রফিক রিকশাওয়ালা ও নগরায়নের গল্প
এক সময় এক কোলাহলপূর্ণ শহরে রফিক নামে এক রিকশাচালক থাকতো। তিনি একজন নম্র ব্যক্তি ছিলেন ও তার ছিলো বড় হৃদয় এবং সে উজ্জ্বল হাসির অধিকারী ছিলেন ৷ যা মানুষের অন্ধকারতম কোণগুলিকেও আলোকিত করতে পারে। অগণিত কষ্টের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও তিনি তার সততা ও নীতিতে অবিচল ছিলেন।
সূর্য ওঠার আগেই রফিকের দিন শুরু হয়, কারণ তিনি কঠোর পরিশ্রমের জন্য তার রিকশা প্রস্তুত করতেন। তিনি তার বাবার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে রিকশা পেয়েছিলেন, যিনি একজন রিকশাচালকও ছিলেন। এটি একটি পুরানো, মরিচাধরা বাহন ছিল, কিন্তু রফিক এটির খুব যত্ন নিতেন, সে জানতেন যে এটিই তার জীবন ও জীবিকার একমাত্র উৎস।
শহরটি ছিল একটি বিশৃঙ্খল জায়গা, অতিলোভী চালক এবং অধৈর্য্য যাত্রী দিয়ে ভরা। ভাড়া নিয়ে দর কষাকষি নিত্য ঘটনা ছিল ৷ তবে রফিক কখনো এসব নিয়ে কাউকে অভিযোগ করেননি। তিনি প্রতিটি যাত্রীকে কৃতজ্ঞতার সাথে অভিবাদন জানান ৷ সৃষ্টিকর্তাকেও কৃতজ্ঞতা জানান সৎ জীবনযাপনের সুযোগের জন্য ৷ তার পরিবারকেও তিনি কৃতজ্ঞতা জানান তার পাশে থাকার জন্য। তিনি ময়না নামে একজন সহৃদয় মহিলার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাদের একসাথে দুটি ছোট সন্তান ছিল, রাহুল এবং আয়েশা।
তার সামান্য উপার্জন সত্ত্বেও, রফিক সর্বদা তার পরিবারের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিত। সে অক্লান্ত পরিশ্রম করে, ভিড়ের রাস্তা দিয়ে রিকশা টানতো, তার পা ব্যাথা করছে, কিন্তু তার মুখে মৃদু হাসি লেগেই থাকতো। তার যাত্রীদের, বিশেষ করে পর্যটকদের, যারা প্রায়ই সাধারণ ভাড়ার সাথে অপরিচিত ছিল না, তাদের থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করার অগণিত সুযোগ থাকা সত্বেও তার সততা সর্বদাই প্রাধান্য পেত এবং সে তাদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্য আদায় করার ফলে বিশ্বস্ত হওয়ার সুনাম অর্জন করেছিল ৷ রিকশা চালানোর পাশাপাশি সকলের বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর জন্য তার যথেষ্ট সুনাম ছিলো ৷
এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায়, যখন শহরটি মুষলধারে ভিজে গিয়েছিল, রফিক রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবতীকে দেখেছিল, যে উন্মাদভাবে তার হাত নেড়ে রিকশাকে ইঙ্গিত দিচ্ছিল। তার জামাকাপড় ভিজে গেছে, এবং তার ব্যথিত অভিব্যক্তি রফিকের হ্নদয় টানছে। বিনা দ্বিধায়, তিনি থামলেন এবং তাকে তার রিকশার ছাউনির নীচে আশ্রয় দিলেন।
পিউ নামের ওই যুবতী হাসপাতালে পৌঁছতে মরিয়া হয়েছিলেন যেখানে তার অসুস্থ মা শুয়ে ছিলেন। তিনি তার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন যে, সে তার পার্সটি হারিয়ে ফেলায় তার কাছে কোন টাকা পয়সা নেই ৷ রফিক সব শুনে অবিলম্বে তাকে বিনামূল্যে সেখানে নিয়ে যেতে সম্মত হন। “আপনার মায়ের স্বাস্থ্য আরও গুরুত্বপূর্ণ,” তিনি একটি উষ্ণ হাসি দিয়ে বললেন।
রফিকের এই অপ্রত্যাশিত আচরণে পিঈ হতবাক হয়ে গেল। তিনি সৎ রিকশাচালকের গল্প শুনেছিলেন, কিন্তু এটি সরাসরি দেখা তার উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর, রফিক পিউয়ের মাকে রক্তও দিয়েছিল৷
পিউ অন্যদের সহযোগিতায় রফিককে কৃতজ্ঞতার চিহ্ন হিসাবে কিছু অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রফিক বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, এই বলে যে, “আমি আপনাকে এবং আপনার মাকে সাহায্য করতে পেরেছি এতেই আমার পুরস্কার নিহিত।”
রফিকের সদয় আচরণের কথাটি চারপাশে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে এবং শীঘ্রই, আরও বেশি লোক তার রিকশা খুঁজতে শুরু করে, কেবল পরিবহনের জন্য নয়, এই আশায় যে তার সততা এবং সদাচারের সামান্য কিছু তাদের সংস্পর্শে আসবে ৷
বছরের পর বছর অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে “সৎ রিকশাচালক” হিসাবে রফিকের খ্যাতি বাড়তে থাকে। তার দৈনন্দিন সংগ্রাম কমেনি, কিন্তু শহরের মানুষ তাকে প্রশংসিত করেছিল এবং তার মূল্যবোধকে সম্মান করেছিল। এমনকি কেউ কেউ তাকে তার পরিবারের জন্য খাবার ও বস্ত্র দিয়ে সাহায্য করতে চেয়েছিল, কিন্তু সে তার সততায় তা প্রত্যাখান করেছিল ৷
এদিকে তার এই শহরেও পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে ৷ বড় বড় দালান আর শপিংমল গড়ে উঠছে ৷ এসব স্থানে ভীড় লেগেই থাকে ৷
একদিন, রফিক যখন তার রিকশায় যাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করছিল, তখন একজন ভাল পোশাক পরা লোক তার কাছে আসে। লোকটি নিজেকে রাজ পরিচয় দেয় ৷ তিনি একজন সফল সংগঠক এবং রাজনৈতিক কর্মী ৷ তিনি বেশ কিছুদিন ধরে রফিককে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। রফিকের অটল সততা এবং নিষ্ঠার দ্বারা মুগ্ধ হয়ে, রাজ তাকে তার কোম্পানিতে চাকরির প্রস্তাব দেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে এই ধরনের মূল্যবোধ বিরল এবং পুরস্কৃত হওয়ার যোগ্য।
প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হলেও, রফিক নম্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, ব্যাখ্যা করেছিলেন যে তিনি তার রিকশা এবং তার উপর নির্ভরশীল লোকদের পরিত্যাগ করতে পারবেন না। তিনি আরও বলেছিলেন, অনেক বয়স্ক রিকশাওয়ালাও রয়েছে, রফিক তাদের সুখ দুখের সাথী ৷ বৃহওর এই অবহেলিত লোকদের ছেড়ে তিনি নিজের স্বার্থ দেখবেন না ৷ রাজকে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং তার পরিবারের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
প্রতিক্রিয়া শুনে রাজ,রফিকের নীতির আরও বেশি প্রশংসা করেছিল। তিনি উষ্ণভাবে রফিকের হাত নেড়ে বললেন, “বন্ধু, তুমি সত্যিকারের অনুপ্রেরণা। যদি কখনো তোমার মন পরিবর্তন করো, অফারটি নিও।”
হঠাৎই শহরে এলো অটোবাইক ৷ যা হ্যালোবাইক নামেও পরিচিত ৷ এতে ভাড়া কম হওয়ায় লোকজন রিকশা বাদ দিয়ে এতেই বেশি যাতায়াত করে ৷ একসাথে অনেক লোক যেতে পারে ৷ দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে ৷ এর সংখ্যাও আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে ৷ কিছু রিকশাওয়ালা ভাড়া বেশি নিতো এবং যাত্রীদের সাথে ভাড়া নিয়ে কথা কাটা কাটাকাটি করতো ৷ এই সময়ে সেইসব যাত্রীগন অটোবাইক আসাতে বড় রকমের সুযোগ পেল ৷
অনেক রিকশাওয়ালারই কামাই রুজি কমে গেলে তারা অসহায় হয়ে পড়লো ৷ রফিক তবুও রিকশা চালাতে থাকে, একজন দরিদ্র মানুষ হিসেবে নয় বরং একজন সৎ মানুষের মতো যিনি পুরো শহরের সম্মান ও প্রশংসা অর্জন করেছিলেন।
রাতে সকলেই তার কাছে এসে এই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে কিন্তু তারা কিছুই ভেবে পায় না ৷ তাদের কেউ একজন বলে,অভাবের তাড়নায় মরা ছাড়া কোন উপায় নাই ৷ বৌ-বাচ্চাকে খাওয়ানোর মতো কিছুই নাই ৷ কেউ কেউ কিস্তিতে অথবা ভাড়ায় অটো বাইক চালানোর কথা বললো৷ রফিক শান্তনা দিয়ে সকলকে বাড়ি যেতে বললো ৷
রফিক এটি কয়েকদিন আগেই উপলদ্ধি করেছিল ৷ আগের মতো কেউ আর রিকশায় উঠে না ৷ কত লোকজনকে উপকার করেছে তারাও আজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ৷
আজ তিনদিন হলো রফিক কোন যাত্রী তার রিকশাতে তুলতে পারিনি ৷ এদিকে সন্তানদের স্কুলের বেতন দিতে হবে ৷ বৃদ্ধা মায়ের ঔষধ কেনা এমনকি ঘরে একমুঠো দানাও নেই ৷
দূরে মাইকের আওয়াজে সে সেদিকে রিকশা নিয়ে এগিয়ে গেল ৷ নতুন শপিংমলের সামনে নতুন অটোবাইকের উদ্বোধন করা হচ্ছে ৷ রফিক আরেকটু এগিয়ে যেতেই দেখলো নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দিচ্ছে ৷ সে ভালো করে খেয়াল করলো, তাকে পুরস্কৃত করতে যে ব্যক্তি এসেছিলেন তিনিও সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে ৷
একটি অটো থেকে একজন যুবতী নেমে গেল নেতৃবৃন্দের দিকে ৷ রফিক ভালো করে খেয়াল করে দেখলো এতো সেই যুবতী যাকে ঝড় বৃষ্টির দিনে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলো ৷
রফিক তার বেঁচে থাকার অবলম্বন প্রিয় রিকশাটি নিয়ে গ্যারেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো ৷ যেতে যেতে ভাবলো, এমন একটি বিশ্ব যেখানে বস্তুগত সম্পদকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে মূল্য দেওয়া হচ্ছে, ভালোবাসা আবেগের মূল্য কমে যাচ্ছে ৷ এমনকি সততা এবং দয়ার মতো গুণাবলিও অন্যদের জীবনে চিরন্তন প্রভাব ফেলছে না ৷ সবাই ছুটছে নগরায়নের পিছনে, শুধু নিজের স্বার্থটাই যেখানে বড়ো ৷ এমন পৃথিবী রফিকের আর ভালো লাগছে না ৷
রফিক পিতৃপ্রদত্ত তার আশা আকাঙ্খা আর বেঁচে থাকার অবলম্বন প্রিয় রিকশাটি নিয়ে গ্যারেজে রেখে দিল ৷ গ্যারেজ হতে বের হয়ে তীব্র হতাশা আর অনিশ্চয়তায় একটি নির্জন অন্ধকার পথের দিকে হাঁটতে হাঁটতে অদৃশ্য হয়ে গেল…


