শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

ভজন সরকারের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস-‘চন্দ্রমুখী জানালা’|| পর্ব-০৮

আট

শেখ মুজিবের কলকাতায় ভাষণ

শ্রেণিশত্রু খতমের নামে কলকাতায় তখন এক ভয়ের পরিবেশ। নকশাল আন্দোলনের পুরোধা চারু মজুমদার তখনও পালিয়ে। শেষ পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সামরিক বাহিনী দিয়ে নকশাল দমনের পরিকল্পনা করলেন। একদিন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশা মেজর জেনারেল জ্যাকবকে তাঁর রুমে ডেকে পাঠালেন। আগে থেকেই মেজর জেনারেল জ্যাকব আঁচ করতে পেরেছিলেন। তার অনুমানই সত্য প্রমানিত হলো। ইন্দিরা গান্ধীর সরাসরি নির্দেশ, জ্যাকবকে পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের নকশাল দমনে কাজে লাগাতে চান।

জাতিতে ইহুদি মেজর জেনারেল জ্যাকবের পুরানাম জ্যাকব ফারজ রাফায়েল জ্যাকব। জন্ম কলকাতায়। বাবা বনেদি ব্যবসায়ী। পূর্ব পুরুষ ইরাক থেকে ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় বসতি গেড়েছেন। জন্ম কলকাতায় হলেও লেখাপড়া করেছেন দার্জিলিংয়ের কাছে কার্সিয়াং-এ। তাই পশ্চিমবঙ্গ বিশেষত উত্তরবঙ্গ সম্পর্কে তাঁর ভালোই জানাশুনা আছে। সে ভেবেই হয়ত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি গান্ধী এ গুরু দায়িত্ব মেজর জেনারেল জ্যাকবকেই দিতে ইচ্ছুক।

মেজর জেনারেল জ্যাকবের সামনে তখন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানিকশা বসে আছেন। পাশে সামরিক সচিব গোবিন্দ নারায়ণ। কিঞ্চিত ভেবে মেজর জেনারেল জ্যাকব বললেন, তিনি দায়িত্ব নিতে রাজি কিন্তু তাঁকে আরও কয়েক ডিভিশন সেনা দিতে হবে। এককথায় রাজি হলেন জেনারেল মানেকশ’।

বিশ ডিভিশন তখনই উত্তরবঙ্গে নিয়োজিত ছিল অশান্ত পূর্ব-পাকিস্তানে সামরিক অভিযানের আশঙ্কায়। সেই সাথে যোগ হলো আরও দুই ডিভিশন। উপরি আরও পঞ্চাশ প্যারা-ব্রিগেড নিয়োগ দেয়া হলো নকশাল দমনের জন্য লে, জেনারেল জেএফআর জ্যাকবের অধীনে। মেজর জেনারেল জ্যাকব তাঁর প্রধানমন্ত্রীকে নিরাশ করেননি। নকশাল দমন তো হচ্ছেই, সেই সাথে অল্প সময়ের মধ্যেই পূর্ব-সীমান্তে স্বাধীনতাকামী মুক্তিবাহিনীর সাথে মিলে এক সফল যুদ্ধ পরিচালনা করলেন। পাকিস্তানের ৯০ হাজার সুসংগঠিত বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করিয়ে এক স্বাধীন দেশের অভ্যুদয়ে সহায়তা করলেন।

এবার আরও এক বাড়তি দায়িত্ব পড়ল পূর্বাঞ্চলের কমান্ডারের হাতে। নকশাল আন্দোলনের ফলে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদে বিভক্ত এই প্রদেশে একটি প্রাদেশিক নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বও দেয়া হলো সেনাবাহিনীকে। মার্চ মাসেই একরকম বিনে ঝামেলায় শান্তিপূর্ণভাবে বিধানসভার নির্বাচন সম্পন্ন হলো। জাতীয় কংগ্রেস বিধান সভায় একাই পেল ২১৬টি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিআই জাতীয় কংগ্রেসের সাথে নির্বাচন করে পেল ৩৫টি আসন। সিপিএম-এর মাত্র ১৪টি আসন। ফলে আগের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস যার নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী একাই রাজ্য ক্ষমতায় এলো। কিন্তু নকশাল তথা চারু মজুমদারের দলের সশস্ত্র আন্দোলন তখন তুঙ্গে। প্রস্তুত ইন্দিরা গান্ধীর প্যারামিলিটারি বাহিনীও, যার পূর্বাঞ্চলের দায়িত্বে লেঃ জেনারেল জ্যাকব।

নকশাল দমনের নামে কলকাতা তখন এক নিত্য হানাহানির শহর। একদিকে পুলিশ, সাথে কংগ্রেসের গুণ্ডাবাহিনী। অন্যদিকে নকশাল আন্দোলনের মরিয়া কর্মীবাহিনী। কলকাতার পাড়া-মহল্লায় তখন বোমাগুলি আর পড়ে থাকা লাশ। কোনোদিন বোমাগুলি না হলে একজন অন্যকে বলে, দাদা কি হলো আজ? আজকে যে এখনো ধূপ-ধুনো পড়ল না?

আগে মাত্র একবার কলকাতায় এসেছিলেন বাবা। সেও অনেকদিন আগে। তাই কলকাতা নিয়ে নানা উৎসাহ উদ্দীপনা থাকলেও কলকাতা ভালো করে ঘুরে দেখা হয়নি বাবার। তাই বাল্যবন্ধুকে পেয়ে কলকাতা ঘুরে দেখার ভীষণ ইচ্ছে বাবার। বিশেষকরে বালিগঞ্জ এবং প্যারেড গ্রাউন্ড। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডেই থাকতেন স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও অন্যান্যরা। ৫৭/৫৮ নম্বরের দোতলা বাড়িটির এক কক্ষেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রথম সম্প্রচার শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই জানে, এই বেতার কেন্দ্রের গান এবং সংবাদ মুক্তিযোদ্ধাদের কিভাবে প্রেরণা যুগিয়েছে। নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে বাবা এ ভবনটি দেখবেন না, সেটি কল্পনারও অতীত। যদিও অমলের এ নিয়ে আগ্রহ নিতান্তই কম। বাবার আরেকটি উদ্যান দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। কলকাতার প্যারেড গ্রাউন্ড।

ক’মাস আগে বিশ্বের স্বাধীনতাকামী নেতা এবং জনগনের চাপে পাকিস্তান শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। কথা ছিলো লন্ডন হয়ে প্রথমে দিল্লি এবং একই দিনে কলকাতা হয়ে শেখ মুজিব ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরবেন। দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন। পরে কলকাতায় নেমে পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে ধন্যবাদ জানানো। দীর্ঘ ন’মাস এক-দেড় কোটি মানুষকে আশ্রয় দেয়া বিশাল এক ব্যাপার। তাই কলকাতায় নেমে পাশের দেশের বাঙালিদের কাছে ঋণ স্বীকার করবেন।

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লন্ডন থেকে দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করে ঢাকা ফিরেন সেদিনই। প্রাথমিকভাবে কথা ছিল দিল্লি থেকে ঢাকা আসার পথে কলকাতায় আরেকবার যাত্রা বিরতি করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাবেন বঙ্গবন্ধু। কলকাতার দমদম বিমান বন্দরসহ অন্যান্য প্রটোকলও প্রস্তত রাখাই ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আকাশপথ থেকেই বার্তা দিলেন, তিনি ঢাকাতেই ফিরবেন। ফলে ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২ এ পশ্চিমবঙ্গে আর নামা হয়নি তাঁর।

কিন্তু দেশে ফিরে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয়ভার গ্রহণ করার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বিদেশ সফর করেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি ৬ তারিখ থেকে শুরু করা ৩ দিনের সফরে বঙ্গবন্ধু ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। প্যারেড গ্রাউন্ডের সে জনসমুদ্রে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী গরদের শাড়ি পড়ে তাঁর ভাষণের অনেকখানিই বাংলায় করেছিলেন সেদিন।

আকাশবাণী ও দূরদর্শণ থেকে বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরার জনসভার ধারাবিবরণীর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মহালয়া-পাঠখ্যাত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও পঙ্কজ সাহা এই তিন জনকে। কবি, ধারাভাষ্যকার ও গনমাধ্যমব্যক্তিত্ব পঙ্কজ সাহা এক সাক্ষাৎকারের সেদিনের সে জনসভার বর্ণনায় পঙ্কজ রায় বলেছেন, “শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা উদ্ধৃতি দিলেন। তারপর জনতার সে বিশাল স্রোতের মধ্যে থেকে একটু পরপর আরো কবিতা পড়ার অনুরোধ করা হচ্ছিল শেখ মুজিবকে। শেখ মুজিব জনতার সে অনুরোধে একের পর এক রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে কিছু কিছু অংশ পাঠ করে শোনাতে লাগলেন। আমরা সবাই আশ্চর্য হয়ে শেখ মুজিবের রবীন্দ্র কবিতাপ্রীতি দেখে বিস্মিত হচ্ছিলাম। কলকাতা ব্রিগেড প্যারাড গ্রাউন্ডের সে ঐতিহাসিক জনসভা নিয়ে অনেক কিছু লেখা হয়েছে কিন্তু রবীন্দ্রভক্ত শেখ মুজিবের কথা কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।”

তাই বাবার ইচ্ছে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের সেই দোতলা বাড়ি এবং প্যারেড গ্রাউন্ড দেখা। বন্ধু অমল অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছোটবেলার বন্ধুর এ ইচ্ছেটা পূরণ করলো।

শরণার্থীদের ভিড়ে ঠাসা কলকাতা রাত নামলেই নিরব হয়ে যায়। মানুষ নকশালদের ভয়ে ঘরে ফেরে আলো থাকতেই। দোকানপাটের ঝাপি বন্ধ হয়ে যায় সূর্য ডোবার সাথে সাথেই। চিরকুমার অমল কাকুও তার বন্ধুকে নিয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই বাড়িতে ফেরেন।

এভাবে বাল্যবন্ধু অমলের সাথে আরও ক’দিন কলকাতায় থেকে বাবা এবার

তারকনগরের দিকে রওনা হলেন। নদীয়া জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম এই

তারকনগর। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি। দাদু ৬৫-এর দাঙ্গায় পুরানো

ঢাকা থেকে এক রাতে পালিয়ে এসে এখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন। শিয়ালদা

স্টেশন থেকে রাণাঘাটের ট্রেনে চাপলেন প্রথমে। শিয়ালদা-বনগাঁ ট্রেনের মতো

শিয়ালদা-রাণাঘাটের ট্রেনে অতটা ভিড় নেই। অধিকাংশই ধোপদূরস্ত ভদ্রলোকের

পোষাকের যাত্রী ট্রেনের কামরায়। কিন্তু ট্রেনের বাইরে তাকালেই চোখে পড়ে শীর্ণ

চেহারার বস্তি ঘর। সকালের রান্নার ধোঁয়া। এপ্রিল মাসের বৃষ্টি ভেজা সকালে

প্রকৃতির স্নিগ্ধতা যেন ম্লান হয় গেছে ঘিঞ্জি বস্তির কারণে। ট্রেনের ভিতর আর

বাহিরের বৈসাদৃশ্যতা সঙ্গে করেই এক সময় ট্রেন রাণাঘাট স্টেশনে থামলো।

রাণাঘাটে নেমেই বাবা টের পেলেন গেদের লোকাল ট্রেনটি ভরে যাবে পূর্ববঙ্গের শরণার্থীতে। ট্রেন স্টেশনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শরণার্থীদের গিজ গিজে ভিড়। প্রায় বছর খানিকের এ শরণার্থী সময়ে কুড়িয়ে কুড়িয়ে হলেও তো জমেছিল অনেক কিছু। তাই এক অনিশ্চয়তা থেকে আরেক অনিশ্চয়তার দিকে যাত্রার সময়ে সেই সব খুঁটে পাওয়া সঞ্চয়টুকুও কেউ ফেলে যেতে রাজি নয়।

প্রত্যেকের হাতে তাই হাঁড়ি-পাতিল ভরা চটের বস্তা। ইউনিসেফের কম্বল। কেউ কেউ মোটা দড়িতে বেধে খাঁটিয়ে থাকা তাঁবুটিও নিয়েছে। জীর্ণ-শীর্ণ পোশাক প্রায় সকলেরই। কেউ ধুতি-লুঙ্গি। অনেকেই আবার ময়লা প্যান্ট কিংবা পায়জামা। মহিলাদের শরীরেও ছেঁড়া কাপড়। জামা ও ব্লাউজহীন শরীর ফেঁটে যেন বেরিয়ে আসছে খুঁজলি-পাঁচড়ার দগদগে ঘা। সঙ্গে থাকা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের চিৎকার চেঁচামেচিতে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ রাণাঘাটের ট্রেন স্টেশনে।

প্রায় ঘণ্টাদুয়েক পর রাণাঘাট-গেদের লোকাল ট্রেনটি প্লাটফর্মে এসে থামল।

(চলমান)

লেখক পরিচিতি

ভজন সরকার
ভজন সরকার
ভজন সরকারের জন্ম বাংলাদেশের ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের মামাবাড়িতে । বেড়ে উঠেছেন মানিকগঞ্জ জেলার পশ্চিমের জনপদে ।বাবা-মা দু’জনেই স্কুল শিক্ষক । ভজন সরকার মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনে। তারপর ঢাকা কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়(বুয়েট) এবং কানাডার উইন্ডসর ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পুনরায় স্নাতক এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর শেষে কানাডায় স্থানীয় সরকারী সংস্থায় প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন কানাডার ওন্টারিও প্রদেশের হ্যামিল্টন শহরে। বর্তমানে সিটি অব হ্যামিল্টনের ৩০ বছরের মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত। প্রথম বই ‘বিভক্তির সাতকাহন’ ‘মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশের পরই ব্যাপকভাবে আলোড়িত এবং আলোচিত সবমহলেই। প্রধানত কবি হ’লেও লিখছেন নিবন্ধ, কলাম ও উপন্যাস বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং সাপ্তাহিক পত্রিকায়। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হ’লোঃ বিভক্তির সাতকাহন ( প্রবন্ধ)- মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী; ক্যানভাসে বেহুলার জল ( কাব্য)- নন্দিতা প্রকাশ; বাঁশে প্রবাসে ( প্রবন্ধ রম্যরচনা)- নন্দিতা প্রকাশ ; রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে বসবাস (প্রবন্ধ)- নন্দিতা প্রকাশ; চন্দ্রমুখী জানালা ( উপন্যাস) - নন্দিতা প্রকাশ ।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা