শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

ভজন সরকারের উপন্যাস- চন্দ্রমুখী জানালা || পর্ব-০৪

চার

মুক্তিযুদ্ধ ছড়িয়ে গেল

আষাঢ় মাস পর্যন্ত বেশ একটু স্বস্তিতেই কাটানো গেল। ঢাকাতে যুদ্ধ শুরু হলো চৈত্রমাসের মাঝামাঝি। ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ভাষণের পর থেকেই স্থানীয় আওয়ামী লিগ ও কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতি চলছিল। মার্চ মাসের শেষে ঢাকাতে রাতের আঁধারে ঢাকা শহরে সাধারণ মানুষের উপর নির্বিচারে গুলীবর্ষণ করা হয়েছে। অসংখ্য মানুষ মারা পড়েছে। জগন্নাথ হলসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রদের হত্যা করা হয়েছে। যে যেভাবে পারছে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের দিকে চলে আসছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। সবাই যা ভেবেছিল, সেটিই হচ্ছে। সারা দেশে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। প্রথম দিকের মাসখানিক তো যুদ্ধের খবর গ্রামে আসতে আসতেই সময় কেটে গেছে। যদিও মুসলিম লীগের চেয়ারম্যান শওকত আলীর নেতৃত্বে আশপাশের কয়েক গ্রামে পাকিস্তান- রক্ষা কমিটি আর আলবদর গঠিত হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে করণীয় ঠিক করতে করতেই বোশেখ মাসের শেষ। মাঝে মধ্যে শুধু শওকত চেয়ারম্যান হিন্দু পাড়ায় লোক পাঠিয়ে খবর নেয় মুক্তিবাহিনী গঠিত হচ্ছে কি না?

পুরো এলাকা জুড়েই চাষাবাদের জমি। মাঝে মধ্যে কিছু জমিতে আমন কিংবা আউশ ধান। বাকি মাঠ জুড়ে পাটের চাষ। জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু হতেই পাট বড় হতে থাকে। ঘন বিস্তৃত পাট ক্ষেত এক গ্রামকে অন্য গ্রাম থেকে আলাদা করে রাখে। গ্রামের রাস্তা থেকে পাট ক্ষেতের ভিতর ঢুকে পড়লে কারো পক্ষে সম্ভব নয় খুঁজে বের করা। তাই মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা পাটের ভিতর দিয়ে অনায়াসে দিন দুপুরেই এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে চলে যায়। পাট ক্ষেতের ভিতর বসেই অনেকে শলা পরামর্শ করে। কখনও কখনও রেডিও শোনে।

মানিকগঞ্জ মহকুমা শহর। যোগাযোগ শুধু নৌকা আর পায়ে হাঁটার পথ। পার্শ্ববর্তী থানা দুটোও এলাকা থেকে বেশ দূরে। তাই অনায়াসেই পাকিস্তানি মিলিটারি আসার খবর জানা যায়। তাছাড়া মুক্তিবাহিনী ইতিমধ্যেই সন্দেহভাজন মুসলিম লীগারদের পেছনে টিকটিকি লাগিয়ে রেখেছে।

শওকত চেয়ারম্যানই একমাত্র লোক যে মহকুমা সদর থেকে পাকিস্তানি মিলিটারিদের ডেকে আনতে পারে, এ আশঙ্কা থেকেই একদিন বাড়িতে মিটিং গুলো। শওকত চেয়ারম্যানকে ভয় দেখাতে হবে; যাতে করে পাকিস্তানি মিলিটারি থানার সাহস না পায়। মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত হলো যে করেই হোক উলাইল ইউনিয়ন বার্ডের অফিসে দিনে দুপুরে একটি পটকা ফাটানো হবে। এতে এক ঢিলে দুই
পাখি মরবে। শওকত চেয়ারম্যান যেমন ভয় পাবে, ইদানীং সৃষ্টি রাজাকারেরাও একটু দমে থাকবে।

উলাইল বোর্ড অফিসটি দৌলতপুর থানা সদর থেকে পাঁচ মাইল দূরে, একেবারে থানা সংযোগ সড়কের পাশে অবস্থিত। তিন দিকে সড়ক আর সামনের দিকে ফাঁকা মাঠ। বোর্ড অফিসের দক্ষিণ দিকের প্রায় এক মাইল দূরের গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত সে ফাঁকা মাঠে আবাদি জমি। বোশেখ মাসের অর্ধেক সময় পেরিয়ে গেছে। পাট গাছ বড় হয়ে প্রায় দেড়-দু’ মানুষ সমান লম্বা। তাই পাট ক্ষেত্রের ভিতর দিয়েই অপারেশন করতে হবে মিটিংয়ে সে রকমই সিদ্ধান্ত। সেদিন বুধবার। চেয়ারম্যান তখন অফিসে। সাপ্তাহিক মিটিং বসেছে ইউনিয়ন বোর্ডে। মেম্বার আর মুসলিম লীগের চ্যালা চামুণ্ডারা শওকত চেয়ারম্যানের চারপাশে বসে আছে। হঠাৎ বিকট শব্দে একটা পটকা ফাটলো। কিছুক্ষণ পরপর আরও কয়েকটি। মিটিং রুমের সামনে টুলের উপর বসে ছিল আনিচ চৌকিদার। লাঠি হাতে এদিক-ওদিক দৌড়াদুড়ি শুরু করে দিলো আনিচ। শওকত চেয়ারম্যান সম্ভাব্য বিপদ আঁচ করে ক্ষিতিশ মেম্বারকে বাইরে পাঠিয়ে ঘরের দিল আটকিয়ে দিলো। ততক্ষণে মুখে গামছা জড়িয়ে কয়েকজন ছেলে সামনের পার্টের ক্ষেতে নেমে গেছে। উঁচু সড়ক থেকে দেখা যাচ্ছে পাট গাছ ভেঙে ভেঙে ওরা দূরে চলে যাচ্ছে। আনিচ চৌকিদার লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে জোরে হাঁক দিচ্ছে, “শালারা মুক্তিবাহিনী, শালারা মালাউনের বাচ্চা। “

সন্ধ্যেবেলায় শওকত চেয়ারম্যান এলাকার কয়েকজনকে নিয়ে গ্রামে এলেন। বাড়ির উঠোনে কাঠের চেয়ার, বেঞ্চি আর চটের বস্তা পেতে সবাই বসেছে। চেয়ারম্যানের গলার সুর নরম। দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, ভয় পেয়েছেন। মিটিংয়ে সবাইকে তিনি আশ্বস্ত করলেন, এ এলাকায় পাকিস্তানি মিলিটারি আসবে না। কিন্তু মুক্তিবাহিনীকেও কথা দিতে হবে আর বোমাবাজি না করার।

সদ্য গঠিত মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার কমরেড হাকিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন। তিনি সম্মতি দিলেন। বললেন, “শওকত ভাই, এ এলাকাটাতো আমাদের তাই না। আমরা খামোখা কেন বোমাবাজি করতে যাবো? কিন্তু আপনাকেও কথা দিতে হবে আশপাশের হিন্দু গ্রামগুলোতে যেন কোনো অত্যাচার না হয়। “

পাশ থেকে বাবা বললেন, “ওপাশের পাড়া থেকে কালু নাকি রাতবিরেতে হিন্দুপাড়ায় এসে পাকিস্তানি মিলিটারির ভয় দেখায়। কাল রাতেই নাকি দিনেশকে
ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দেয়ারও হুমকি দিয়েছে।”

কমরেড হাকিম উদ্দিন বললেন, “ওকে আজ থেকে সাবধান করে দেবেন শওকত ভাই। শেখ সাবের ডাকে আমরা যুদ্ধ করছি। খালি হিন্দুরাই কি তাড়াতে চায় পাকিস্তানিদের? মুসলমানরা চায় না? আপনি চান না?”বলেই তিনি শওকত চেয়ারম্যানের দিকে তাকালেন। কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে আছেন চেয়ারম্যান।

কমান্ডার হাকিম উদ্দিন আবার বলা শুরু করলেন, “হিন্দুদের দোষটা কোথায়? কালুর সাহস থাকে তো ওকে কলিয়ার মুসলিম পাড়ায় পাঠাবেন। ও যদি আর হিন্দুদের ভয়-ভীতি দেখায় সে দায়িত্ব কিন্তু আপনাকে নিতে হবে। এলাকায় এটা আর চলবে না। আপনি আজই কালুকে ডেকে সাবধান করে দেবেন।

কথাটি শতকত চেয়ারম্যানের ভালো লেগেছে বলে মনে হলো না। কিন্তু আর শঙ্কায় কিছু না বলেই মিটিং শেষ করলেন সে রাতের মতো।

সেদিনের মিটিংয়ের পর থেকে হিন্দু গ্রামগুলোতে মুসলিমলীগের লোকজনের আনাগোনা কমে গেল। কিন্তু সবার মধ্যে একটা চাপা ভয় ও আশঙ্কা তো থেকেই গেল। গ্রামে কিংবা বাড়িতে থাকলে একটু স্বস্তিতে থাকা যায়। কেউ হাট-বাজারে গেলে বাড়িতে না ফেরা পর্যন্ত সবাই আতঙ্কে থাকে। কখন কাকে ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে।

এভাবেই আষাঢ় মাস এসে গেল। চারিদিকে আউশ আর জলি ধান কাটার ধুম। সেবার নতুন জল একটু তাড়াতাড়িই চলে এলো। মাত্র দিন দুয়েকের ব্যবধানেই গ্রামগুলো যেন এক একটা দ্বীপ। মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগেই মাঠ ভরা ছিল পাটে। এখন আর কোথাও পাট গাছ নেই। বড় বড় আঁটি বেধে পার্ট পচানোর কাজ চলছে। নতুন আসা বর্ষার জলে বড় বড় বাঁশের সাথে পাটের আঁটিগুলো আটকিয়ে কচুরিপানা কিংবা কলাগাছ দিয়ে পাট ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। জলের নিচে। মাসখানেক পরেই বাঁশের মাচা বানিয়ে জলের ওপরেই পাটের আঁশ ছাড়ানো হবে। তারপর আঁশ ও পাটখড়ি দুটোই বাড়িতে কিংবা উঁচু সড়কে এনে রোদে শুকানো হবে। উঁচু সড়কের দুপাশ দিয়ে মাইলের পর মাইল বাশ টাঙিয়ে পাটখড়ি শুকানোর এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

বর্ষার জল আর্থিক স্বচ্ছলতা নিয়ে এলেও আরেক বিপদ নিয়ে এলো। নৌকা করে সহজেই গ্রামগুলোতে যাতায়াত করা যায়। লুকানোর জায়গাও আর থাকলো না বললেই চলে। হঠাৎ করেই এক বিকেলে পাশের গ্রামে বাবার বন্ধু অমল কাকুদের বাড়িতে বিরাট এক ঘাসি নৌকা করে কিছু রাজাকার এসে লুটপাট করে চলে গেল। অমল কাকু তো আগেই ইন্ডিয়া চলে গেছেন। বাড়িতে দুই ভাই তখন থানা সদরের কাপড়ের দোকানে। বউ ছেলেমেয়ে আর মা বাড়িতে শুধু। পেছনের নিমাই বিল দিয়ে এক বড় ঘাসি নৌকা করে জনা দশেক লোক এসে বাড়ির সোনা-দানা- ধান-চাল নিয়ে ভেগে গেছে। যাওয়ার সময় নাকি শাসিয়ে গেছে একথা মুক্তিবাহিনীকে বললে থানা সদরের দোকান থেকে দুই ভাইকে পাকিস্তানি মিলিটারির কাছে ধরিয়ে দেবে।

সবাই তো থ। এলাকায় এ রকম একটা ঘটনার আঁচ আগে থেকে কেউ করেনি। বর্ষার জন্য মুক্তিবাহিনীর অনেক ছেলেরা একটু উঁচু এলাকায় চলে গেছে। অনেকেই ট্রেনিংয়ের জন্য বর্ডার পাড়ি দিয়ে চলে গেছে ভারতে। বাবাসহ যারা তখনও এলাকায় তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই এ ঘটনা ঘটে গেল।

এলাকার মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হাকিম উদ্দিনও তখন এলাকা ছেড়ে ভারতে। মানিকগঞ্জ সদরে হালিম ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে একটা গ্রুপ যুদ্ধ করছে। পাশের থানা ঘিওরেও কমান্ডার মনসুরসহ আরো কয়েকটি গ্রুপ সক্রিয়। টাঙ্গাইলে কাদেরিয়া বাহিনীর কথা মাঝে মাঝে শোনা যায়। কিন্তু কেউ চারিদিকের এই এই জল পেরিয়ে এ বিল এলাকায় অপারেশনে আসবে না। তাছাড়া পাকিস্তানি মিলিটারিরা যে জলে ভয় পায় তখন সবাই এ সংবাদ জেনে গেছে। তাই বড় কোনো অপারেশনের ঝুঁকি এ সমস্ত এলাকায় নেই জেনে মুক্তিবাহিনীর চার্গেট তখন থানা আর মহকুমা শহর।

শওকত চেয়ারম্যানের প্রতিশ্রুতি আর কাজে আসবে না ভেবে আশপাশের হিন্দু গ্রামগুলোতে উৎকণ্ঠা। আর সে সুযোগেই কালু রাজাকারের বাড়বাড়ন্ত ৷ দুদিন পরেই পাশের আরেকটা হিন্দু বাড়িতে লুটপাট হলো। অথচ মাসখানেক আগেই এলাকা ছিল একেবারে নিরাপদ। এখন মুসলিম অধ্যুষিত পাড়াগুলোতে রাত নামার সাথে সাথেই এক অজানা আতঙ্ক নেমে আসে। অনেকে আবার যুবতী মেয়েদের আরো একটু ভিতরে হিন্দু এলাকার কোনো আত্মীয় বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কিছুদিন পরেই শোনা গেল রাতের অন্ধকারে কয়েকটি পরিবার পালিয়ে ভারতে চলে গেছে। গুজব এমন সংক্রামক যে, তিলকে তাল করে ফেলে। মাসখানেকের মধ্যেই পাশাপাশি তিন-চারটে হিন্দু গ্রামে এক ভয়ের রাজত্ব চেপে বসল ।

অনেকদিন পরে বাড়িতে গোপন মিটিং। যে করেই হোক এর একটা সমাধান করতে হবে। সিদ্ধান্ত হলো এখনই কোনো অপারেশনে যাওয়া যাবে না। চেয়ারম্যানের মাধ্যমেই সবাইকে আবারও আশ্বস্ত করতে হবে। ভারতে পালিয়ে যাওয়ার যে হিড়িক পড়ে গেছে সেটা আগে বন্ধ করতে হবে। তারপর না হয় সুযোগ বুঝে করা যাবে নতুন করে অপারেশন। আপাতত সিদ্ধান্ত সে রকমই ৷

লেখক পরিচিতি

ভজন সরকার
ভজন সরকার
ভজন সরকারের জন্ম বাংলাদেশের ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের মামাবাড়িতে । বেড়ে উঠেছেন মানিকগঞ্জ জেলার পশ্চিমের জনপদে ।বাবা-মা দু’জনেই স্কুল শিক্ষক । ভজন সরকার মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনে। তারপর ঢাকা কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়(বুয়েট) এবং কানাডার উইন্ডসর ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পুনরায় স্নাতক এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর শেষে কানাডায় স্থানীয় সরকারী সংস্থায় প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন কানাডার ওন্টারিও প্রদেশের হ্যামিল্টন শহরে। বর্তমানে সিটি অব হ্যামিল্টনের ৩০ বছরের মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত। প্রথম বই ‘বিভক্তির সাতকাহন’ ‘মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশের পরই ব্যাপকভাবে আলোড়িত এবং আলোচিত সবমহলেই। প্রধানত কবি হ’লেও লিখছেন নিবন্ধ, কলাম ও উপন্যাস বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং সাপ্তাহিক পত্রিকায়। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হ’লোঃ বিভক্তির সাতকাহন ( প্রবন্ধ)- মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী; ক্যানভাসে বেহুলার জল ( কাব্য)- নন্দিতা প্রকাশ; বাঁশে প্রবাসে ( প্রবন্ধ রম্যরচনা)- নন্দিতা প্রকাশ ; রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে বসবাস (প্রবন্ধ)- নন্দিতা প্রকাশ; চন্দ্রমুখী জানালা ( উপন্যাস) - নন্দিতা প্রকাশ ।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা