সাত
বাড়িতে পাকবাহিনী এলো
ত্রিশ দিনের অশৌচ পালন করা হলো বৈশ্য মতে। ছোট দাদু ছেলের মতো ভালোবাসতেন মেঝাজ্যেঠা। তাই তিনিই ছেলের মতো নিয়ম মেনে অশৌচ পালন করতে চাইলেন। পারিবারিক ব্রাহ্মণ বললেন যেহেতু বড় জোঠা মুখাগ্নি করেছেন, তাই বড় জেঠোকেই এক কাপড়ে এক মাস ছেলের ব্রত পালন করতে হবে। মেঝাজেঠার মন খারাপ। কিন্তু মন খারাপের সময় নেই এ যুদ্ধের খারাপ সময়ে। বড় জ্যাঠো আর বড় জ্যাঠিমাই ছোট দাদুর ছেলে আর ছেলে-বউয়ের নিয়মে শাস্ত্র মেনে মৃতের আত্মার সদগতির জন্য সদাকর্ম করতে লাগলেন।
বাড়ির সবার জন্য অল্প তেলে নিরামিষ রান্না হলেও মায়ের জন্য আলাদা রান্না হয় অনেকের অগোচরেই। মায়ের প্রসবের তখন আর মাস দেড়েক বাকি। তাই বড়মা অর্থাৎ সেজো জেঠিমা বাবার সাথে যুক্তি করে মায়ের জন্য আমিষের ব্যবস্থা করতে লাগলেন। কার্তিক জেলের কাছ থেকে গোপনে মাছ চলে আসতো বড়মার কাছে। দুপুরে সবাই যখন বাড়ির অন্য কাজে ব্যস্ত, বড়মা তখন পাশের বাড়ি থেকে মাছের ঝোল রেঁধে নিয়ে আসেন মায়ের জন্য।
মা একবার মৃদু আপত্তি করলে বড়মা ধমকে উঠে বললেন, “ওই মেয়ে, তুই সন্তানের মর্ম বুঝবি কি করে লো? তোর তো দুবছর পর পর বাচ্চা হচ্ছে; হতিস আমার মতো বাঝা তখন বুঝতিস? বিশ বছরে এই পেটে একটা সন্তানও ধরতে পারিনি। আমি বুঝি সন্তান পেটে ধরা কী জিনিস। যে গেছে তার জন্য শোক না করে, যে আসবে তার জন্য ব্যবস্থা কর।”
বাবার বয়স যখন পাঁচ বছর তখন বড়মা সংসারে আসেন। বড়মারই বা কত বয়স তখন? বড় জোর বারো তেরো হবে। তারপর থেকে নিঃসন্তান বড়মা সন্তান হিসেবে মানুষ করেছেন বাবাকে। বিয়ের পর এ সংসারে এলে বড়মাই মাকে আগলে রেখেছে কখনও বড় দিদি, কখনও বা মায়ের মমতায়। মায়ের প্রথম সন্ত ান হওয়ার মাস দুয়েকের মধ্যেই মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা, দুমাসের সে শিশু সন্তানকে নিয়ে মহকুমা শহরে গিয়ে পরীক্ষা দেয়া সেও তো সম্ভব ছিল বড়মার জন্যই। তার বছর দেড়েকের মধ্যেই আরেক কন্যা সন্তান। কিন্তু বড়মাই মায়ের লেখাপড়ায় বন্ধ করতে দেননি। বাড়িতে পড়েই মা তখন ইন্টারমিডিয়েটে প্রথম শ্রেণি পান প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে। সব কিছুরই পেছনে বড়মা। বাবাও বড়মার কথার বাইরে কিছুই করেন না। তাছাড়া সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অনেক রাতে বাড়ি ফেরার অভ্যেস বাবার। এখন তো স্কুলে যাওয়ার কথা বলে সারাদিন
মুক্তিবাহিনীতে রিক্রুট করা নিয়েই সারা এলাকা ঘুরে বেড়ান। বড়মার ভয় সেখানেই। বারবার বাবাকে বলছেন, “শোন তুই ইন্ডিয়া চলে যা। তোর শ্বশুর বাড়িতে কিছুদিন থেকে আয়। ছোট বউয়ের দায়িত্ব আমি নেব।
বাবা জানেন বড়মাকে কোনো কথায় বশে আনা যাবে। বাবা বলেন, “ঠিক আছে বৌদি, তুমি যখন বলছো ইন্ডিয়াতেই যাই। কিন্তু ছেলে আর স্ত্রীকেও নিয়ে যাবো সঙ্গে। ওদের রেখে আমি যেতে পারবো না।”
বড়মা এবার পিছু হটেন। ছেলেকে অর্থাৎ আমাকে সারাক্ষণ বুকে-পিঠে করে রাখেন বড়মা। চোখের দূরে আমাকে নিয়ে যাবে শুনে বড়মা আঁতকে ওঠেন। কথা ঘুরিয়ে বলেন, “বালাই ষাট! আমাদের এ বিল এলাকায় মিলিটারি আসবে কোন সাহসে? শুনেছি ওই খান-সেনারা নাকি সাঁতারই জানে না? ওদের জীবনের মায়া আছে না?”
কিন্তু তার এক সপ্তাহ পরেই বড়মার কথা মিথ্যে প্রমাণিত হলো। সকাল গড়িয়ে সবেমাত্র দুপুর। বাবার সেদিন বেরোতে একটু দেরি হয়েছে। উত্তর দিকের বাঁশের ঝাড়ের কাছে রান্না ঘর আমাদের। বাবাসহ কয়েকজন রান্না ঘরের বারান্দায় কাঠের পিড়ি পেতে দুপুরের ভাত খাচ্ছেন। হঠাৎ করে কেউ একজন চিৎকার করে উঠলো, নিমাই বিলের মাঝ দিয়ে দৌলতপুর থানা থেকে দুই নৌকা মিলিটারি নাকি পূর্বদিকে অর্থাৎ আমাদের গ্রামের দিকে আসছে।
কোথায় রইল ভাতের থালা? কোথায় খাবার-দাবার? সবাই যে যার মতো বাবাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলো। সবাই জানে গ্রামে মিলিটারি আসলে এ বাড়িতেই আসবে এবং টার্গেট বাবা। কয়েকদিন আগেই কালু রাজাকারের সাথে বাবার কথা কাটাকাটি হয়েছে। বাবা নির্বিকার রইলেন। আস্তে করে হাতটা ধুয়ে বললেন,”কেউ চিৎকার-চেঁচামেচি করবে না। আমি আগে দেখি আসলেই মিলিটারির নৌকা কি না?”
বাবা ভিতর বাড়ি থেকে বাইরের উঠোনে এলেন। তারপর দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের কড়ুই গাছের নিচে ধানের খড়ের পালার আড়াল থেকে দেখলেন, দুটো বড় বড় ছইওয়ালা নৌকা গ্রামের পশ্চিম-দক্ষিণ দিকের বটগাছের পাশ দিয়ে দেখা যাচ্ছে। নৌকার সাইজ ও ছইয়ের ওপর মানুষজনের নড়াচড়া দেখে বুঝলেন এগুলো পাকিস্তানি মিলিটারির নৌকা।
বাবা বড়মাকে বললেন, “বৌদি তুমি ছেলে আর ছোট বউকে নিয়ে বহেরাতলির মুসলিম পাড়ায় চলে যাও। আর বাড়ির মেয়ে আর অন্য বউদেরকেও পারলে অন্য কোথাও পালাতে বলো। মনে হয় রাজাকারের পাকিস্তানি মিলিটারি নিয়েই আসছে এদিকে। “
বড়মা বললেন, “তুই কী করবি? তোরই তো আগে পালানো উচিত। তুইও চল আমাদের সাথে।”
বাবা বললেন, “আমি তো আর একা মিলিটারির সাথে লড়তে পারবো না। তাছাড়া এ বাড়িতে আমরা যত লোকজন অস্ত্র ছাড়া হয়তো কেউ ঢুকতে পারবে না। কিন্তু লাঠি নিয়ে তো আর অস্ত্রের সাথে যুদ্ধ করা যাবে না। তাছাড়া বর্ষার দিন, পালানোর জায়গাও নেই। তাক করে করে গুলি করবে ওরা। তাই আমাকেও পালাতে হবে। তবে তুমি আগে যাও ছোট বউকে আর ছেলেকে নিয়ে।”
বাবা অন্য সবার মতো মাকে ছোট বউ বলতেন সবার সামনে। মাকে ডেকে বললেন, “পূর্বদিকের ঘাটে ছোট ডিঙি নৌকাটা আছে। তুমি ছেলেকে নিয়ে তাড়াতাড়ি মুসলিম পাড়াও যাও। বৌদি আর ভাস্তেদের কাউকে সাথে নিও নৌকা তো চালাতে হবে। দেরি করো না, তাড়াতাড়ি কর।”
মা কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। বাবার ধমকে মায়ের সে কথাটা আর স্পষ্ট করে বলা হলো না। বড়মা আমাকে কোলে নিয়ে মায়ের হাত ধরে পুবদিকের নৌকা ঘাটের দিকে দৌড় দিলেন।
নৌকায় ওঠার পর মায়ের মনে হলো মেয়েকে তো আনা হয়নি? আমার দুবছরের বোন হয়তো কোনো জ্যেঠাতো বোনের কোলে ছিল। ওকে নিয়েই হয়তো জ্যেঠাতো বোনটি আমাদের বিরাট বাড়ির কোনো ঝোপজঙ্গলে কিংবা ঘরের মধ্যে পালিয়েছে। মা তাঁর দুবছরের মেয়েকে রেখে পালাতে হচ্ছে বলে কেঁদে উঠলেন।
ছোট ডিঙি নৌকায় তখন আমি, মা, বড়মা আর নয়-দশ বছরের আরেক জ্যেঠাতো ভাই বীরেণ। কে নৌকা চালাবে? নৌকা সোজা করেই বা রাখবে কে? এত সব কিছুই মনে না করে বাবা তখন ঘাট থেকে নৌকা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়ে নিজে বাড়ির ভিতরে চলে গেলেন। আমি বড়মাকে জোরে জড়িয়ে ধরে, বাবা, বাবা বলে কেঁদে উঠলাম। বড়মা আমার মুখে হাত চাপা দিয়ে নৌকার মাঝখানের গুঁড়ার কাঠের মধ্যে জোর করে বসিয়ে দিল। বড়মা বীরেণকে একটা বৈঠা দিয়ে বললো, “বাবা, তুই পেছনের গলুইয়ে গিয়ে নাও সোজা করে রাখতে পারবি না?” নয়-দশ বছরের বীরেণ তখনই বৈঠা চালাতে শিখে গেছে। বীরেণতা ড়াতাড়ি পেছনের গলুইয়ে গিয়ে বৈঠা নামালো। বড়মা আরেকটা বৈঠা নিয়ে সামনের গলুইয়ে গিয়ে সামনের দিকে বৈঠা দিয়ে জল কাটতে শুরু করে দিলেন। মা আমার পাশে বসে অসহায়ের মতো বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন
আমাদের বাড়িটি গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে। তার পাশ দিয়েই একটি ছোট খাল গিয়ে মিশেছে নিমাই বিলে। খাল দিয়ে সিকি মাইলের মতো গেলেই আরেকটি মুসলিম পাড়া। জুগিন্দা। খালের গা-লাগোয়াই রহিমুদ্দিন খলিফার বাড়ি। রহিমুদ্দিন চাচার কাছে লুংগি সেলাই থেকে শুরু করে ছোট খাটো জামা কাপড় বানায় সবাই। আমাদের বাবা-জেঠাদের সাথেও রহিমুদ্দিন চাচা ও চাচির ভালো সম্পর্ক। সে কথা চিন্তা করেই বড়মা বীরেণকে বললেন, “নৌকা খলিফা বাড়ির দিকে ধরে রাখ। “
খালের জলে তখন তেমন স্রোত নেই। কিছু কচুরিপানার থোকথোক স্বাক নৌকাকে মাঝে মাঝে থামিয়ে দিচ্ছে। বড়মা তার অনভ্যস্ত হাতে যত জোবে পারেন নৌকা সামনের দিকে চালাচ্ছেন। পেছন থেকে বীরেণ বারবার বলে উঠছে, “জেঠি আর পারি না তো?”
“আর একটু সোজা করে রাখ বাবা। এই তো একটু গেলেই খলিফা বাড়ি।
“বীরেণ তার ছোট্ট হাতের দক্ষতায় বৈঠা দিয়ে জল কেটে কেটে বড়মাকে সাহায্য করছে। মা এক হাতে আমাকে, অন্য হাতে তলপেট শক্ত করে ধরে আছেন।
নৌকা রহিমুদ্দিন খলিফার বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তখন। হঠাৎ দেখা গেল রহিমুদ্দিন চাচার ছেলে বাঁশের বড় একটা লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘাটে নৌকা ভিড়ানোর আগেই জোরে জোরে বলছে, “মালাউনের কোনো জায়গা নেই আমাদের বাড়িতে। যা অন্য বাড়িতে যা।”
বড়মা বলছে, “দিলু তোরা এই বিপদের দিনে এমন করছিস কেন? আমাদের একটু আশ্রয় দে, মিলিটারি গেলেই তো আমরা চলে যাবো। ও বুজি, তুমি দিলুরে একটু থামাও না।”
বুজি অর্থাৎ রহিমুদ্দিন খলিফার বউ বড়মার কথা না শোনার ভাগ করে অন্য দিকে সরে গেল। দিলু জলের আরো কাছাকাছি নেমে এসে লাঠি দিয়ে জলে আঘাত করতে লাগলো। একেবারে ঘাটের কাছাকাছি নৌকা চলে এসেছে দেখে দিলু আরো চিৎকার করে বলতে লাগলো, “নাও ঘাটে ভিড়ালে কিন্তু লাঠি দিয়ে মাথায় মারবো, মালাউনের বাচ্চারা।”
বীরেণ দিলুর লাঠি দেখে ভয় পেয়ে হাতের বৈঠা ছেড়ে দিয়ে উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগলো। মা পেটে হাত দিয়ে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো। বড়মাকে বললো, “দিদি চল বাড়ির দিকে যাই। আমি আর পারছি না।”
বীরেণের হাতে আর নৌকার হাল নেই। বড়মার শত কাকুতি মিনতিতেও দিলুদের মন একটুও নরম হলো না। রহিমুদ্দিন চাচা কিংবা তার স্ত্রীকেও আর বাড়িতে দেখা গেল না। কিছুতেই নৌকা রহিমুদ্দিন খলিফার ঘাটে ভিড়ানো গেল না। নৌকা তখন খাল পেরিয়ে প্রায় নিমাই বিলের মুখে চলে এসেছে। মায়ের চিৎকারে আমি আর বীরেণ হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগলাম। বড়মা আবার শক্তহাতে সবকিছু সামলানোর চেষ্টা করলেন। বীরেণকে আবার বললেন, “বাবা, আর একটু সময় নৌকাটা সোজা করে রাখ। মাত্র একটু তো বিল। পাড়ি দিলেই বহেরাতলী। নুরুদের বাড়ি ওই দেখা যাচ্ছে। ধর একটু বাবা। “
বীরেণ আবার নৌকায় তুলে রাখা বৈঠা জলে নামালো। বড়মা সামনে দিকে নৌকা চালাতে লাগলেন। আধামাইলের মতো নিমাই বিল তখন যেন এক মহাসমুদ্র। এদিক দিয়েই তো মিলিটারির নৌকা আসবে। তাই যত তাড়াতাড়ি বিলের ওদিকে ধান খেতের কাছে পৌঁছতেই হবে।
অনেক কষ্টে নিমাই বিল পাড়ি দিয়ে ওপারে যেতেই দেখা গেল বহেরাতলী থেকে কয়েকজন একটা নৌকা নিয়ে এদিকে আসছে। বড়মা একটু সাহসে বুক বাঁধলেন। কিছুক্ষণ পরে নৌকাটা কাছে আসতে দেখা গেল নুরু আর আরশাদ কয়েকজনকে নিয়ে এগিয়ে আসছে। নুরু আরেকজনকে নিয়ে আমাদের নৌকায় এসে সজোরে বৈঠা চালিয়ে বহেরাতলীর তমিজদের বাড়িতে নৌকা ভিড়ালো । বড়মা মাকে হাতে ধরে নৌকা থেকে নামাতেই বড়মার গলা ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন মা। ততক্ষণে তমিজের বউ মাকে ধরে বাড়ির উঠোনে বসিয়েছে। তমিজদের নৌকা ঘাটের ফাঁক দিয়ে দেখা গেল পাকিস্তানি মিলিটারির নৌকা আমাদের বাড়ির ঘাটে ভিড়ে গেছে।


