রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

পংকজ পালের সমকালীন গল্প || অবাধ্য আলো

অবাধ্য আলো

[১]

মীমের বয়স তখন ছাব্বিশ।
কর্পোরেট চাকরি,পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতন। নিজের মতো করে চলা—একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট, অফিসের কোণের ডেস্ক, আয়নার সামনে প্রিয় লিপস্টিক, উইন্ডচাইমের মতো কাঁধে খসে পড়া চুল।

সে জানত, সে সুন্দরী।
তবে নিজেকে সাজাতো নিজের আনন্দে, কারো রুচি মেটাতে নয়। ভাবত—”বিয়ের পর হয়তো এই রঙিন জীবনটায় আরও একটা রঙীণ মানুষ জুড়বে, কমবে না কিছুই।”
কিন্তু সে জানত না, কারও কারও কাছে সুন্দরী মানেই ‘ট্রফি’।

[২]

পারিবারিক ভাবে বিয়ে হলো তার ৷ স্বামী সরকারী চাকরি করে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ৷ কিন্তু একটু বেটে ৷ প্রথমে মীম রাজি ছিলনা ৷ বাবা মায়ের চাপে সে রাজি হলো ৷
বিয়ের কয়েকদিন পর মীম বুঝলো তার স্বামী মিশুক কম, অফিস আর বাড়িই তার সব ৷ কিছুটা অহংকারী ৷ একদিন স্বামী বললো—
“চাকরি এখন ছেড়ে দাও, সংসারে মন দাও। তোমার দায়িত্ব আমার।”
কিছুদিন ভালোই চলছিল তারপর থেকেই শুরু হলো পোস্টপেইড ভালোবাসা।
টাকা চাইতে হতো ছোটখাটো খরচে, স্বামী যেন দেয় হাত পেছনে রেখে—“সংসারের সবকিছু আমিই ক্রয় করছি ৷ তোমার দরকার কীভাবে এত বেশি?”

মীম প্রথমে সহ্য করেছিল। ভাবত, এটা হয়তো সাময়িক। কিন্তু দিন যায়, সম্মান বাড়ে না, শুধু হিসাব বাড়ে।

[৩]

কিছুদিন পর স্বামী অফিসে চলে গেলে কাজের অবসরে, মীম গোপনে শুরু করেছিল অনলাইন ব্যবসা। নিজের মাথা দিয়ে মার্কেটিং, নিজের ভাষায় কনটেন্ট। প্রতি মাসে প্রায় সত্তর-আশি হাজার টাকা প্রফিট।

তবু ধরা পড়ার পর, স্বামীর ধমকের শব্দ ছিল করাতের মতো—
“তুমি কি আমার কথা শোনো না? “সংসারটাই যখন ঠিক মতন হচ্ছে না, কিসব নিয়ে এতো ব্যস্ত কেন তুমি? আমাদের পরিবারের সম্মানটুকু আর থাকলো না৷ লোকে বলবে আমার বউ টিকটকার !”
মীম চুপচাপ ৷ প্রতিবাদ করতে পারে নি ৷ মনে মনে বলেছিল-“কারণ আমি মানুষ… শুধু বউ না।”
ব্যবসাটা বন্ধ হলো।
স্বপ্নের সেই আলো, অচেনা অন্ধকারে চাপা পড়লো।

[৪]

কয়েক বছর পর, মীম সিদ্ধান্ত নিলো সে সংসার করবে না ৷ যেখানে স্বাধীনতা নেই ৷ এমনতো না যে, সে কাজে ফাঁকি দিচ্ছে ৷ এই অলস সময় কাটাতে একটা কিছু করতে চায় সে আর তাতেই এত দোষ ৷

মা বলেন—“ছেলেটা পরকীয়া তো করে না, অন্য মেয়ের পিছে ঘুরে না ৷ সভ্য-শান্ত ৷ খাওয়ায়-পরায়, তোর বর তো ভালো।”
মীম—”আমি এত শিক্ষিত হলাম কেন ? আমার কি স্বাধীনতা নাই ৷ আর আমিতো খারাপ কিছু করছি না ৷”
মা বলেন—”আমি সংসার করছি না ? আমি যৌতুক দিয়েও সংসার ধরে রেখেছি ৷ তোদের এই স্বাধীনতা ভাবাটাই আমাদের কাছে পাপ ছিলো ৷”

মীম জানে, মায়ের সংসার ছিল পেটের চাপে চলা।
সে জানে, তার মা ADHD-র ভেতর দিয়ে একা লড়েছেন।
তবু প্রশ্ন জাগে—”তুমি পারোনি মানে আমাকেও কেন পারতে হবে, মা?”

এখন ছেলেরা তার বেঁচে থাকার একমাত্র যুক্তি। তাদের মুখের নিস্পাপ ভরসায় সে চোখের জল লুকিয়ে রাখে।

[৫]

একদিন, হঠাৎ এক পুরনো কলিগ মেসেজ করে—
“তুই কি লিখিস এখনো? একটা ওয়েবজিনে জায়গা পেতে পারিস। সময়ও কাটবে, কিছু সম্মানীও দিবে ৷ আমি ওদের এড্রেস মেসেঞ্জারে দিচ্ছি৷”

মীম ভয় পায়।
সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে নিজের ছায়ার সাথে।
তবু কলিগের শেষ লাইন তার বুকের পাঁজর কাঁপায়—
“তুই তো আলোর মতন ছিলি, কোন বাধাই মানতি না ৷ ভুলে গেছিস?”

ছদ্মনামে সে লিখে ফেলে এক গল্প—
“একটা আমি, বেঁচে থাকি।”
গল্পটি ভাইরাল হয় ৷ পাঠকের সাড়া দেখে তার চোখে জল আসে। হাজারো কমেন্ট ৷ কেউ বলে—“তুমি আমার গল্প বলেছো।”

[৬]
একদিন মীমের ল্যাপটপে স্বামী লেখাটা দেখে।
ভেতরে কী যেন নড়ে ওঠে তার—
সে হয়তো চায় রাগ করতে, কিন্তু পারে না।

সে শুধু বলে,
“তুমি কি এসব আগে থেকেই পারতে?”
মীম চেয়ে থাকে আর বলে —
“পারতাম, কিন্তু তোমার অন্ধকার আমাকে বোঝেনি।”

স্বামী চুপ থাকে, তবে এবার তার চোখে কোনো দাবি নেই, শুধু একটা হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার ছায়া।

এমন সময় ছেলে বলে— “মা, তুমি কি আগে আরও ভালো ছিলে?”
মীম হাসে: “আমি এখনও আছি, তবে আলোকিত হবার পথটা একটু বাঁকা হয়ে গেছে।”
ছেলে: “তাহলে তুমি এখন কেমন আলো?”
মীম: “একটা অবাধ্য আলো—নিজের ইচ্ছেমতো জ্বলে উঠি।”

[৭]

বৃষ্টি নামছে।
মীম জানালার পাশে বসে লিখতে থাকে—

“আমি কোনো রানী নই, কারও ট্রফিও না। আমি নিজেই এক পৃথিবী।
আমাকে যে ভালোবাসতে চায়, তাকে আমার আলোয় চোখ রাঙাতে হবে—
কারণ আমি আর চাপা আলো নই।
আমি অবাধ্য আলো।

লেখক পরিচিতি

পংকজ পাল
পংকজ পাল
তরুণ গল্পকার ও কবির জন্ম ১৫ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলায় ৷ বি.এস.সি (অনার্স), এম.এস.সি ; এল.এল.বি; শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন ৷ তার প্রকাশিত একক গ্রন্থ দুইটি ৷ কাব্যগ্রন্থ-'নিঃসঙ্গতার মেঘমালা' ও গল্পগ্রন্থ-'আকাশের নীল রং' এবং যৌথগ্রন্থ-চল্লিশের বেশি ৷ জেলার উদীচী, প্রগতি লেখক সংঘ, খেলাঘর, প্রথম আলো বন্ধুসভা, উত্তরণসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন ৷ বর্তমানে সম্পাদনা করছেন-'পলিমাটি','অন্তরঙ্গ 'ও 'চিন্ময়ী'৷ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে জেলা পর্যায়ে আয়োজিত ৩১তম বিজ্ঞান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সপ্তাহ ২০০৯-১০ খ্রিস্টাব্দে সিনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান, কবিতা সংসদ সাহিত্য পদক-২০১৪, বাংলাদেশের লেখক-'লেখক ডিরেক্টরি'র অন্তর্ভূক্ত-২০১৪, কাব্য চন্দ্রিকা একাডেমি পদক-২০১৭, লিখিয়ে কাব্য সাহিত্য সম্মাননা-২০১৮, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন স্মারক-২০১৮, কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি স্মারক ও সম্মাননা-২০২২ পেয়েছেন ৷ মেইল : pankajprenoy@gmail.com/ paulpankaj864@gmail.com

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা