষ সব কিছু অস্বীকার করতে পারে কিন্তু নিজের শেকড়কে ইচ্ছা করলেও অস্বীকার করে টিকে থাকতে পারে না, পারে নি এবং পারবেও না ৷


