শনিবার, মে ১৬, ২০২৬

চিত্রশিল্পে বিজ্ঞান

শিশির মল্লিক

চিত্রশিল্প ও বিজ্ঞান- দুটো বিষয়ই ব্যাপক ব্যাপ্ত। দুটোই মানুষের সৃজনশীল ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। চিত্রশিল্পের মধ্য দিয়েই সূচিত হয়েছে অনেক আবিস্কারের চিন্তা। অনেক মৌলিক বৈজ্ঞানিক আবিস্কারও এসেছে চিত্রশিল্পের হাত ধরে। এ সৃজনশীল দ্বৈরথ নিয়ে লিখেছেন শিশির মল্লিক
মানুষ জৈব প্রাণী হিসেবে বাঁচার জন্য শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহারের পাশাপাশি অন্য কিছুর সহায়তাও নিয়েছে। এই অন্য বস্তুগুলো হলো প্রাগৈতিহাসিক মানুষের প্রযুক্তি। যেমন- লাঠি, কাঠ বা পাথরের ব্যবহার। এগুলোকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় উৎপাদন উপায়। এগুলো ব্যবহারের উদ্যোগে মূলত মস্তিস্ক কাজ করেছে। তার চিন্তা কাজ করেছে। উৎপাদন উপায়ের ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা বিকশিত হয়েছে। বেড়েছে তার কল্পনা করার ক্ষমতাও। ব্যক্তিসত্তার পাশাপাশি সমাজ ও পরিবেশ নিয়ে ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে; যা আজকের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে অভাবনীয় সাফল্যগাথা বলা যেতে পারে। অতএব বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও মানুষের কল্পনা একে অন্যের ওপর নির্ভর ও পরস্পরকে প্রভাবিত করে।
বিজ্ঞান প্রকাশিত হয়েছে প্রযুক্তির মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এক বিষয় নয়। বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ও কল্পনা জগতের ব্যাপ্তি অনেক বড়, যার মাধ্যমে মানুষ অনন্ত অসীমের পানে ছুটছে। আর কল্পনা প্রকাশিত হয় শিল্পের মাধ্যমে। শিল্পের মাধ্যমগুলো হলো- কথন, গীত, নৃত্য, নাটক, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য প্রভৃতি।
আমাদের সমাজ বাস্তবতায় বিজ্ঞানের অবদান অস্বীকার করতে না পারলেও শিল্পচর্চাকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কল্পনার দ্বার রুদ্ধ করা মানে জাতিগত বিকাশের পথ রুদ্ধ করা। শরীর সুস্থ ও সক্রিয় রাখার জন্য যেমন খাদ্য প্রয়োজন, তেমনি মস্তিস্ক সুস্থ ও সৃজনশীল রাখার জন্য শিল্পচর্চা প্রয়োজন।
চিত্রকলা শিল্পের অনেক মাধ্যমের একটি। দৃশ্যজগতের যা কিছু ধারণ করার তা চিত্রকলানির্ভর ছিল ক্যামেরা আবিস্কারের আগ পর্যন্ত। শুধু তা-ই নয়, যে কোনো দৃশ্যমান বা কল্পিত ভাবনাকে প্রকাশিত করতে এখনও আমরা চিত্রকলারই সহায়তা নিই। শিল্পপণ্যের এই যুগে প্রথমে পণ্যের মডেল কেমন হবে- তার ধারণাটিও ডিজাইনারের হাতের নকশার মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। মাধ্যম হিসেবে কাগজ, ক্যানভাস বা কম্পিউটার যাই ব্যবহার করা হোক না কেন। প্রকৌশলবিদ্যার সব শাখার আইডিয়া বা পরিকল্পনায় ড্রইং অপরিহার্য।
খাদ্য সংগ্রহের প্রয়োজন থেকে উদ্ভাবিত প্রাগৈতিহাসিক মানুষের গুহার দেয়ালচিত্র আজকের শিল্পোন্নতির যুগে সব উদ্ভাবনী কাজের অনুষঙ্গ হিসেবে জড়িয়ে আছে। বিগত উনিশ ও বিশ শতকে ইউরোপজুড়ে দর্শন ও বৈজ্ঞানিক চেতনার বিকাশে চিত্রকলায় তার যে প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করি, তা চিত্রশিল্পের বিভিন্ন ধারা ও ইজমের জন্ম দেয়। শিল্পের সব মাধ্যমকে তা প্রভাবিতও করে। যেমন- সিম্বলিজম, রোমান্টিসিজম, মডার্নিজম, কিউবিজম, সুরেয়ালিজম, ইমপ্রেশনিজম, এক্সপ্রেশনিজম, ফোবিজম, এনার্কিজম, পোস্ট মডার্নিজমসহ আরও কত যে ধারার উদ্ভব বিকাশ ও চর্চা হয়েছে, তা এক বিস্ময়। এই ধারাগুলোর সঙ্গে দর্শন ও বিজ্ঞানের যোগসূত্র রয়েছে।

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি

রেনেসাঁর মাস্টার আর্টিস্ট এবং বিজ্ঞানী লিওনার্দো দ ভিঞ্চি এক বিস্মকর প্রতিভা। যার সৃষ্টি মানব সভ্যতার একটি সময়কে প্রতিনিধিত্ব করেছে। তিনি বিজ্ঞান ও শিল্পের সৃজনশীলতায় একে অন্যের সহায়ক হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর একটি উদ্ধৃতি এখানে উল্লেখ করা হলো, যার মাধ্যমে শিল্প ও বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আমরা উপলব্ধি করতে পারব। তিনি বলছিলেন, ‘যদি তুমি চিত্রকলাকে অবজ্ঞা করো, যা কিনা প্রকৃতির সব দৃশ্যমান ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার একমাত্র অনুকরণকারী; তবে তুমি অবজ্ঞা করবে এক সূক্ষ্ণ উদ্ভাবনকে, যা চিন্তাদর্শন ও সূক্ষ্ণ অনুমানের দ্বারা সব আকারে প্রকৃতি ও গুণাগুণকে বিবেচনা করে, যার মধ্যে সমুদ্র, স্থল, গাছপালা, জীবজন্তু, তৃণ, ফুল সবই আছে, যেগুলোর সবই আলাছায়ায় আবৃত। সত্যিই এটি বিজ্ঞান ও প্রকৃতির এক যথার্থ সন্তান।’ এই দৃষ্টিভঙ্গিগত কারণেই শিল্পকলা তাঁর হাতে উদ্ভাবনের অন্যতম এক মাধ্যম হিসেবে চর্চিত হয়েছে। তিনি শিল্প ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বহুমাত্রিক এই সৃজনশীল মানুষটি ছিলেন একাধারে চিত্রকর, ভাস্কর, স্থপতি, সংগীতজ্ঞ, গণিতবিদ, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক, শরীরস্থানবিদ, ভূতত্ত্ববিদ, মানচিত্রকর, উদ্ভিদবিদ ও লেখক। চিত্রবিদ্যায় আলো-ছায়া ও প্রেক্ষিতের যথার্থ প্রয়োগ বস্তুকে বিজ্ঞানের আলোকে দেখা ও ধারণ করার কৌশলগত অনুশীলনে তিনি পথপ্রদর্শকের ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত পেইন্টিংয়ের একটি মোনালিসা। তারপর লাস্ট সাপার। আমরা তাঁর চিত্রিত ১৩টির মতো পেইন্টিং সম্পর্কে জানার সুযোগ পাই। প্রচুর নকশা ও রেখাচিত্র তো ছিলই। এখানে দুটি ছবির উল্লেখ করছি, যেখানে তাঁর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রমাণ রয়েছে। একটি হলো পানি ওপর থেকে নিচে পতনের ফলে কীভাবে আচরণ করে তার ধারণা তুলে ধরা হয়েছে। সে সময় ফ্র্যাক্টাল (পুনরাবৃত্তিকারী একক) গণিতবিদদের কাছে পরিচিত ছিল না। বিজ্ঞানীরাও একটি জটিল ব্যবস্থায় দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান বিশৃঙ্খলার মিথস্ট্ক্রিয়া বুঝতে পারেননি; যা লিওনার্দোর অঙ্কন ও তাঁর নোটগুলো স্পষ্টভাবে দেখায়। দ্বিতীয়টি হলো, মানবদেহকে একটি জটিল ব্যবস্থাপনার আলোকে দেখার প্রয়াস। তিনি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আলাদা আলাদাভাবে অধ্যয়ন করেছেন। ভিট্রুবিয়ান ম্যান, যেখানে মানবদেহের অনুপাত তুলে ধরেছিলেন। আজও হিউম্যান ফিগার, ক্যারেক্টার ড্রইং ও অ্যানিমেশন চর্চাকারী শিল্পীদের কাছে লিওনার্দোর করা মানবদেহের অনুপাতের সাধারণ নিয়মগুলো অনুসরণীয়।

মারিয়া সিবিলা মেরিয়ান

‘শিল্প ও প্রকৃতি একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে ততক্ষণ, যতক্ষণ না তারা জয়ী হতে পারে।’ প্রকৃতিকে জয় করার ইচ্ছা মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকে বাড়িয়ে তুলেছে। শিল্প ও বিজ্ঞান হচ্ছে এই উদ্ভাবনী শক্তির আধার। মারিয়া সিবিলা মেরিয়ানের জন্ম ২ এপ্রিল ১৬৪২ সালে। সুইস-জার্মান বংশোদ্ভূত এই শিল্পী ও বিজ্ঞানী পোকামাকড় নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেন, যা তাঁকে চিত্রশিল্পী ও প্রকৃতিবিদ হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়। মেরিয়ান হলেন প্রথম একজন বোটানিক্যাল আর্টিস্ট, যিনি তাঁর গবেষণার মাধ্যমে কীটপতঙ্গের জীবন সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য আবিস্কার করেছিলেন। ১৬৭৫ সালে প্রথম প্রকৃতি চিত্রের বই, ১৬৭৯ সালে শুঁয়াপোকা নিয়ে দুই খণ্ড সিরিজের প্রথম খণ্ড এবং ১৬৮৩ সালে দ্বিতীয় খণ্ড, ১৬৭৫ সালে তিনি একটি তিন খণ্ডের সিরিজ প্রকাশ করেছিলেন। তখনকার সময়ে নারীদের তেল রঙে আঁকার অনুমতি ছিল না। তাই তিনি জল রং ও গোয়াস মাধ্যমে ছবি এঁকেছিলেন।

সান্তিয়াগো র‌্যামন ই কাজাল

‘সব অসামান্য কাজ, শিল্পের পাশাপাশি বিজ্ঞানে একটি মহৎ চিন্তা প্রয়োগই বিপুল উদ্যোগের ফলাফল।’ শিল্প ও বিজ্ঞানে সৃজনশীলতার বিষয়ে তাঁর এমন ভাবনা কাজের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। জন্মগ্রহণ করেন ১৮৫২ সালের ১ মে স্পেনের পেটিলা দে আরাগনে। সান্তিয়াগো র‌্যামন ই কাজাল শিল্পী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও বাবার ইচ্ছায় মেডিসিন অধ্যয়নের জন্য সারাগোসা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন সারাগোসা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তিনি ছেলেকে শারীরবৃত্তীয় অধ্যয়নের জন্য মানুষের দেহাবশেষ খুঁজতে কবরস্থানে নিয়ে যেতেন। হাড়ের প্রারম্ভিক স্কেচগুলো তাকে চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নে অনুপ্রাণিত করে। একজন নিউরো সায়েন্টিস্ট ও শিল্পী হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করেন। নিউরাল স্ট্রাকচার এবং তাদের সংযোগের চমৎকার চিত্র তৈরি করে কোষের বিবরণ প্রদানের মাধ্যমে তিনি এক নতুন ধরনের কোষ আবিস্কার করেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর নামে নামকরণ করা হয়। সেটি হলো কাজালের (আইসিসি) ইন্টরস্টিশিয়াল সেল। তিনি ফিসিওলজিতে নোবেল পুরস্কার পান ১৯০৬ সালে। শিল্প ও বিজ্ঞান নিয়ে আরও যেসব শিল্পী অবদান রেখেছেন তাঁদের তালিকা দীর্ঘ। তা থেকে কিছু নাম উল্লেখ করা হলো- স্যামুয়েল মোর্স, জন জেমস অডুবান, আলফ্রেড এল কোপলি, মারিয়েন নর্থ, জোসেফ রাইট, সমসাময়িকদের মধ্যে রাফায়েল লোজানো-হেমার, আনিকা ইয়ি, ট্রেভর পাগলান, ওলাফুর এলিয়াসন, ফ্রাঁসোয়া জোসেফ ল্যাপয়েন্ট প্রমুখ।

লেখক : চিত্রশিল্পী ও কবি
দৈনিক সমকাল থেকে সংগৃহিত

লেখক পরিচিতি

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা