♦️রায়হান রহমান রাহীম
ইয়েল ইউনিভার্সিটির বেনেকি রেয়ার বুক এন্ড ম্যানুস্ক্রিপ্ট লাইব্রেরি পৃথিবীর ইতিহাসের অনেক বিরল এবং আশ্চর্য্য বইয়ের সংগ্রহের জন্য বিখ্যাত ৷ সেই বেনেকি লাইব্রেরিতেই হাতে লেখা, চামড়ায় বাঁধানো ২৪০ পৃষ্ঠার একটি অদ্ভুত বই সংরক্ষিত আছে ৷


কয়েক বছর আগে কার্বন ডেটিং এর মাধ্যমে জানা যায় বইটি আনুমানিক ১৪২০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে রচিত হয়েছিল ৷ বইটির ভেতর লেখা ছাড়াও হাতে আঁকা এমন কিছু ছবি রয়েছে যেগুলোকে দেখতে অনেকটা স্বপ্ন দৃশ্যের মত মনে হয় ৷

উদ্ভট উদ্ভট গাছের ছবি, ডুবন্ত রাজপ্রাসাদের ছবি, স্নানরত মহিলাদের ছবি, জ্যোতিষচিত্র, রাশিচক্রের ছবি, অক্ষর সমৃদ্ধ চন্দ্র- সূর্যের ছবি সম্বলিত এই বইটিকে ‘ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট’ নামে ডাকা হয় ৷ এই ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বই হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে ৷

কেন এই ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টকে ইতিহাসের ‘আনসলভ মিস্ট্রি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়— চলুন জেনে আসা যাক ৷

ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট নামটি এসেছে পোলিশ বই বিক্রেতা উইলফ্রিড ভয়েনিচ এর নামানুসারে ৷ উইলফ্রিড ভয়েনিচ ১৯১২ সালে ইতালির একটি জেসুইট কলেজে এই বইটির সন্ধান পান ৷ বইটি হাতে নিয়েই ভয়েনিচ একদম তাজ্জব বনে গিয়েছিলেন কারন বইটি যে ভাষায় লেখা তার কিছুই তিনি বুঝতে পারছিলেন না ৷ বইটির লেখকই বা কে, কি তার ভাষা, চিত্রগুলো আসলে কি বোঝাচ্ছে — তার কোন কিছুরই কূল কিনারা করতে না পেরে ভয়েনিচ নামমাত্র মূল্যে বইটি কিনে আমেরিকায় নিয়ে আসেন ৷ এই নিয়ে আসা পরবর্তী এখন অবধি কেটে গেছে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ৷ আজও সেই রহস্যের কোন কূলকিনারার সন্ধান পাওয়া যায়নি ৷

ক্রিপ্টোলোজিস্টদের (গুপ্ত সংকেত অনুসন্ধানকারী) ধারনা, বইটিতে কোন সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করা হয় নি ৷ বরং সত্যিকারের কোন ভাষাতেই বইটি রচিত হয়েছিল, যার বর্তমান কোন অস্তিত্ব নেই ৷ তাদের এই ধারনার কারন সম্ভবত ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টে ধারাবাহিক ফ্রিকুয়েন্সির একাধিক অক্ষরের উপস্থিতি ৷ কিন্তু অক্ষরের আকৃতি এত উদ্ভট যে ইতিহাসের অন্যান্য অক্ষরাকৃতির সাথে এর কোনরকম ধর্তব্য মিলই লক্ষ্য করা যায় না ৷

অক্ষরগুলোর নিজেদের ভেতরে গঠনগত এবং আকৃতিগত ভিন্নতাও গবেষকদের চোখে পড়েছে ৷ সম্প্রতি বড় অক্ষরগুলোকে গবেষকরা ‘গ্যালোজ ক্যারেক্টার’ হিসেবে আলাদা করেছেন ৷ গোটা বইটিতেই মার্জিত অলংকরণের ছাপ চোখে পড়ে ৷ এ থেকে ধারনা করা হয় সম্ভবত একজন লিখেছেন এবং অন্য একজন ব্যক্তি দ্বারা বইটিতে অলংকরণ এবং চিত্র আঁকার ঘটনাটি ঘটেছে৷

ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট নিয়ে গবেষনার একশ বছরের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত তিন ধরনের মতবাদ গবেষকদের সামনে হাজির হয়েছে ৷ প্রথম মতবাদটি হলো — ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট সম্ভবত কোন সাইফার ল্যাঙ্গুয়েজে লেখা হয়েছে ৷ গভীর কোন নির্দেশ গুপ্ত সংকেতের মাধ্যমে ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টে উঠে এসেছে বলে গবেষকরা প্রাথমিক অবস্থায় ধারনা করেছিলেন ৷ কিন্তু প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিখ্যাত অনেক ডিকোডার এর গুপ্ত সংকেত নির্ধারনে যারপনাই ব্যর্থ হয়েছিলেন ৷ এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও এর অর্থ বের করা সম্ভব হয়নি ৷
দ্বিতীয় মতবাদটি হলো, ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টের পুরো ব্যাপারটিই একটা ভুয়া ঘটনা ৷ সম্ভবত ইচ্ছাকৃত ভাবেই ক্রেতাকে বোকা বানাতে এতে নানা আজগুবি বর্ণ ও ছবির ব্যবহার হয়েছে ৷ কেউ কেউ মনে করেন এটি মধ্যযুগীয় কোন চতুর ব্যক্তির কাজ ৷ আবার কারো কারো ধারনা ভয়েনিচ নিজেই এই কাজটি করেছিলেন ৷ যদিও সে সমন্ধে নির্ভরযোগ্য কোন প্রমাণ এখনো গবেষকদের হাতে এসে পৌঁছায়নি ৷
এই সমন্ধে তৃতীয় মতবাদটি হলো — বইটি সম্ভবত সত্যিকারের কোন ভাষাতেই লেখা হয়েছে ৷ কিন্তু এমন এক ধরনের ভাষায়, যার মৌখিক প্রচলন থাকলেও ছিলো না লেখ্য কোন সুনির্ধারিত চেহারা ৷ মধ্যযুগীয় পন্ডিতরা হয়তো নতুন ভাষা তৈরির তাগিদ থেকেই এই ভাষার অবতারনা ঘটিয়েছিলেন ৷ যদি তাই হয়, তবে ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টের ভাষা অনেকটা পূর্ব আইসল্যান্ডে আবিষ্কৃত ‘রঙ্গোরঙ্গো স্ক্রিপ্ট’ এর ভাষার মতই এমন একটি ভাষা, যা নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর বিনাশের সাথে সাথে ইতিহাস থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল ৷

এখন পর্যন্ত ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্টে কি লেখা আছে তার পাঠোদ্ধার সম্ভব না হলেও মানুষের কল্পনা কিন্তু একেবারেই থেমে থাকেনি ৷ যারা বিশ্বাস করেন একদম নতুন একটি ভাষার অবতারনার জন্য বইটি লেখা হয়েছিল, তাদের ধারনা ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট হয়তো ঐ নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির কোন বিরাট এনসাইক্লোপিডিয়া হলেও হতে পারে ৷

কেউ কেউ ভাবেন এটি ত্রয়োদশ শতকের দার্শনিক রজার বেকনের লেখা হতে পারে, যিনি ব্যাকরণের বৈশ্বিক সূত্র নির্ণয়ের জন্য বইটি রচনা করেছিলেন ৷ বা এটি হতে পারে ষোড়শ শতাব্দীর এলিজাবেথীয় মিস্টিক জন ডি’র কোন কর্ম, যিনি আলকেমি ও জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চার জন্য বিখ্যাত ছিলেন ৷
কেউ কেউ তো একটু বাড়িয়েও কল্পনা করতে চান ৷ তাদের মতে এটি হয়তো ইতালীয় ডাকিনীদের হাতে লেখা কোন মন্ত্রজাত বই বা ভীনগ্রহীরা হয়তো এসে বইটি লিখে দিয়ে আবার নিজস্ব গ্রহে ফিরে গিয়েছে ৷
তবে বিগত একশো বছরের সব জল্পনা কল্পনায় জল ঢেলে দিয়ে সাম্প্রতিক সময়ের বিজ্ঞানীরা ভয়েনিচ ম্যানুস্ক্রিপ্ট সংক্রান্ত নতুন আলোর সন্ধান পাচ্ছেন ৷ এ ক্ষেত্রে বইটির কার্বন ডেটিং এর ঘটনাই প্রাথমিক অবস্থায় নতুন আলোর ইশারা হিসেবে ধরে নেয়া যায় ৷

তার সূত্র ধরেই ইতিহাসবিদেরা অনুমান করছেন বইটি হয়তো প্রাচীন রোম এবং প্রাগ সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট দ্বিতীয় রুডলফ থেকে ১৬১২ সালে তার চিকিৎসক জ্যাকবাস সিনেপিয়াসের কাছে হস্তান্তরিত হয়েছিলো৷ পাশাপাশি ভাষাবিজ্ঞানীরাও কিছু কিছু শব্দের অর্থ আন্দাজ করতে চেষ্টা করেছেন ৷ কিন্তু পুরো প্রক্রিয়াটিই এত ধোঁয়াশা এবং ধীর গতির যে সহসাই বইটির সমন্ধে গঠনমূলক কোন বিবৃতি পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না ৷
আচ্ছা, যদি সত্যিই একদিন বইটির পাঠোদ্ধার সম্ভব হয় তবে কী পাওয়া যেতে পারে ? এটা কি পনেরো শতাব্দীর কোন প্রতিভাবান চিত্রকরের স্বপ্ন দৃশ্যের বিস্তৃত বর্ণনা নাকি হারিয়ে যাওয়া কোন সভ্যতার অজানা কোন সংস্কৃতির বিশদ বিবরণ ? কিংবা এমন কি হতে পারে পুরো বিষয়টার আসলেই কোন অর্থ নেই ? আপনি কি মনে করেন ?
References:
- The Voynich Manuscript: who wrote the mystery medieval codex and what is it trying to tell us?
- Voynich manuscript
- Did Codebreakers Crack This Mysterious Medieval Manuscript?
- The world’s most mysterious book
Feature Image: National Geography


