অনুলেখা কবি হতে চায়
অনুলেখা অনেক কিছু হতে চেয়েছিল। যখন সে অবুঝ বয়সে প্রথম সিনেমা দেখে তখন সিনেমার সেই চরিত্রটা হতে চাইত যাকে সবাই ভালোবাসে। বালিকা বয়সে যখন দেখত মা কাকিমারা কেমন নিপাট সিঁথি কেটে মাথা আঁচড়িয়ে খোঁপা করে এক মাথা ঘোমটা দিয়ে ঘর গৃহস্থালি সামলাচ্ছে, তখন তাদের মতোই হতে চাইত। যখন স্কুল জীবনে বই পড়তে শুরু করল তখন ইচ্ছেগুলো বদলে যেতে লাগল। কখনো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কখনো শিক্ষক, কিংবা বইয়ে পড়া কোনো চরিত্র হয়ে উঠত মনে মনে। মাঝে মাঝে তার পাখিও হতে ইচ্ছে করত। এতসব ইচ্ছে দানাগুলো মনের মাঝে অঙ্কুরিত হতে হতেই রোদ বৃষ্টি, হাওয়া আর যত্নের অভাবে শুকিয়ে যেত।
শেষ পর্যন্ত অনুলেখা হয়ে পড়ে গৃহস্থবাড়ির গিন্নি। তারপর ইচ্ছেগুলোও কেমন যেন ব্যাঙের শীতনিদ্রায় যাওয়ার মতো ঘুমিয়ে পড়েছিল। কালচক্রের আবর্তনে অনু আজ প্রৌঢ়ত্বের সীমানা অতিক্রম করে ফেলেছে। সংসারে তার প্রয়োজন কিছুটা শিথিল হলে অনুলেখার মনে এক অদ্ভুত ইচ্ছা জাগে। সে কবিতা লিখবে। সেই কলেজজীবনে দু-চার লাইন লিখত, তখন তো বন্ধুরা বেশ বাহবা দিত। তাই মন স্থির করল কবিতা সে লিখবেই। কী এমন কঠিন কাজ কবিতা লেখা? ইটের পরে ইট সাজিয়ে কেমন সাতমহলা বাড়ি বানায় রাজমিস্ত্রি! তেমনই শব্দের সঙ্গে শব্দ জুড়েই তো কবিতা হয়। তার মনের জমানো কথাগুলোকে সাজিয়ে তুলবে শব্দের পর শব্দ বসিয়ে। হবে তার স্বপ্নের কাব্যগ্রন্থ। কর্তা যখন দুপুরবেলা দিবানিদ্রায় থাকে অনুলেখা তখন কবিতার খাতা খুলে বসে। বেশ একটা ভাব আসে মনে। শব্দের পর শব্দ জটলা করে হৃদয়ের গহিনে, মস্তিষ্কে। স্নায়বিক চাপ অনুভব করে, রক্তের চাপও বেড়ে যায়। কিন্তু শব্দেরা কবিতার রূপ পায় না। কবিতার খাতা সাদা ধবধবে ঊষর মরুভূমি হয়েই রয়ে যায়। একটি কবিতার ফুলও সেখানে ফোটে না। কাব্যগ্রন্থের মরূদ্যান সে তো স্বপ্নেই হারিয়ে যায়। এটাই হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু না, অনুলেখা এই ইচ্ছেটা কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেবে না। সে তার এই স্বপ্নটা সত্যি করবেই। আর লিখে ফেলে অনুপম কথামালায় সাজানো এক একটা কবিতা। অনুর খাতার সাদা পাতাগুলোয় কবিতারা ফুটে উঠে পারিজাত ফুলের মতো।


