রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

পংকজ পালের গল্প

শূন্যতা 

এক.
গ্রীষ্মের দুপুরে কাঠফাটা রোদে আমার গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে। গা বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরছে। সারাটা গা ভিজে এমন হয়েছে যে মনে হচ্ছে এই মাত্র স্নান করে উঠেছি। গতকালই বাড়ি থেকে এসেছি এখন আবার ফিরতে হচ্ছে মায়ের ফোনে। মা কান্না করে বলেছিল— শুভ তাড়াতাড়ি আয়, তোর বাবু ব্রেইন স্ট্রোক করেছে।
সম্পর্কের এক অদ্ভুত টান। কথাটা শোনার পর মাথার ভিতর চক্কর দিচ্ছিল। পৃথিবীটা ঘুরছিল বনবন করে। আমি তখন মাস্টার্সের ক্লাসে ছিলাম। শোনামাত্রই রওনা হয়েছি।
আমরা তিন ভাই বোন। আমি বড়, বোন মেজো আর ভাই ছোট। বোন অনার্সে পড়ে আর ভাই ইন্টারমিডিয়েটে। পড়াশোনার কারণে আমরা তিনজনেই বাইরে থাকি। আমি আর বোন একই ইউনিভার্সিটিতে ৷ ভাই জেলা শহরের কলেজে ৷ বাড়িতে থাকেন মা আর বাবা।
ফোনটা পেয়ে ভাই-বোনকে জলদি ফোন দিলাম । ওরাও ক্লাসে ছিল। আমাকে দেখেই বোনটি কেঁদে দিলো ৷ আমি কান্না চেপে রেখে বোনকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বাসটা চলছে যেন গরুর গাড়ির মতো।
বাবা আমাদের গ্রামের কলেজেই শিক্ষকতা করেন। বাবা খুব পরিশ্রমী। স্কুলের বাইরে অন্য সময়ে বাড়ির জমিজমা দেখাশোনা করেন। পুকুরে মাছ চাষ, বাগানে ফল ও সবজি চাষ বাবা নিজ হাতেই করেন। বাবা প্রগতিশীল মনের মানুষ।
ফোনটা বেজে উঠতেই দেখলাম ছোট ভাইয়ের ফোন।অন্য সময় কলব্যাক করি ৷ এখন রিসিভ করতেই বলল—কোথায় তোরা তাড়াতাড়ি আয়। আমি আসছি।
আমার বোনটা সাধারনত চঞ্চল প্রকৃতির । ও খুব কান্না করছে। হঠাৎ বাসটা স্টেশনে থামলো। স্টেশনে কালু মামা অপেক্ষা করছিলো ৷ আমরা পড়িমরি করে বাস থেকে নামলাম ৷ দৌড় দিলাম । দৌড় এর মধ্যে কিভাবে যেন বাড়িতে এসে পৌঁছালাম।
বাড়িতে এসে দেখি লোকজন বাবার মাথায় জল ঢালা ঢালি করছে। প্রতিবেশীয় এক চাচা বললো— এলাকার অজন্ত ডাক্তার এসেছিল। বলে গেছে হাসপাতালে নিতে হবে সোজা জেলা সদরের হাসপাতালে। আমি অ্যাম্বুলেন্সে ফোন দিয়েছি এসে গেছে প্রায়।
বাবার কাছে গিয়ে বসলাম ; কি একটা ঘোর কি একটা অনিশ্চয়তা বলে বোঝানো যাবে না।
তিন চার মিনিটের মধ্যে এম্বুলেন্স এসে সত্যি সত্যি পৌঁছলো। বাবাকে ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হলো । আমার অস্তিত্বকে তোলা হলো । একটা ঘোরের মধ্যে কিভাবে আমরাও যেন এম্বুলেন্সে উঠলাম! আমরা জেলা সদর হাসপাতালের দিকে রওনা হলাম।

৩০-৩৫ মিনিটের পথ এম্বুলেন্সে। এই পথটুকুই আজ অনেক বড় মনে হচ্ছে । যেতে যেতেই আত্মীয়দের ফোন দিচ্ছি । বাবাকে নিয়ে কত কথা মনে পড়ছে ৷
বাবা প্রতিদিন কয়েকবার ফোনে আমাদের খোঁজ নিতেন । খেয়েছি কি না, স্নান করেছি কি না, শরীর মন কেমন এসব জিজ্ঞাসা করতেন। আরো অনেক খোঁজ খবর নিতেন। মাঝেমধ্যে বলতাম—বাবা দিনে এতবার খোঁজখবর নিতে হবে কেন ? আমরা তো ভালোই আছি। হয়তো ব্যস্ততার কারনে অনেক সময় ফোন ধরা হতো না। বাবা যেন বুঝতেন, বলতেন— যেদিন বাবা হবি, সেদিন বুঝবি সন্তানদের জন্য মনটা কেমন করে !
অ্যাম্বুলেন্সে চলছে প্যা প্যা করে সাইরেন বাজিয়ে। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি ৷ কত নিষ্পাপ আর মায়াময় মুখটা অসহায়ের মত পড়ে আছে। জেলা সদর হাসপাতালের গেটে আমার কিছু আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধুবান্ধব আগেই এসে দাঁড়িয়েছিল। তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে নেওয়া হলো। কর্তব্যরত ডাক্তার বললেন অবস্থা ভালো না, ঢাকা নিতে হবে ৷ আমাদের এখানে রাখা সম্ভব না।
তাই ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। আত্মীয়দের কেউ কেউ হাতে কিছু টাকা গুজে দিলো । আমি যন্ত্রমানবের মত পকেটে রাখলাম । কে কি বলছে আর কে কি দিচ্ছে মাথায় নেই ৷ মাথায় একটা শব্দই খেলা করছে বাবাকে ঢাকায় নিতে হবে।
অ্যাম্বুলেন্স ঘোরাতেই ছোট ভাই আর বোনকে বললাম তোমরা বাড়িতে যাও । বাড়ি ঘর খালি । ওরা শুনতে চাই ছিল না আমাদের সাথে যেতে চাইছিল। আমাদের গ্রামের প্রতিবেশীয় নয়ন দাদা; তিনিও মাস্টার্সে পড়েন । তিনি বললেন—শুভদীপ,ঠিকই বলেছে তোমরা বাড়িতে যাও । আমি শুভদীপ এর সাথে ঢাকায় যাচ্ছি৷
অবশেষে আমি, মা আর নয়ন দাদা-বাবাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছুটলাম। মা কেঁদেই চলেছেন ৷ নয়ন দা মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন । এম্বুলেন্স চলছে…

নবীনগরের কাছে তীব্র যানজটে আটকে গেছে আমাদের এম্বুলেন্স । এ এক অন্যরকম যানজট। গাড়ি এক বিন্দুও চলছে না । দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । অ্যাম্বুলেন্স এর শব্দ আমাদের ট্রাফিকের কানে যায় না । অদ্ভুত দেশে বাস করি আমরা । এখানে রোগীর জন্য আলাদা রাস্তা নেই । মরবার সময় আমাদের কিছুই করার থাকে না ! শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া…
মা বললেন—শুভ, আর কতক্ষণ?
আমি বললাম—এইতো মা, প্রায় এসে গেছি…

কিন্তু আমিতো জানি এটা এক অদ্ভুত সিস্টেম । আমরা এখন এই সিস্টেমের মধ্যে আছি । এই দেশে নিয়ম-নীতির নাই বালাই ! রাস্তাঘাট দখল করে বিল্ডিং তুলে বড় বড় নেতা আর প্রভাবশালী লোকেরা। আর যার যার মতো করে গাড়ি কিনে সেই গাড়ি রাস্তায় নামিয়ে জ্যাম তৈরি করে। একবার মনে হয় সবকিছু ভেঙ্গে যদি দৌড়ে দৌড়ে যেতে পারতাম তাহলে ভালো হতো ৷
হঠাৎ জ্যাম কমলো । একসময় পিঁপড়ের গতির মতো করে আমাদের গাড়ি হাসপাতালে পৌঁছালো । আমার এক মেসো নিউরোসার্জন ৷ উনার পরামর্শ মতো হাসপাতালে গেলাম । ওখানে অনেক ফরমালিটিস। দৌড়ঝাঁপ । আমিও দৌড়াচ্ছি, নয়ন দাও দৌড়াচ্ছে । একবার ডাক্তারের কাছে, একবার নার্সদের কাছে। আর আমার অচেতন বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে মা কেঁদেই চলেছে।
ডাক্তার এখন নাই পরে আসবেন । এটা সব হাসপাতালের অতি পরিচিত চিত্র । ডাক্তাররা আমাদের কাছে দেবতা হলেও কিছু ক্ষেত্রে কিছু ডাক্তার কসাইয়ের চেয়েও কম না। এরা সহজে রোগীর কাছে আসতে চায় না । চেম্বার নিয়ে ব্যস্ত । চেম্বার তার কাছে ধ্যান-জ্ঞান । রোগী দেখাশোনা করেন ডিউটি ডাক্তার । বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেডিকেল পড়ুয়া স্টুডেন্টস্। আমাদের এক্ষেত্রেও তাই ৷ ডিউটি ডাক্তার আর মেডিকেল স্টুডেন্টদের রিকোয়েস্ট করে মেসোর রেফারেন্সে বাবাকে ভর্তি করা হলো। মেসোর রেফারেন্সে জটিল ধাপ সহজে অতিক্রম হলো ৷

বাবার অবস্থা ভালো না, এটা বুঝতেই পারছি-ডিউটি ডাক্তারদের চাহনি দেখেই । নার্সদের সাথে ডাক্তাররা কি যেন বলাবলি করছিল । আমরা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম—কি অবস্থা ? কি হয়েছে ?
ওনারা বললেন—স্ট্রোকের কারণে ব্রেন হেমারেজ ৷ তাড়াতাড়ি অপারেশন করতে হবে ।
আমরা বললাম—তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করেন ।
ওনারা বললেন—স্যার, এলেই করবেন । এতক্ষণে সবকিছু রেডি হোক ।
ফোন পেয়ে বন্ধু বিপ্লব,মামুন, মাজহারুল ও ফারুক এসেছে ৷ আমাদের শুভাকাঙ্খী উত্তম বাবুও এসেছে ৷ এরই মধ্যে সকলেই ফোন দিচ্ছে ৷ কারোটা ধরা হচ্ছে, কারোটা হচ্ছে না । কিছুক্ষণ পর ডাক্তার মেসো এলেন । আমাকে দিয়ে কাগজপত্র সাইন করানো হলো । বাবাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হলো ।

নানা ঘোর আর টেনশনের মধ্যে সময় গেল । দীর্ঘ সময় পর অপারেশন থিয়েটার থেকে ডাক্তার (মেসো) বের হয়ে বললেন—অপারেশন সাকসেস ফুল ।
বাবাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে । তারপরও নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না এখনই । ব্যস্ততার জন্য বন্ধুরা আর উত্তমবাবু চলে গেলেন ৷

দুই.
ইতিমধ্যে খবর পেয়ে চলে এসেছেন ডাঃ মনা মাসি। গীতাঞ্জলি পিসি । উনারা অনেক ছোটাছুটি করেছেন । মাসির বাসা হাসপাতালের কাছাকাছি । মাসি বলছেন —চলো, সবাই বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেই ।
এখন রাত দশটার মত বাজে । আমি বারণ করলাম ৷ আমার খিদে তৃষ্ণা কিছুই নেই । মাসি বললেন—আরে বোকা, জামাইবাবু এখন আইসিইউতে আছে । চিন্তা করো না। একটু ফ্রেশ হয়ে কিছু খেলে ভালো লাগবে ।

কিন্তু আমার মন এখান থেকে দূরে যেতে চাইলো না । মনে একটা ভয় কখন কি হয় ? আমি না থাকলে বাবা জেগে ওঠে যদি কাউকে না দেখে ৷ এরকম একটা অদৃশ্য ভাবনা আমাকে তাড়না দিচ্ছিল । তাছাড়া ডিউটি ডাক্তার বলেছিল— আশেপাশেই থাকতে,যে কোন সময় প্রয়োজন হতে পারে ৷
না বললেও থাকতাম ৷ এই মুহূর্তে দূরে যাওয়া যায় না। নয়ন দা বলল—চল,ফ্রেশ হয়ে আসি । বুঝলাম, তার খিদে লেগেছে । এত দূর থেকে এসেছে লাগাটাই স্বাভাবিক । তখন আমি মাকে ও নয়নদাকে পাঠিয়ে দিলাম মাসির সাথে। মা কিছুতেই যাবে না কিন্তু মা ডায়াবেটিস আর প্রেসারের রোগী, তাই অনেক বুঝিয়ে তাকে পাঠালাম । আর বললাম— তোমাদের রাতে আসতে হবে না । রেস্ট নাও ৷ প্রয়োজন আমি তোমাদের ডাকবো ।

আমি বসে আছি আইসিইউর সামনে বারান্দার চেয়ারে । মন বলছে বাবা সুস্থ হবেন কেননা বাবার জন্য এখনো কিছুই করতে পারেনি আমরা। সারাজীবন লোকটা আমাদের জন্য কত কষ্ট করেছেন , শুধু দিয়েছেন । এবার আমাদের দেবার পালা । গ্রাম থেকে বন্ধু চিত্ত, সুমন, রামপ্রসাদ দা, মন্টুদা,কালুদা, জীবনদা,লিটন সহ অনেকেই ফোনে খোঁজ নিচ্ছে ৷
এলোমেলো ভাবনায় খেয়াল করা হয়নি আকাশে সুন্দর একটা চাঁদ উঠেছে । ঝিরঝির বাতাস বইছে। হাসপাতালের বারান্দায় একটা অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ তৈরি হয়েছে । যতদূর চোখ যায় কোথাও কেউ নেই ৷ একেবারে খালি বারান্দা শুধু বিল্ডিংয়ের পিলার আর বাতিগুলো জ্বলছে । আইসিইউতে দায়িত্বরত ডাক্তার ছাড়া এদিকে জনমানব নেই বললেই চলে । দূর হতে কাঁচের ভেতর দিয়ে বাবাকে উঁকি দিয়ে দেখে আসি আবার বেঞ্চে বা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসি । আধো আলো আধো ছায়া মায়াময় পরিবেশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে সকল ক্লান্তি যেন ভুলে গেছি । চোখ ঢুলুঢুলু করছে । পিনপতন নীরবতা ।
একটা অন্যরকম গন্ধ হঠাৎ নাকে এলো । কেমন যেন মেয়েলী মেয়েলী গন্ধ এবং গুমড়ে গুমড়ে কান্নার আওয়াজ । নিজেকে কেমন ভীত মনে হলো । ভয়ে ভয়েই পাশে তাকালাম । যা দেখলাম তার জন্য মন প্রস্তুত ছিল না । দেখলাম গারো আকাশী নীল সালোয়ার-কামিজ পরিহিত একটি সুন্দরী মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে টিস্যু পেপার হাতে নিয়ে । সৌন্দর্য উপলব্ধি করার অবস্থানে নেই কিন্তু তাই বলে সুন্দরকে তো আর অসুন্দর বলা যায় না । প্রকৃতপক্ষেই সে পরীর মত সুন্দরী । এই সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা এই মুহূর্তে এর চেয়ে ভালো করে দেওয়ার মত ক্ষমতা আমার নেই ।
টিসু পেপার দিয়ে চোখ মুছছে মেয়েটি । আমি তার দিকে তাকালাম । মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে পাশের আইসিইউ রুমের দিকে চলে গেলো ।

আমি আবার বাবার রুমের দরজায় উঁকি দিলাম ।বাবা পড়ে আছে নিথর অচেতনভাবে । বাবা যদি ভালো না হয় এ জীবন দিয়ে কি হবে ? ঈশ্বরকে বারবার ডেকে যাচ্ছি যদি আমার জীবন নিতে হয় নিয়ে নাও,তবুও বাবাকে সুস্থ করে দাও । ভালো করে দাও ।
ডিউটি ডাক্তার ডেকে একটি কাগজ ধরিয়ে বললেন—এই ইনজেকশনটা তাড়াতাড়ি নিয়ে আসুন । দৌড়ে গিয়ে নিচের দোকান হতে তাড়াতাড়ি ইনজেকশনটা আনলাম । ডাক্তারকে দিতে দিতে বললাম— এখন কি অবস্থা বাবার ?
উনি বললেন—এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না ।
ডাক্তার ইনজেকশন পুশ করলেন আমি বারান্দায় চেয়ারে এসে বসলাম । রাতটা বোধ হয় শেষ হবে না। মাথাটা ঝিমঝিম করছে ৷ বমি বমি ভাব, বুঝলাম গ্যাসটিকে চাপ দিয়েছে । খেয়াল করা হয়নি মেয়েটি পাশের চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে রয়েছে।
মাথায় প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে । মাথাটা হাত দিয়ে চেপে ধরে বসলাম ।
—নিন
তাকিয়ে দেখি মেয়েটি একটি জলের বোতল ধরে আছে । অপূর্ব কণ্ঠে বললেন—হাত মুখ ধুয়ে নিন ভালো লাগবে।
আমি মন্ত্র মুগ্ধের মত তাই করলাম । আচমকা মেয়েটি প্রশ্ন করল—কি হয়েছে আঙ্কেলের?
—ব্রেইন স্ট্রোক
—ও
যদি কিছু মনে না করেন,আপনি কাঁদছিলেন কেন?
আমার বাবা-মা চট্টগ্রাম থেকে আসতে গিয়ে কার একসিডেন্ট করেছেন । ড্রাইভার স্পট ডেড। লোকজন বাবা মাকে এখানে ভর্তি করেছেন । বাবা মার অবস্থা ভালো না । আইসিইউতে আছে । বাবা ঢাকায় সচিবালয়ে চাকরী করতেন । সেই সুবাদেই আমাদের ঢাকায় থাকা। আমার ঢাকাতে কেউ নেই । আমার দাদা আমেরিকায় থাকেন । মামা বাড়ি চট্টগ্রামে । মা-বাবা ওখানে একটা ফাংশনে গিয়েছিলো। আমার ভার্সিটি এক্সাম ছিল বলে যাওয়া হয়নি। ফিরতি পথেই…
বলতে বলতেই সে আবার কেঁদে ফেলল । আমি অবাক চোখে তার কান্না দেখছি । যার কান্নাই এত সুন্দর ৷ হাসি না জানি কত সুন্দর! মনটা খারাপ হলো বাবা মৃত্যু যন্ত্রণার মধ্যে আছে আর আমি মানুষের সৌন্দর্য নিয়ে ভাবছি । মেয়েটিকে সান্তনা দিয়ে তার বাবা মার আইসিইউ এর সামনে গিয়ে একটু দাঁড়িয়ে রইলাম । প্রার্থনা করলাম উনারাও যেন ভাল হোন ।

আবার বাবার আইসিইউ এর কাছে এসে তাকাই । হাত জোড় করে ঈশ্বরকে বললাম— ঈশ্বর বাবাকে ভালো করে দাও ।
পিঠে একটি অপূর্ব স্পর্শ অনুভব করলাম । গন্ধেই বুঝে গেছিলাম,তাকাতেই দেখি মেয়েটি ৷ বললো— ঈশ্বর অবশ্যই ভালো করবেন ।

তিন.
এ গল্পটি আসলে অন্যরকম ৷ এটা আমার জীবনের গল্প ৷ একদিকে বাবাকে নবরূপে ফিরে পাবার আনন্দ অন্যদিকে অন্যরকম একটা অনুভূতি আবার বেদনারও গল্প ৷ ঈশ্বর বাবাকে ভালো করে দিয়েছিলো ৷ বাবা বর্তমানে ভালোই আছেন ৷ রিটায়ার্ড করেছেন ৷ বই পড়ে পড়ে সময় কাটান ৷

তারপরও এ গল্পটি দুঃখে ভরা ৷ তার জন্য ঘটনার পিছন দিকে ফিরে যেতে হবে —
ঐদিন রাতে যখন বেঞ্চে বসেছিলাম, রাত বারোটা সাড়ে বারোটা হবে এমন সময়ে ধবধবে ফর্সা শাঁখা সিঁদুর পরিহিত বিদেশীদের মত এক ভদ্রমহিলা আর দুইজন ভদ্রলোক আসতেই মেয়েটি ভদ্রমহিলাকে মামি বলে জড়িয়ে কেঁদে ফেললো ৷ উনারাও কাঁদলেন ৷
পরে উনারা সবাই মিলে দূরে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলেন ৷ এরপর আর কথাই হয়নি মেয়েটির সাথে ৷

রাত তিনটার দিকে ডাক্তারকে বাবার কথা জিজ্ঞাসা করতেই বললেন— অবস্থা আগের চেয়ে একটু ভালো । মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম ঈশ্বরকে ৷ ধন্যবাদ জানালাম মেয়েটিকেও । যে নাকি তার নিজের মা বাবা মৃত্যুশয্যায় থাকার পরেও আমার বাবার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছিলো।

একটু তন্দ্রাচ্ছন্নতার মধ্যে ছিলাম । ভোর রাতে কান্নাকাটির শব্দে তন্দ্রাচ্ছন্নতা কেটে গেলে জানলাম, মেয়েটির বাবা-মা সকলের মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন পরপারে। মেয়েটি হাউ মাউ করে কাঁদছে তার সাথে মামা-মামিও কাঁদছে ।
আমি পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম আমার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। অদৃশ্য কারণে তার পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে পারলাম না।

আজ প্রায় পাঁচ বছর হতে চলেছে ৷ আজও দিনটির কথা মনে হতেই অন্যরকম বোধহয়। মনের কোণে চিনচিন ব্যথা করে। একটা মর্মান্তিক ঘটনা আর গভীর দুঃখের মধ্যেও এক চিলতে সুখ ছিল মেয়েটির মুখটি । এত টেনশনের মাঝে তার নামটাও জানা হয়নি ; স্বভাবতই মোবাইল নম্বর নেওয়া হয়নি। আর কোনদিন দেখাও হয়নি । জানিনা সে কোথায় আছে ? কিভাবে আছে ?

মাঝে মধ্যে মনে পড়ে তাকে। মনের মনিকোঠায় ভেসে ওঠে প্রিয় মুখটি । অনুভবের মায়ায় জড়িয়ে যাই । জানিনা সেও কি কোন এক অজানা অনুভবে আমায় মনে রেখেছে কি না ? শুধু জানি চাঁদটা উঠলেই আমায় তাড়না করে কি এক অদৃশ্য যন্ত্রণা ; কি এক অদৃশ্য শূন্যতা !

লেখক পরিচিতি

পংকজ পাল
পংকজ পাল
তরুণ গল্পকার ও কবির জন্ম ১৫ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলায় ৷ বি.এস.সি (অনার্স), এম.এস.সি ; এল.এল.বি; শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন ৷ তার প্রকাশিত একক গ্রন্থ দুইটি ৷ কাব্যগ্রন্থ-'নিঃসঙ্গতার মেঘমালা' ও গল্পগ্রন্থ-'আকাশের নীল রং' এবং যৌথগ্রন্থ-চল্লিশের বেশি ৷ জেলার উদীচী, প্রগতি লেখক সংঘ, খেলাঘর, প্রথম আলো বন্ধুসভা, উত্তরণসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন ৷ বর্তমানে সম্পাদনা করছেন-'পলিমাটি','অন্তরঙ্গ 'ও 'চিন্ময়ী'৷ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে জেলা পর্যায়ে আয়োজিত ৩১তম বিজ্ঞান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সপ্তাহ ২০০৯-১০ খ্রিস্টাব্দে সিনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান, কবিতা সংসদ সাহিত্য পদক-২০১৪, বাংলাদেশের লেখক-'লেখক ডিরেক্টরি'র অন্তর্ভূক্ত-২০১৪, কাব্য চন্দ্রিকা একাডেমি পদক-২০১৭, লিখিয়ে কাব্য সাহিত্য সম্মাননা-২০১৮, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন স্মারক-২০১৮, কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি স্মারক ও সম্মাননা-২০২২ পেয়েছেন ৷ মেইল : pankajprenoy@gmail.com/ paulpankaj864@gmail.com

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা