শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

ভজন সরকারের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস-‘চন্দ্রমুখী জানালা’|| পর্ব-১৩

অধ্যায় -১৩

তেরশ্রীর গণহত্যা

একদিন খুব ভোরে দক্ষিণের আকাশ লাল আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সামনের গ্রামের এক মাথা থেকে অন্য মাথা জুড়ে আগুনের শিখা। কাক ভোরেও প্রায় মাইলখানিক দূরের গ্রামের বাড়িগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গ্রামের কারো আর বুঝতে বাকী রইল না যে, হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রাম তেরশ্রীতে মিলিটারিরা আগুন দিয়েছে। তেরশ্রীর উত্তর দিকে পর পর দু’টি গ্রামে মুসলিম বসতি। তার উত্তর দিকের গ্রামটিই আমাদের। এরপর বেশ ক’টি গ্রামে হিন্দুদের বাস।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই তেরশ্রীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে জমিদার রায় চৌধুরীদের পৃষ্ঠপোষকতায়। পশ্চিম মানিকগঞ্জের জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত এ তেরশ্রীর সাথে তাই অত্র এলাকার শিক্ষিত মানুষজনের নাড়ির টান। দেশভাগ থেকে ভাষা আন্দোলন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ছয় দফা, ঊনসত্তরের গন-অভ্যুত্থান সব কিছুতেই এ এলাকার অংশগ্রহন লক্ষণীয়। এর পেছনের ইতিহাস অনেক পুরানো। তার ধারাবাহিকতায় অত্র এলাকায় গড়ে উঠেছে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বিরাট দূর্গ।

এতোদিন তেরশ্রীতে নৌপথে আক্রমনের সাহস পায়নি পাকিস্তানি মিলিটারি ও তাদের এ দেশীয় দালালেরা। বিশেষ করে করজোনা যুদ্ধে পাকিস্তানি মিলিটারির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি তাদের মনোবলকে ভেংগে দিয়েছিল। তাই জল নেমে যেতেই থানা সদর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের এ তেরশ্রীতে আক্রমন।

ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়তে না পড়তেই দক্ষিণ দিকের মুসলিম গ্রাম ছাড়িয়ে এদিকে চলে আসা শ’ শ’ নারী পুরুষ আবাল বৃদ্ধবনিতার লাইন চোখে পড়ল। সবাই যে যেভাবে ছিল সেভাবেই ঘুম থেকে উঠে পালিয়ে এসেছে। পরণের কাপড়টুকু ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসতে পারেনি। আমাদের গ্রামের বটগাছ ছাড়িয়ে কাঁচা হালটে উঠতেই ভোরের আলোতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সবাইকে।

তেরশ্রী সেনবাড়ি থেকেই এসেছে প্রথমে পালিয়ে আসা এ মানুষগুলো। বাবার সাথে সেন বাড়ির সম্পর্ক অনেকদিনের। বাবার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু কৃষ্ণ সেন। আমাদের পরিবারের অতি আপন জন কেষ্ট কাকা। স্থানীয় একটি ইস্কুলের শিক্ষক। জন্মের পরেই পোলিও-তে আক্রান্ত হয়ে কেষ্ট কাকার একটি পায়ে জোর নেই। তাই লাঠিতে ভর করেই হাঁটেন। প্রতিকূলতাকে জয় করার কথা উঠলেই বাবা সব সময় কেষ্ট কাকার উদাহরণ টানেন। এত দৃঢ় ও প্রত্যয়ী মনোবল খুব কম লোকেরই দেখেছি, যা আছে কেষ্ট কাকার মধ্যে। যাত্রা-থিয়েটার খেলাধূলা সব কিছুতেই নিজের উপস্থিতি জানান দিতেই ভালোবাসেন কেষ্ট কাকা। তাই সবকিছুতেই কেষ্ট কাকা যেন অনিবার্য।

বাবা তেরশ্রী আক্রমনের কথা শুনে প্রথমেই ভেবেছিলেন কেষ্ট কাকা ও তাঁর পরিবারের কথা। লাঠিতে ভর করে একজন মানুষকে ওই পালিয়ে আসা মানুষগুলোর মাঝে দেখতে পেয়ে বাবা আস্বস্থ হলেন যে কেষ্ট জীবন নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছে। ভোরের আলোতে বন্ধুকে স্পষ্ট দেখতে পেয়ে বাবা এগিয়ে গিয়ে কেষ্ট কাকাকে জড়িয়ে ধরলেন। কেষ্ট কাকা, কাকিমা ও তাঁর দু’সন্তান পাশে দাঁড়িয়ে অঝরে কাঁদতে লাগলেন। বাবা বন্ধুর হাত থেকে লাঠখানি নিজের হাতে নিয়ে ডান বাহুটা বাড়িয়ে দিয়ে কেষ্ট কাকাকে ধরে নিয়ে এগুতে থাকলেন বাড়ির দিকে। তখন পুবদিকে ভোরের আলোর উজ্জ্বল উপস্থিতি, দক্ষিণে আদিগন্ত আগুনের লেলিহান আভায় রাঙা।

তখনও পালিয়ে আসা মানুষের ঢল পিঁপড়ের মতো এদিকেই আসছে। গ্রামের সবাই যার যার পরিচিত মানুষজনকে নিজেদের বাড়িতে এনে আশ্রয় দিলেন। তেরশ্রী ও তার আশপাশের গ্রাম থেকে পালিয়ে আসা মানুষের এক জন-অরণ্যে পরিণত হলো আমাদের এ ছোট্র গ্রামটি।

সেদিন তেরশ্রী ও তার আশপাশের গ্রামের হত্যাযজ্ঞের খবরে সবাই শিওরে উঠলো। কিছু রাজাকার অনেকদিন থেকেই সুযোগের সন্ধানে ছিল কখন মিলিটারি এনে তেরশ্রীর জমিদার বাড়ি, কলেজের অধ্যক্ষ- অধ্যাপকদের বাসভবন ও হিন্দু পাড়ায় আক্রমন করানো যায়। মাঠ থেকে বর্ষার জল নেমে যাওয়ার সাথে সাথেই তারা এ সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে। গভীর রাতে কয়েক শ’ পাকিস্থানি মিলিটারি জেলা ও থানা সদর থেকে এসে ভিন্ন ভিন্ন দলে ভাগ হয়ে এ নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় আক্রমন করেছে।

একটি দল জমিদার সিদ্ধেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরীর বাড়ির প্রাচীরের চারদিকে অবস্থান নিয়ে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ার আগেই আক্রমন শুরু করে। বিশাল প্রাচীর ঘেরা বাড়িটির অসংখ্য ঘর ও কুঠুরির খোঁজ অত সহজ কাজ নয়। তাই প্রথমেই মালী ও দারোয়ানদের বেঁধে ফেলে জমিদার ও তাঁর পরিবার কোন দিকে বাস করেন সে তথ্য নেয় স্থানীয় কিছু রাজাকার। তারপর দোতলার একটি ঘর থেকে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের সামনে থেকেই জমিদার সিদ্ধেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরীকে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে পরিচিত এক রাজাকার। পাকিস্তানি মিলিটারি জমিদার সিদ্ধেশ্বর প্রসাদ রায় চৌধুরীকে হাত-পা বেঁধে ফেলে রাখে দক্ষিণ দিকের সিংহদরজার সামনে।

তখন চারদিকে সুনসান নীরবতা। এক বিশ্বস্ত মালী প্রতিবাদ করতেই তাকে মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা হলো। ভয়ার্ত মানুষের আহাজারিতে তখন জমিদার বাড়ির পরিবেশ ভারী। জমিদার বাড়ির দক্ষিণ দিকের চাতালের পরেই বিরাট দিঘি। দিঘির পশ্চিমাংশে তেরশ্রী বাজারের অনেকগুলো দোকান ঘর। দক্ষিণ দিকে তেরশ্রী ডিগ্রী কলেজ। পাশেই কলেজের অধ্যক্ষ ও অধ্যাপকদের কোয়ার্টার। বাজারের দোকান ঘরগুলোতে তখন আগুন দেয়া হয়েছে। কলেজ ও শিক্ষকদের কোয়ার্টারের একাংশও আগুনে পুড়ে যাচ্ছে, সেটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। থেকে থেকে আগুনের স্ফুলিংগ ও গুলির শব্দ রাতের শেষ প্রহরকে অস্থির করে তুলেছে। ভোরের পাখিরা ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে আর্তচিৎকারে।

তেরশ্রী ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতোয়ার রহমান প্রগতিশীল ও সংস্কৃতিমনা মানুষ। তাই এলাকার বাম আন্দোলনের সবকিছুতেই তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা। কলেজের শিক্ষক ও ছাত্রদেরও সক্রিয় অংশগ্রহন শেখ মুজিবের ডাকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে। ঢাকা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ৬ দফা আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই তার ঢেউ এসে পড়ে তেরশ্রীতেও।

সকাল বিকেল তেরশ্রী হাইস্কুল-কলেজ ও বাজারে ৬ দফার পক্ষে মিছিল। ৬৯ এর গনঅভ্যুত্থানেও তার ব্যতিক্রম নেই। ৭ মার্চে রেসকোর্স মাঠে শেখ মুজিবের “ যার যা আছে তাই নিয়েই প্রস্তুত থাকবা। এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” ঘোষণার সাথে সাথেই প্রত্যন্ত তেরশ্রীতেও যেন প্রস্তুতির ছোঁয়া। আর এ সব কিছুর পেছনের মানুষদের অন্যতম অধ্যক্ষ আতোয়ার রহমান এবং আরও বামঘেঁষা কিছু মানুষ।

স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনীর কাছেও সে খবর আছে। তাই তেরশ্রী আক্রমনের প্রথম প্রহরেই তেরশ্রী ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষের বাসভবনে এ আক্রমন। জমিদারের মতো অধ্যক্ষ আতোয়ার রহমানকেও মিলিটারি হাত-পা বেঁধে তাদের কাছে নিয়ে এসেছে। তারপর অধ্যক্ষের বাসভবনসহ বাজারে আগুন লাগিয়েছে।

রাজাকার ও পাকিস্তানি মিলিটারির তৃতীয় দলটি বাজারের পশ্চিম দিকে হিন্দু পাড়ায় আগুন দিয়েছে। কয়েক কিলোমিটার জুড়ে আগুনের লেলিহান শিখা, আগুনের স্ফুলিংগের সাথে ভয়ার্ত মানুষের আর্তচিৎকার, থেমে থেমে গুলির শব্দ নভেম্বর মাসের এ রাতটি যেন অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে এলাকাবাসীর কাছে।

ভোর হওয়ার আগেই পাকিস্তানি মিলিটারি চলে যাবে। ততক্ষণে জমিদার সিদ্ধ্বেশ্বরপ্রসাদ রায় চৌধুরীকে জমিদার বাড়ির ফটকের সামনে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। ধবধবে ফর্সা ছয় ফুট উচ্চতার এ দীর্ঘদেহী মানুষটি হয়ত এই প্রথম কারো কাছে এমন নতজানু হয়ে বসে আছেন।

নভেম্বর মাসের শেষদিকের এ রাতটি বেশ কুয়াশা আর হাওয়া দিচ্ছে। রাত্রির পোশাকেই ধরে আনা হয়েছে জমিদার বাবুকে। তাই বাইরের হাওয়ায় আর মৃত্যু ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছেন এ দাপুটে মানুষটি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে এ প্রত্যন্ত অঞ্চলে পড়ে রয়েছেন শুধু মানুষের কথা ভেবেই। জমিদারের খাজনা প্রথাও আর অবশিষ্ট নেই। তাই একমাত্র আয়ের উৎস বিপুল সম্পত্তি, যা পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া। সে সম্পত্তির সিংহভাগই ইস্কুল কলেজ হাট বাজার দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য দান করে দিয়েছেন। বাকী আছে কয়েক হাজার বিঘা জুড়ে অবস্থিত বিশাল জমিদার বাড়ি ও তার আশপাশের বাগান-পুকুর। সিলেটের চা বাগান থেকে যা আয় আসে, সেটা দিয়েই জমিদার বাড়ির খরচ চলে, চলে এলাকার গরীব মানুষের সাহায্য সহযোগীতাও। তেরশ্রী হাইস্কুল ও কলেজের গরীব ও ভাল ছাত্রদের শুধু বিনে বেতনে পড়াশুনা নয়, বিনে খরচে থাকা-খাওয়ারও ব্যবস্থা করে দিয়েছেন জমিদার সিদ্ধ্বেশ্বরপ্রসাদ রায় চৌধুরী।

এলাকাবাসীর কাছে তাই সিদ্ধ্বেশ্বরপ্রসাদ রায় চৌধুরী যেন সাক্ষাৎ দেবতা। সেই অজাতশত্রু মানুষটি একবারের জন্যেও ভাবতে পারেননি যে, তাঁর বাড়িতে মিলিটারি আসবে। তাঁকে স্ত্রী পুত্র কন্যার সামনে অপদস্থ করে এমনভাবে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রাত্রিতে খোলা আকাশের নিচে বসিয়ে রাখা হবে। শীতে কাঁপছিলেন জমিদার সিদ্ধ্বেশ্বরপ্রসাদ রায় চৌধুরী। এক রাজাকার দয়া করে বাড়ির ভিতর থেকে একটি কম্বল এনে তাঁর গায়ে জড়িয়ে দিয়েছে। চোখ খোলা অবস্থায় দু’হাটু ভেঙ্গে পড়ে আছেন তিনি। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দেখছেন তাঁর বাড়ির ভিতর থেকে মূল্যবান সামগ্রীগুলো স্থানীয় রাজাকারেরা নিয়ে যাচ্ছে; মন্দিরের ভিতর থেকে সোনা-দানাসহ বিগ্রহের গায়ে যা পড়ানো ছিল সব কিছুই খুলে খুলে নিচ্ছে। আগুনের আলোতে তেমন কাউকে স্পষ্ট চেনা না গেলেও এরা যে স্থানীয় রাজাকারবাহিনী সেটা তিনি বুঝলেন। জটলা পাকিয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে পাকিস্তানী মিলিটারি। কমান্ডার গোছের একজন হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে পুরো অপারেশনটার নেতৃত্ব দিচ্ছে।

কতক্ষণ এভাবে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকতে হয় ভাবতে ভাবতেই সেই পাকিস্তানী কমান্ডার কয়েকজন রাজাকার ও সিপাহি নিয়ে জমিদার সিদ্ধ্বেশ্বরপ্রসাদ রায় চৌধুরীর দিকেই এগিয়ে এলো। একটু দূরে দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে বোঝালো এক রাজাকারকে। তারপর সে রাজাকার দৌড়ে জমিদার বাড়ির ভিতর গেল। বেশ কিছু পরে আবার ফিরে এলো। হাতে টিনের একটি পাত্র। পাত্রটি নিয়ে পাকিস্তানী মিলিটারিদের কাছে এগিয়ে গেল। কিছু একটি নির্দেশনা পেয়ে জমিদার বাবুর কাছে এগিয়ে এলো আবার। জমিদার বাবুকে যেদিকে মুখ করে বসানো হয়েছিলে তার উল্টো দিকে থেকে তরল জাতীয় কিছু জমিদারের গায়ের কম্বলে ঢেলে দিল। দাহ্য পদার্থের ঝাঁঝালো গন্ধে গা গুলিয়ে উঠলো তার। জমিদার সিদ্দ্বেশ্বরপ্রসাদ রায় চৌধুরী বুঝে গেলেন, বাড়ির ভেতর থেকে কেরোসিনের টিন এনে তাঁর সারা গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে দেয়া হয়েছে।

তখনও গুলির শব্দ। আগুনের তীব্রতা কমে এসেছে। যুদ্ধ পরবর্তী এক ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতা চারিদিকে। অধ্যক্ষ আতোয়ার রহমানকে হাত-পা বাঁধা অবস্থাতেই অধ্যক্ষের বাসভবনের পাশে গুলি করে মারা হয়েছে। বাজারের দোকান ঘরে ঘুমন্ত অবস্থায় মারা গেছে কয়েকজন। জমিদার বাড়ির মালীকে গুলী করে মারা হয়েছে পালানোর সময়। হিন্দু পাড়ায় ২০-২৫ জন মারা গেছে গুলীতে ও আগুনে পুড়ে। পাশের মুসলমান পাড়া থেকে কয়েকজন সেন পাড়ায় আগুন লেগেছে ভেবে এগিয়ে এলে তাঁরাও মিলিটারির গুলীতে মারা পড়েছে। বেঁচে থাকা মানুষগুলো পালিয়েছে আশপাশের জংগলে। কেউ কেউ রাত্রের অন্ধকারে যে দিকে পারে পালিয়ে বেঁচেছে।

অপারেশন প্রায় শেষ। পুবদিকে সূর্যের আলো উঁকি দিচ্ছে। মিলিটারি এখনই চলে যাবে। ভিন্ন ভিন্ন দলে ছড়িয়ে পড়া রাজাকার ও পাকিস্তানি মিলিটারিরা সবাই জমিদার বাড়িতে এসে জড়ো হয়েছে। জমিদার সিদ্দ্বেশ্বরপ্রসাদ রায় চৌধুরী তখনও গায়ে কম্বল জড়িয়ে হাত-পা বাধা অবস্থায় বসে আছেন। কম্বল কেরোসিনে ভেজা। ছিটিয়ে দেয়া কেরোসিন তেলে জমিদারের মাথার চুল ও মুখমন্ডলও ভিজে গেছে। অপারেশন শেষে সবাইকে একত্রে পেয়ে সেই মিলিটারি কমান্ডার প্রস্তুতি নিচ্ছে চলে যেতে।

সবাই নিরাপদে ফিরে এসেছে কিনা সেটা আবারও নিশ্চিত হয়ে নিল শেষ মুহূর্তে। তারপর পাকিস্তানী মিলিটারির একজনকে ডেকে নিয়ে নির্দেশনা দিল। কমান্ডারের নির্দেশনা পেয়ে পকেটে থেকে কিছু একটা বের করে ছুঁড়ে দিল হাত-পা বাধা জমিদার সিদ্দ্বেশ্বরপ্রসাদ রায় চৌধুরীর দিকে। মুহূর্তেই আগুনের কুন্ডুলিতে পরিণত হলেন জমিদার সিদ্দ্বেশ্বরপ্রসাদ রায় চৌধুরী। যে মাটিকে ভালোবেসে তিনি কলকাতা ছেড়ে এসেছিলেন, সেই মাটির উপরেই আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলে পুড়ে ছটপট ক’রে ক’রে অবশেষে ছাই হয়ে মাটির সাথেই এক সময় মিশে গেলেন তিনি।

(চলমান)



চন্দ্রমুখী জানালা’ – মুক্তিযুদ্ধ ও নকশাল আন্দোলনের পটভূমিকায় লেখা উপন্যাস; বেরিয়েছে একুশে বইমেলা ২০২১; লেখক – ভজন সরকার; প্রকাশকঃ নন্দিতা প্রকাশ; অনলাইনেও বইটি পাওয়া যাচ্ছে।

লেখক পরিচিতি

ভজন সরকার
ভজন সরকার
ভজন সরকারের জন্ম বাংলাদেশের ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের মামাবাড়িতে । বেড়ে উঠেছেন মানিকগঞ্জ জেলার পশ্চিমের জনপদে ।বাবা-মা দু’জনেই স্কুল শিক্ষক । ভজন সরকার মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনে। তারপর ঢাকা কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়(বুয়েট) এবং কানাডার উইন্ডসর ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পুনরায় স্নাতক এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর শেষে কানাডায় স্থানীয় সরকারী সংস্থায় প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন কানাডার ওন্টারিও প্রদেশের হ্যামিল্টন শহরে। বর্তমানে সিটি অব হ্যামিল্টনের ৩০ বছরের মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত। প্রথম বই ‘বিভক্তির সাতকাহন’ ‘মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশের পরই ব্যাপকভাবে আলোড়িত এবং আলোচিত সবমহলেই। প্রধানত কবি হ’লেও লিখছেন নিবন্ধ, কলাম ও উপন্যাস বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং সাপ্তাহিক পত্রিকায়। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হ’লোঃ বিভক্তির সাতকাহন ( প্রবন্ধ)- মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী; ক্যানভাসে বেহুলার জল ( কাব্য)- নন্দিতা প্রকাশ; বাঁশে প্রবাসে ( প্রবন্ধ রম্যরচনা)- নন্দিতা প্রকাশ ; রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে বসবাস (প্রবন্ধ)- নন্দিতা প্রকাশ; চন্দ্রমুখী জানালা ( উপন্যাস) - নন্দিতা প্রকাশ ।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা