পাঁচ.
পাকিস্তানি মিলিটারির টার্গেট হিন্দুসমাজ
আষাঢ় মাসেই আরও কয়েকটি হত্যাযজ্ঞ ঘটালো পাকিস্তানি মিলিটারি। ততদিনে মহকুমা সদর থেকে থানা পর্যায়ে পাকিস্তানি মিলিটারি চলে এসেছে। সে সুযোগে স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বারেরা ইউনিয়নে ইউনিয়নে শান্তি ও পাকিস্তান রক্ষার নামে পিস কমিটি গঠন করছে। শান্তি রক্ষা তো নামে মাত্র। পিস কমিটির সদস্যদের প্রধান কাজই হলো পাকিস্তানি মিলিটারির নামে হিন্দু এলাকায় ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি-বাড়ি, টাকা-পয়সা লুটপাট করা।
ঘিওর থানা সদরের রথযাত্রা উৎসব মানিকগঞ্জ মহকুমায় খুব বিখ্যাত। ধামরাইয়ের পরেই ঘিওরের রথযাত্রা। এলাকায় প্রচলিত আছে যে, বালিয়া জমিদার ঢাকা জেলার সব এলাকা থেকে শতাধিক কাঠমিস্ত্রী ডেকে এনে এক বছরেরও অধিক সময় ধরে ধামরাইয়ের রথ তৈরি করান। ৬০ ফুট উঁচু, ৪৫ ফুট চওড়া তিন তলা বিশিষ্ট বিশাল এ রথে ৩২টি বিশাল বিশাল কাঠের চাকা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার চতুর্কোণে সুসজ্জিত কামরা বা নবরত্ন। রথের সামনে ও চারপাশে কাঠে হুদাই করা হিন্দু দেব-দেবীর চিত্র। ধামরাইয়ের প্রায় সব রাস্তায় তখন এ রথ টানা হতো। আর ভক্তরা রাস্তার দুই দিকে দাঁড়িয়ে
উলুধ্বনির সাথে সাথে বাতাসা-কলা-চাল ছিটিয়ে দিত।
ধামরাইয়ের রথ আগে ছিল বাঁশের তৈরি। কাঠের এই নতুন রথ উদ্ভবোধনের সময় বালিয়াটির জমিদারবাহাদুর এলাকার ব্রাহ্মণ ও আশপাশের জমিদারদের নিমন্ত্রণ করলেন। নিমন্ত্রণের ত্রুটির জন্য তেরতীর জমিদার কালীনারায়ণ রায় চৌধুরী দুত হয়ে নিমন্ত্রণ প্রত্যাখান করলেন। পরের বছরই ভেরীর কাছে ঘিওরের থানা সদরে আরেকটি জগন্নাথের বহু তৈরি করালেন। সীমিত অর্থের জন্য তিনি ধামরাইয়ের রথকে অতিক্রম করতে তো পারলেনই না। এমনকি ঘিওরের রং উচ্চতা ও আয়তনে ধামরাই রথের সমানও হলো না। কিন্তু তিনি ধামরাই রথ যাত্রার দিনেই ঘিওরের রথের চাকাও টানাতেন, যেন তার প্রজারা ধামরাই রথ দর্শণে না যেতে পারে।
সেবার রথ যাত্রার দিন সন্ধ্যাবেলায় পাকিস্তানি মিলিটারি ঘিওর বাজারের হিন্দুদের দোকানপাটে হামলা করলো। সাহা পরি পুড়িয়ে দিলো। দূর-দূরান্ত থেকে রথ যাত্রায় আগত পূন্যার্থীরা কোনো রকমে পালিয়ে বাঁচল। কিন্তু পরের দিন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে পাকিস্তানি মিলিটারি ও রাজাকারদের নৃশংসতার খবর জেনে সবাই শিহরিত। ঘিওরের সাহা পট্টিতে আগুন দিয়ে ফেরার পথে রাজাকার-আলবদরের লোকেরা নিতাই সাহাসহ আরও কয়েকজনকে ধরে নিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে তুলে দেয়। পরে থানার সামনে খালপাড়ে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে এরকম দশজনকে হত্যা করলো।
ঘিওর থানা সদর থেকে বিশ-পঁচিশটি পরিবার আশ্রয় নিল আমাদের বিল এলাকার গ্রামগুলোতে। সবাই তখন এক ভয়ানক আতঙ্কে। থানা সদরে পাকিস্তানি মিলিটারি আসবে এটা অনেকেই বিশ্বাস করেনি। তাই এক রকম স্বস্তির সাথেই সবাই বাস করছিল। শুধু রাজাকার ও শান্তিরক্ষা কমিটির লোকদের থেকে একটু সাবধানে চলা ফেরা। কিন্তু ঘিওরে পাকিস্তানি মিলিটারি এ্যাটাকের খবরে মুক্তিবাহিনীও হতচকিত হয়ে গেছে। ক্যাপ্টেন হালিম ও কমান্ডার মনসুরের নেতৃত্বে মানিকগঞ্জ সদরের উপকণ্ঠে তরাঘাটে একটা ব্যর্থ অপারেশন হয়েছে। বাবা সবার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কমান্ডার হাকিম উদ্দিন তথা বাবার প্রিয় হাকিম ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ নেই। যে সীমিত অস্ত্র ও স্ব প্রশিক্ষণ তাতে থানা সদরে পাকিস্তানি মিলিটারির সাথে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। তাই শওকত চেয়ারম্যান ও রাজাকার কালুকে চোখে চোখে রাখাই এলাকার মুক্তিবাহিনীর কাজ।
একদিন সন্ধ্যায় বাবা ফিরলেন স্কুল থেকে। ক্লাশ নেই, ছাত্র ছাত্রীরাও কেউ স্কুলে যায় না। তবুও স্কুলে যাবার নাম করে বাবা তাঁর স্কুলে সদ্য নিয়োগ পাওয়া অনিল শিকদারকে নিয়ে নৌকা করে সকালে বের হোন। যদিও একজন মাইনে করে রাখা আছে সারা বর্ষাকালের জন্য। প্রতিদিন নৌকা চালিয়ে বাবাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়াই তার কাজ। মফস্বলে শিক্ষকতায় এক ধরণের বনেদিপনা থাকে। স্কুল কলেজের শিক্ষকেরা তাই কেউ নৌকা চালিয়ে কোথাও যান না। সমূহ বিপদে পড়লেও না। একা একা কখনও কখনও নৌকা বাওয়া যায় কিন্তু কাউকে নৌকায় যাত্রী হিসেবে বসিয়ে নৌকা চালালে সেটা বিরাট এক অসম্মানজনক কাজ। কিন্তু এ যুদ্ধের দিনে জীবন বাঁচানোই আগে জরুরি। তাই অনিল শিকদারকে ডিঙি
নৌকার পেছনের গলুইয়ে বৈঠা দিয়ে বসিয়ে বাবা সামনের গলুইয়ে আরেক বৈঠা নিয়ে প্রতিদিন সকালে বের হয়ে যান।
পূর্বপাশে আমাদের গ্রাম লাগোয়া একটি গ্রাম জুগিন্দা শওকত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে মুসলিম লীগের শক্ত ঘাঁটি আগে থেকেই সে গ্রামটিতে। ভূমিদার পাশ দিয়েই একটি খাল চলে গিয়ে নিমাই দিলে পড়েছে। প্রায় আধা মাইল এ নিমাই বিলটি পার হলেই আরেকটি গ্রাম। প্রায় চার পাঁচ হাজার লোকের বাস সেখানে। মুসলমান প্রধান এ গ্রামটিই মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি। এ গ্রামের পরেই তেরশ্রীর জমিদার বাড়ি। বাবার কর্ম ও আড্ডার স্থল সেখানেই।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরেই থমথমে মেজাজ বাবার। ঘটনা বোঝা গেল আরেকটু রাত বাড়লে বাড়ির সামনে বৈঠক ঘর। সেখানে গোল হয়ে বসে বিবিসি ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনে প্রতিরাতে পাড়ার অনেকেই। সেই সাথে আকাশবাণীর সংবাদ দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায় আর নীলিমা স্যান্নালের কণ্ঠের সংবাদ শুনতেও আগ্রহ সবার। সেদিন রাতে বিবিসি ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনা বন্ধ। গলার স্বরও সবার নিচু।
অনিল মাস্টার শুরু করলেন,”কালুর এত বড় সাহস,দাদাকে সে বলেছে,স্যার আর কতদিন এ দেশে থাকবেন ? এবার ইন্ডিয়া কেটে পড়েন৷”
দাদা মানে বাবাকে ইন্ডিয়া যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কালু রাজাকার। বাবাও নাকি কালুকে আচ্ছা মতো ধমক দিয়ে শাসিয়ে এসেছেন। বলেছেন, “তুই নিজের পথ দেখ কালু। আমার পথ তোকে বাতলে দিতে হবে না।”
কালু রাজাকার নাকি রাগে গরগর করতে করতে চলে গেছে। সবার মনে আশঙ্কা কালু যে কোনো অঘটন ঘটাতে পারে এ পাড়ায়। সমূহ বিপদের প্রস্তুতির জন্যই সেদিনে রাতে বসা। অনেকে পরামর্শ দিলো পাড়ার বউদের ছেলেমেয়েসহ অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিতে। কেউ কেউ মুক্তিবাহিনীর প্রতি হতাশ হয়ে বলল, “আর এ দেশে থাকা যাবে না। চলো আপাতত ইন্ডিয়া কিংবা কোনো মুসলিম বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেই।” মন্টু পাশ থেকে বললো, “সব রসুনের গোড়া এক। পাশের গ্রাম বহেরাতলির সবাইতো শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ করে। ওদের কিন্তু রাজাকারেরা কিছু বলে না। আমরা হিন্দুদেররই যত দোষ। দেশটা স্বাধীন হলে মনে হয় এ দেশে শুধু হিন্দুরাই থাকবো। ওরা মুসলমানেরা সব পাকিস্তানে চলে যাবে। কাকা, আপনি আর মুক্তিবাহিনী মুক্তিবাহিনী করবেন না তো? টিকিটি দেখছি না মুক্তিবাহিনীর। ব্যাটারা ইন্ডিয়া গেছে ট্রেনিং নিতে। এদিকে আমরা মরে ভূত হয়ে যাই তারপর ওনারা আসবেন। আমি আর ইউনিয়ন বোর্ডে পটকা-ফটকা ফাটাতে পারব না, কাকা। আমি বলে দিলাম স্পষ্ট করে।”
সবাই বাবার দিকে তাকিয়ে। ভাবছিলেন বাবা মন্টুকে একটা জোরে ধমক লাগাবেন । বাবা চুপ করে থাকলেন। বললেন, “কী করা যায় এখন? শওকত ভাই আসলে কোনো কথাই রাখছেন না। কালু মনে হয় মিলিটারি না হলেও রাজাকার নিয়ে আসবে দু একদিনের মধ্যেই। রাতে রাতে গ্রামে পাহারা বসাতে হবে। মিলিটারি কিংবা রাজাকার আসলেও যেন কেউ কেউ পালিয়ে বাঁচতে পারে। আর আমি বহেরাতলিতে আমার যারা যারা ছাত্র আছে সবাইকে বলে রাখি, যদি ওরা কয়েকটা দিন আমাদের গ্রামে নজর রাখতে পারে।”
অনিলমাস্টার একটু ফোড়ন কাটল বাবার কথায়, “শিয়ালের কাছে মুরগি জমা রাখার মতো কথা বললেন দাদা।”
“এটার মানে কী দাঁড়াল অনিল?” বাবা বললেন।
অনিল মাস্টার একটু সাহসে ভর করে বলে, “রথ যাত্রার দিন ঘিওরের ম্যাসাকারের পর অখিল ঠাকুরের পরিবার নিরাপদ ভেবে মজিদ মাস্টারের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। দুসপ্তাহ যেতেই মজিদ মাস্টার ঘরে জোয়ান বউ আর ছেলেমেয়ে থাকতেও অখিল ঠাকুরের কলেজে পড়া বোনকে প্রথমে ইজ্জত হরণ করে পরে জোর করে বিয়ে করেছে, সে খবর জানেন?”
মন্টু অনিলের কথায় একটু জোর পেল, “অখিল ঠাকুরের বোনই শুধু বিয়ে করে নাই, অখিল ঠাকুরের বউ মাসহ পুরো পরিবারকে মুসলমান বানিয়েছে। কাকা, আর যাই করেন, ওদের আর বিশ্বাস নেই। “
এবার বাবা ধমক লাগালেন মন্টুকে, “তোদের কথায় মনে হচ্ছে মুসলমান সবাই খারাপ, তাই না? সব মুসলমান খারাপ হলে শেখ মুজিবও খারাপ? কমান্ডার হাকিম ভাই, আফসার স্যার সবাই খারাপ? এই যে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করে মরে যাচ্ছে, ওদের কয়জন আর হিন্দু। সবাই তো মুসলমান। এবার বল ওদের সবাই খারাপ। সবাই মজিদ মাস্টারের মতো বদমাইশ। কালুর মতো সবাই হলে তো এই চার মাসে হিন্দু পাড়া আর থাকতো না, সবাই মেরে কেটে লুট-পাট করে নিয়ে যেত।”
অনিল মাস্টার মন্টুর কথায় সায় দিয়ে বললো, “কিন্তু দাদা এই পুরো মানিকগঞ্জে শুনেছেন একটাও মুসলমান বাড়ি লুট হয়েছে? একটাও মুসলমানের দোকান পুড়িয়ে দিয়েছে? একজন মুসলমানকেও পাকিস্তানি মিলিটারি বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলেছে? মুক্তিযুদ্ধও করছে অধিকাংশ মুসলমান, দেশ স্বাধীন হলেও মুসলমানের দেশই তো হবে এটা। খামাখা আমাদের উপর অত্যাচার কেন? এর চেয়ে আমাদের ইন্ডিয়াতে সরকারিভাবে পাঠিয়ে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।”
বাবা বললেন, “অনিল তুমি শেষে যা বললে, এটাই তো পশ্চিম পাকিস্তান সরকার চাচ্ছে। সেই সাথে তাল মেলাচ্ছেন পূর্ব পাকিস্তানের কিছু মুসলিম লীগার । শেখ মুজিব, আওয়ামী লীগ আর মস্কোপন্থী বামপার্টিগুলো পাকিস্তানের এ চক্রান্ত মানবে না বলেই তো এ যুদ্ধ। আমরা তো এদেশেরই মানুষ। ইন্ডিয়াতে যাব কোন দুঃখে? গেলে তো ‘৪৭ এর দেশ বিভাগের সময়েই যেতাম। দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না। আর সেজন্যই আমাদের মুক্তিবাহিনীর সাথে থাকতে হবে।”
বাবার উচ্চকণ্ঠে ভিতর বাড়ি থেকে মা, জেঠীমা সবাই বাইরের উঠোনে চলে এসেছে। মাকে দেখে বাবা বললেন, “তুমি আবার উঠে এসেছো কেনো? ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকো।”
(চলবে)


