তিন
খতম ও নকশাল
বনগাঁ থেকে শিয়ালদাগামী ট্রেনগুলোর কামরা এক রকম ফাঁকাই থাকে। অথচ শিয়ালদা থেকে বনগাঁর ট্রেনগুলো বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীতে ঠাসা। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্থণ করেছে। অথচ এখন এপ্রিলের প্রায় শেষ। এখনো শরণার্থীদের বাংলাদেশে ফিরে যাবার ঢল?
অমল কাকু ও বাবা বারাসাত থেকে প্রায় ফাঁকা কামরার একটা ট্রেনে চড়ে বসলেন। টিকেট কাটার ঝামেলা তেমন নেই। কারণ, শরণার্থীদের বিনেপয়লায় চলাচল করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যুদ্ধের প্রায় পুরো সময়টাতেই পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল, শাসিত সরকার। তাই বিনেপয়সার ট্রেন ভ্রমণের সময় সিগারেটে হালকা করে সুখটান দিলেন দুইবন্ধু। পা ছড়িয়ে দখল করে বসলেন একদিকের সবক’টি আসন। ততক্ষণে বারাসাত ছেড়ে পরের স্টেশনে ট্রেন থেমেছে। উল্টো দিকের প্লাটফর্মে উপচে পড়া মানুষের ভিড় দেখে সহসা অমল কাকু বলে উঠলেন, “এ কয়দিন তো ব্যস্ততার কারণে তোকে দেশের কথা জিজ্ঞেস করাই হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের কথা, কে কে বেঁচে আছে, কে মরে গেছে, কিছুই তো শোনা হলো না। যদিও অনেক কিছু কানে এসেছে, কিন্তু কতটুকু সত্যি কে জানে? এই ধর না তোর কথাই। একদিন তোর এক আত্মীয়ের সাথে কলকাতায় দেখা। সে তো বলল, তুই নাকি মরে গেছিস?
বাবা তখন প্ল্যাটফর্মের ওপার থেকে চোখ ফিরিয়ে এনে বললেন, হ্যাঁ আমি তো সেটা শুনেই দেখা করতে এলাম। আর যুদ্ধের কথা কি আর চলতি পথে বলা যাবে? আছি তো বেশ কিছুদিন, আস্তে আস্তে শোনাবো। আর এ দুদিন তোর কাছে বেশ কিছু লোকের আনাগোনা দেখলাম। উদ্বাস্তুদের নিয়ে কিছু পোস্টার আর বইও দেখলাম ।
“হ্যাঁ তুই ঠিকই ধরেছিস। এখানে ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রিফিউজি কলোনিজ বা ইউসিআরসি নামে একটা সংগঠনের সাথে জড়িয়ে গেছি”, অমল কাকু বললেন। “দেখ না, বজ্জাত কংগ্রেস পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের সাথে কী করছে সেই নেহেরুর সময় থেকেই। আসলে তো জানিস, “পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা ওরা তো আর্য। আর পূর্ববঙ্গের আমরা কোথাকার কোন চাষাভূসা অনার্য দ্রাবিড়। আর বেটা নেহেরু তো ওদিকেরই লোক।”
অমল কাকু ব্যাগ থেকে ইউসিআরসি’র বই বের করে পাতার পর পাতা উল্টে একটি বড় চার্ট মেলে ধরলেন। অমল কাকু বললেন, “এই দেখ। পশ্চিম আর পূর্ববঙ্গের উদবাস্তুদের পূনর্বাসনের খতিয়ান সংখ্যার হিসেবে পূর্ববঙ্গীয় উদবাস্তুরা বেশি হলে কি হবে, পুনর্বাসনের দিক থেকে শতকরা দশ ভাগও এদিকে খরচ হয়নি। তারপর আবার এই পাকিস্তানযুদ্ধের শরণার্থী?”
অমল কাকুর ইউসিআরসি’র বই থেকে বের করা ‘৪৭-এর দেশ বিভাগের খতিয়ান পড়ে বাবা একটু অবাকই হলেন। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হলো। হিন্দুদের দেশ ভারত। আর মুসলমানের দেশ পাকিস্তান। পাকিস্তান আবার দুভাগ। ভারতের পূর্বদিকে পূর্ব পাকিস্তান আর পশ্চিমদিকে পশ্চিম পাকিস্তান। হিন্দু দুই পাকিস্তানেই পড়লো। পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুদের সবাই বাঙালি কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যারা ভারতে এলেন এদের অধিকাংশই পাঞ্জাবি, শিখ এবং অবাঙালি।
অমল কাকুর কথার প্রতিধ্বনি দেখতে গেলেন বাবা বইয়ের পরিসংখ্যানে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদবাস্তু এসেছিল ৫২.১৪ লক্ষ এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৪৭.৪ লক্ষ। অথচ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগতদের জন্য ৯১ কোটি সরকারি অনুদান দিয়েছে, বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছে ২২১,০০০ জন মানুষকে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুদের কোনো সরকারি অনুদানই দেওয়া হয়নি, বাড়ি নির্মাণও করা হয়নি একটিও। প্রায় ৭০ হাজার একর জমি ও তিন লক্ষ শহরের বাড়ি, যা মুসলমানরা ফেলে রেখে চলে গিয়েছিল, সেগুলোও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত হিন্দুদের বরাদ্দ করা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি উদ্বাস্তুদের জন্য গ্রহণ করা হয়েছিল দুটো প্রকল্প আন্দামান ও দণ্ডকারণ্য। সেগুলোও কেন্দ্রীয় অসহযোগিতায় দায়সারাভাবে শেষ করে দোষ চাপানো হয়েছে বাঙালিদের অনিচ্ছাকে। এ তো গেল শুধু ক্ষতিপূরণের পরিসংখ্যান। প্রশাসনিক ও শিক্ষাক্ষেত্রেও পশ্চিম থেকে আগত উদ্বার সুযোগ সুবিধে পেয়েছেন অনেকে বেশি।
বাবার কাছে এ পরিসংখ্যানের প্রায় সবকিছুই অপরিচিত লাগলো। নিজের কাছে একটু বে-ক্ষ্যাপ্পাই মনে হলো অমলকে। তাছাড়া জওহরলাল নেহেরু কিংবা কংগ্রেসের সম্বন্ধে এ সমস্ত নেতিবাচক কথার কোনো মানে আছে বলেও মনে হলো না বাবার। নেহেরু কন্যা ইন্দিরার সাহায্য ছাড়া কি বাংলাদেশ এত সহজে স্বাধীন হতো? কোটি কোটি শরণার্থীদের ভরণপোষন ইন্দিরা গান্ধী আর কংগ্রেসের সাহায্য ছাড়া কি সম্ভব ছিল?
অমল কাকু বললেন, “এই মাত্র তো দমদম ক্যান্টনমেন্ট ছাড়ালাম। এখ দুইদিকে দেখবি উদ্বাস্তুদের বস্তি। দেশভাগ হয়ে গেছে সেও আজ পঁচিশ বছর। অথচ কলকাতার যত কাছাকাছি যাবি পূর্ববঙ্গের বাঙালদের বস্তির সংখ্যাও তত বাড়বে। শিয়ালদা তো আরেক পূর্ব পাকিস্তান। প্রথমে দেখলে কেউ কেউ ভাববেক কলকাতাটাই শালা বাঙাল বাটিদের দখলে চলে গেছে। হারামি ঘটিরা সব হিন্দিঘেঁষা বিছুদ্ধ কথা কয়। ছিয়ালদাতে দাদাদের টিকিটা দেখতে পাবি না।”অমলের কথায় বিদ্রূপ আর শ্লেষ, “অথচ দেখ এই হারামি নকশালরা সমাজতন্ত্র মারাচ্ছে জেলায় জেলায় গ্রামে গ্রামে হারামি জোতদারদের মেরে। এত পারিস কলকাতা এসে দে শালা এই বড় বড় বিল্ডিং ভেঙে, দখল করে নে হারামি সুদখোর মাড়োয়ারীদের ব্যবসা। দেখবি পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা কোটিখানিক বাঙাল গামছা খুলে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে নেমে পড়বে।”
বাবা লক্ষ করলেন অমল শেষের কথাগুলো একটু নিচু গলায় বললেন। তারপর চারদিকে তাকিয়ে বাবার কানের কাছে ফিস ফিস গলায় বললেন, “নকশালের খতমবায়াগুলো নাকি কলকাতাতেও সিঁধিয়ে গেছে? দেখি শালারা রাইটার্স ওড়াতে পারে কি না?”
বাবা একটু ভড়কিয়ে গেলেন অমল কাকুর কথা শুনে। স্কুল জীবন থেকেই তো সমাজতন্ত্রের রাজনীতি করতো অমল। ‘৬০-এর দশকে ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথেই যুক্ত থেকেছে। অমলের কাছ থেকেই বাবার প্রথম হাতেখড়ি বামপন্থি রাজনীতিতে। তারপর স্কুলে শিক্ষকতা শুরা করার পরেও গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সাথেই যুক্ত ছিলেন। নকশাল আন্দোলন যখন পশ্চিমবঙ্গের উত্তরের জেলাগুলোতে ছড়িয়ে গেল, বাবা তাঁর বামপন্থী বন্ধুদের সাথে সমান খুশি হয়েছিলেন। যদিও পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্বের কথা শোনা যাচ্ছিল, তবু বাবা ভেবেছিলেন অমল হয়তো নকশাল আন্দোলনকেই সমর্থণ করছে। বহু অমলের কথাতে বেশ হতাশ হলেন বাবা।
অমল হঠাৎ নিজে থেকে সাবধান হয়ে বললেন, “চারদিকে কিন্তু খতমবাজদের খতম চলছে। কথা বার্তায় একটু সাবধান। আর পুলিশে ধরলে সোজা ‘ঢাকাইয়া ভান’ মাইরা দিবি। কাদার মধ্যে পা হান্দাইয়া নিবি…. যাচ্ছি মাচ্ছি বলে বিছুদ্ধ বাংলা কওনের কোনো দরকার নাই, বুঝলি। তাইলে পুলিশ ভাববো, তুই শালা শরণার্থী, নকশাল না।”
প্রায় শূন্যকামরা অট্টহাসিতে ভরিয়ে তুললেন দুই বন্ধু। অনেকক্ষণ পর বাইরে তাকিয়ে দেখলেন ট্রেন ততক্ষণে উল্টোডাঙা ছাড়িয়ে কলকাতার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। অমল কাকু বললেন, “আর একটু পরেই আমরা শিয়ালদা স্টেশনে পৌছে যাব।”
(চলমান)


