রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

অজয় রায়ের গল্প

চক্রাবর্ত

শহরের উপকণ্ঠে রেল লাইনের ধারে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বস্তি এলাকা। কখনও খোলা আকাশ, কখনো পলিথিনের তাঁবুতে বস্তিবাসীদের সংসার। অদূরেই শহরের ভদ্রলোকদের উচ্ছিষ্ট আর্বজনার স্তুপ। কুকুর মশা-মাছির অক্লান্ত দৌড়-ঝাঁপ। সেই সাথে বস্তির অনুষ্ঠির শিকার বিবস্ত্র শিশু কিশোরদের হুমড়ি খেয়ে পড়ার দৃশ্য। বাতাসে উৎকট দুর্গন্ধ। ট্রেন যখন এই এলাকা অতিক্রম করে, যাত্রীদের নাকে রুমাল। কেউ কেউ আবার জানালার আগল টেনে দিয়ে কপাল কুচকে ঘৃণা, বিরক্তি প্রকাশ করেন। কেউ বা কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের প্রতি উম্মা প্রকাশ করে বলে বসেন, কি যে হাল চাল। এই জানোয়ার গুলিকে ওরা উচ্ছেদ করতে পারে না?’ ‘আরে সাহেব কি যে বলেন, এই বস্তি থেকে ওর তো মাসহরা পার, বিজ্ঞজনের মত পাশের লোকটির মন্তব্য ৷

অদূরে আকাশ দুই দুই শহরের বিলাস বহুল বহুতল ভবনগুলি তাকিয়ে দেখে এখানকার বস্তিবাসীদের উলঙ্গ জীবন । জন্ম-মৃত্যু, প্রেম-ভালবাসা, আনন্দ-বেদনার নীরব সাক্ষী ঐ ছোট ছোট খুপরী তাঁবুগুলি । ওদের জীবনের ব্যাপ্তি ঐ তাঁবুতেই সীমাবদ্ধ। বিশাল ভবন গুলির বিদ্রুপাত্মক হাসি বস্তি জীবনের প্রতি ঘু ঘু ছিটানোর সামিল।

মৈনাক উঠে দাঁড়ায় । তার প্রখর উপলব্ধি চিৎকার করে তাকে শোনায় ‘সভ্যতা কত বড় ভন্ডামী!, উদাস দৃষ্টি মেলে পুরো বস্তি অঞ্চলের উপর চোখ বুলিয়ে নেয় সে। দূরে থেকেও কি যেন কিসের আকর্ষণে বার বার ছুটে আসে এই বস্তির নরক যন্ত্রনা কাতর বস্তিবাসীর সান্নিধ্য পেতে।

সহসা ওধারের তাঁবু থেকে এক বৃদ্ধ লাঠি ভর করে এদিকেই এগিয়ে আসছে। মেরুদন্ড ধনুকের মত বেঁকিয়ে গেছে। শীর্ণ দেহখানি অনেক কষ্টে টেনে টেনে দলের এক
পাশে এসে ধপাস করে বসে পড়লো সে। মুখ মণ্ডলে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কোটরগত চোখ দুটির নীচে কে যেন কাজল লেপে দিয়েছে। পাঁজরের হাড়গুলি চামড়া ফুরে ভেতো কাটছে। কপালের শিরাগুলি প্রবল জ্বরের তাপে ফুলে উঠেছে। এক দুঃস্বপ্নের ঘন অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন দেহখানি। মাথায় হাত দিয়ে খক খক করে হাসতে থাকে বৃদ্ধ। কাশতে কাশতে দম ফুরিয়ে যায় । চোখ দুটি স্ফীত হয়ে উঠে । বুকটা হাপরের মত উঠা নামা করে। রেগে উঠে রশিদ ।

: তুমি আবার বাইরে আইচ ক্যান, কিরমান চাচা—-

অনেক কষ্টে একটু দম নিয়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গে উত্তর দেয় কোরবান।

: কত কাল আর ঘরে বন্দী থাকুমরে রশীদ, আমি যে আর পারি না-বাপ-

: না পাইরলে চইলবো ক্যান? ঠান্ডা-টান্ডা লাগায়া অসুক আবার বাড়ায়া ন-ও। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো রশীদ।

কোরবানের মুখটা এক গভীর বেদনায় কোঁকিয়ে উঠে ।

: বাড়ুক, সারা অইয়া যাইক । এত দুঃখু-কষ্ট, জ্বালা আর সয় না। আবার কাশি। গলার মধ্যে ঘড় ঘড় শব্দ যেন দ্রুত মটর গাড়ী ছুটে চলেছে। বুকটা চেপে ধরে চুপ করে বসে রইলো কোরবান।

: কিরমান চাচা, চল তোমারে ঘরে দিয়া আসি। বলল রশীদ। হাত বাড়িয়ে নিষেধ করলো কোরবান। একটু দম নিয়ে বলতে লাগলো আর বাঁইচ্যা থাইক্যা কি লাভ রে রশীদ। আমি বুইড়্যা অইয়া গেছি, মুরুব্বি অইয়া গেছি। তাই তো মাত্র দুই কুড়ি বছর বয়সে কান পাইত্যা আছি কখন ডাক আইসবো । দিন গুইনত্যাছি—। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বুক ভেদ করে শূন্যে মিলিয়ে যায় ।

: কিন্তুক-কিন্তুক এই হাত দিয়্যা দুই মইন্যা পাটের গাইট কলে উঠাইয়্যা দিছি। বিশ্বাস হয়-বিশ্বাস হয় তগোর। মাত্র দশ বছর বয়স যহন বাপ মইরা গেল। দেনা করছে চাইরদিক ডুবাইয়া । মায়-সব বেইচ্যা দিল । এমন কি বসত ভিটাটুকুও। তারপর তার আঁচল ধইরা শহরে চইল্যা আইল্যাম। মায়-ম্যাসে ম্যাসে সাব গো পাক কইরতো, আমি চাকরী নইল্যাম-পাটের কলে-এক কুড়ি ট্যাহা মাইনা। মায় পুতে বস্তির একটা ঘর ভাড়া লইয়া থাইকতাম । মায় সাব গো ভাল ভাল খাওয়ার হাত সাফাই কইরা নিয়া আইসতো। আমারে কাছে বসাইয়া আদর কইর্যা খাওয়াইতো। দিন গুইল্যা ভালই গেল ।

বিয়া কইরল্যাম। সন্তান আইল। মায় আদর কইর্যা নাম রাইখলো কফিল । সংসারে খরচ বাইড়্যা গেল । মাইনা বাইড়ল না খুব একটা। মহাজন গাও পিঠ সাপটাইয়া সোধ দিত।

মায় মইরা গেল। নিষিদ্ধ এলাকায় ছুঁড়ির পাড়ে। লজ্জায়, অপমানে, ঘুর্ণায় মায়ের মরাডাও দেইখতে যাই নাই । মানুষের ঠাট্টা মস্করা আমারে খুব পীড়া দিত। মায়ের অভাব, অর্থ কষ্ট, কফিলের ভবিষ্যৎ চিন্তায় আমার মাথা দিয়া আগুন জ্বইলতো। কত রাইত যে চোখের দুই পাতা এক কইরতে পারি নাই। শরীরডা ভাইঙ্গা গেল। কামে মন টাইনতো না । মেজাজ খিট খিটা হইয়্যা গেল । খুদ খন্দাই ন্যা জ্বর শুরু হইল । মুখ তিতা, জিব্বা বিশ্বাস ।

পুলাপান অইতে বৌড়া মারা গেল । গাছ ফল দুই ডাই গেল । কফিলের বয়স তখন পাঁচ। আল্লাহ, আমার মাথায় গজব ঢাইল্যা দিল। সেদিন পাটের গাঁইট তুইলতে যাইয়্যা ঘুইরা পইরা গেলাম । ডাক্তার খানায় তলব পইরলো । কম্পানীর নিজস্ব ডাক্তার ।

পরদিন ডাক্তার আমারে নিরালে ডাইক্যা যে কথা শুনাইল, মাথা ঘুইরা গেল আমার । অনেক কান্নাকটি কইর্যা তারে অনুরোধ কইরল্যাম । অবশেষে এক মাসের মাইনার বিনিময়ে রিপোর্টটা নষ্ট কইরা ফেল্লাম । সবই কপাল, ডাক্তার বদলি অইলো । নতুন সাহেব আসলো । আবার সেই পরীক্ষার ঝামেলায় পড়লাম । এবার আর শেষ রক্ষা অইল না । কম্পানী আমারে বরখাস্ত কইরলো। এক কলমের খোঁচা আমারে শূন্যে ছুইরা মাইরলো। আমি ডিগবাজী খাইতে খাইতে মাটিতে মুখ থুবড়াইয়্যা পইরল্যাম ।

কোরবানের কোটরাগত চোখ দুটি আর্দ্র হয়ে এলো। কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে এলো । গলার কাছে সাঁই সাঁই শব্দ বেড়ে গেল। খেকুর দিয়ে গলা পরিষ্কার করে বলে চলল কোরবান- খনির সন্ধান পাইয়্যা হীরা তুলতে আইস্যা এক টুকরা কাঁচও পাইলাম না। বিফলে গেল সব । মাথা গুইজবার ঠাঁইডাও নাই। চালডা ভাইঙ্গা গ্যাচে। ড্যাওয়া নাইমলে পানি পড়ে । রাইতে আসমানের তারা গুনি । সারা রাইত ঘুমাই না । ঐ তারা গুইল্যা ঘুমাইতে দেয় না ।

কিন্তুক যে পথে নাইম্যা নিজে শেষ হইয়্যা গ্যালাম। রাক্ষসের কালা হাত যে পথে অপেক্ষা করচে-জাইনাও কফিলরে সেই পথেই ঠেইল্যা দিলাম । কি করমু রশীদ-কি করমু?

কোরবানের গলা ধরে এলো। রশীদ, মুরাদ, কাসেম বিহবলের মত তাকিয়ে থাকে তাদের চোখে মুখেও শঙ্কা-অশুভ ইসারা ।

সহসা রাস্তায় কলের ধারে একটা হৈ-চৈ। দু’দলে বচসার শব্দ। একদল লোক কফিলকে ঘিরে । কালো কুচকুচে ছেলেটি। শক্ত পেশিগুলি দেখে মনে হয় দেহে শক্তি আছে, তার চেয়েও বেশী আছে মনে সাহস । হৈ-চৈ ছাপিয়ে কপিলের গলা শোনা গেল ।

: আমি ঠিক করচি, আবার দেইখলে ঐ হালার মুণ্ডু নিমু আমি৷ ভিড়ের মাঝখান থেকে একজন প্রশ্ন করে- আরে ও কফিল মিয়া কি অইলো?

: আর কইওনা । ঐ যে ঐ হালার মেচি বিলাই, ফলে একটা মাইয়া গোসল কইরত্যাচে, উ হালায় ঐ ভাঙ্গা থামবির উপর বইস্যা বইস্যা বিড়ি টাইনজ্যাচে আর মাইয়্যাডারে মনে হয় শিল্যা খাইত্যাছে। বে-শরম হারাম জাদা। গালে কইছ্যা একটা চড় মাইর্যা দিলাম । বলতে বলতে হাতের লাঠিটা সজোরে ঘুরাতে ঘুরাতে রাস্তার মোড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল কফিল

সমস্ত ঘটনা এক নজরে দেখে নিল কোরবান। তার ঠোঁটে পরম তৃপ্তির হাসি ৷

: জানস রশীদ, কফিল না ঠিক আমার মতই হইচে । অরে দেইখলে আমার অতীত জীবনডারে মনে পইড়া যায় । আমার পুরো রূপটাই অর মধ্যে দেখত্যাছি কিন্তুক, কিন্তুক আমার মতো হয়তো অরও যক্ষ্মা অইবো, ডাক্তারের চোখে ফাঁকি দিয়া কাজে টিকতে চাইবো, বরখাস্ত অইবো, ঐ বস্তির ঘরে পা গাইড়্যা বইসবো অকালে, না-না-না। কোরবানের চোখ জ্বলে ওঠে দাউ দাউ করে । এক জ্বলন্ত অগ্নি পিন্ড ঠিকরে পড়ে পৃথিবীটাকে ভস্মীভূত করে দেবে বলে । আর সেই ভস্মের সাথে নিজেকে মিলিয়ে দেবে সে।

: রশীদ বাপ-তোরা সংগ্রাম কর। তগোর সাথে আমি আছি। আমার খোলা বুক পৃথিবীরে দেখামু, উত্তর চাইমু-একই আসমানের নীচে, একই মাটিতে আমার মত লক্ষ লক্ষ বুক এমনে খোলা হইয়্যা গেল ক্যান? ক্যান? ক্যান? কোরবানের গলার শিরাগুলি ফুলে উঠলো । ঘড় ঘড় শব্দ । দম নিতে কষ্ট হচ্ছে। কাশি-বিরামহীন কাশি। কাশতে কাশতে রক্ত। লাল রক্তের স্রোত। রশীদ মুরাদ কাসেম বসে ওকে জড়িয়ে ধরলো। বুক মলে দিতে লাগলো । তাতে কোরবানের যেন উপশম হলো । কাশি থামলো । উপরের দিকে চোখ তুলে রশীদ বলল-সাহেব! চাচা-বুঝি চলে গেল ।

মৈনাকের দু’চোখ গড়িয়ে কয়েক ফোটা জল ঝরে পড়লো। স্নায়ুতে প্রচন্ড ঝড় । গ্রহণ তো চিরস্থায়ী কিছু নয়, একটি ছায়া। শুরু হয় আবার শেষও হয়ে যায়। এ গ্রহণ কি কোনদিনও শেষ হবে না?

লেখক পরিচিতি

অজয় কুমার রায়
অজয় কুমার রায়
কবি গল্পকার ও প্রাবন্ধিক অজয় কুমার রায় মানিকগঞ্জ জেলায় ঘিওর উপজেলার নারচি গ্রামে ১৯৪৮ সালের ৫ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-প্রয়াত অক্ষয় কুমার রায়,মাতা-দিভা রায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি রাজবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে ২০০৫ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা,সাময়িকীতে ও যৌথ গ্রন্থে কবিতা,গল্প,নাটক প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর অসংখ্য ফাইলবন্দী লেখা থেকে প্রথম গল্পগ্রস্থ ‘শতাব্দীর ক্ষুধা’ একুশে বইমেলা‘১৫ তে প্রকাশ হয়েছে। পরবর্তী বছর একক কাব্যগ্রন্থ 'রংধনু' প্রকাশিত হয়েছ ৷ তিনি অন্তরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ৷ তিনি শিল্প সাহিত্য ও মননের অনলাইন মাসিক'পলিমাটি'র উপদেষ্টা সম্পাদক ৷ এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। বিভিন্ন সংগঠন হতে বহু সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন ।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা