কলকাতার রিফিউজি
কলোনিতে বাবা কলকাতায় গেলেন স্বাধীনতার কয়েক মাস পরে। তখন সবে মাত্র ভারতীয় কামোন মার্চ মাসের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ক্ষমতারা এসেছে। জাতীয় কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্বস্ত এবং কেন্দ্রের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তেমন সিদ্ধহস্ত সেটা নয়। কিন্তু ভারতীয় কংগ্রেস বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধী চাইছিলেন তাঁর আস্থাভাজন কেউ রাজ্যের সংকট মোকাবেলা করুক। রাজনৈতিক সমাধানের চেয়ে প্রশাসনিক সমাধানের দিকেই প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জোর দিচ্ছিলেন বেশি। বিশেষত নকশাল আন্দোলন দমনের ক্ষেত্রে তো অবশ্যই ৷
১৯৬৭ সালের নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাতে ব্যর্থ হলো। যদিও অজয় মুখার্জীর নেতৃত্বে বাংলা কংগ্রেসও সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলে না। বামপন্থীদের সাথে কোয়ালেশন গঠন করলো বাংলা কংগ্রেস। অজয় মুখার্জী হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।
বামপন্থীদের মধ্যেও দেখা দিলো প্রচণ্ড মতানৈক্য। কেউ কেউ যুক্তি দেখালেন, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা মানেই সারা ভারতের ক্ষমতা নয়। কারো যুক্তি যেহেতু বামপন্থীদের সংগঠন পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও ত্রিপুরা, অন্ধপ্রদেশ, কেরালা, উড়িষ্যাসহ অন্যান্য রাজ্যে শক্তিশালী হচ্ছে তাই পশ্চিমবঙ্গের এ সাফল্যকে নাটো করে দেখা ঠিক হবে না। তাছাড়া সারা ভারতেই জাতীয় কংগ্রেস বুর্জোয়ানীতির কারণে খেটে খাওয়া কৃষক-শ্রমিকের জন্য তেমন কিছু করতে পারছে না। জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বেও সংকট চলছে। লাল নেহেরু ও লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু পরবর্তীসময়ে নেহেরুকন্যা ইন্দিরা গাছী এখনও পরিপক্ক রাজনীতিবিদ হয়ে উঠতে পারেননি। তাই এ সুযোগ বামপন্থীদের হাতছাড়া করা উচিত হবে না।
এ যুক্তিতে বামপন্থীরা বাংলা কংগ্রেসের কাছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাইলো। যদিও ভারতীয় সাংবিধানিক কাঠামোয় কিছু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ণ ছাড়া কাছে তেমন কোনো ক্ষমতাও নেই। তবু বাংলা কংগ্রেস “স্পর্শকাতর এ মন্ত্রণালয় দিতে রাজি হলো না। পরিবর্তীতে উপ-মুখ্যমন্ত্রী নামে একটি নতুন পদবি করে বামদলগুলোর মোর্চাকে দেওয়া হলো। পরিকল্পনাবিহীনভাবে ক্ষমতার এ রকম লোভ ধামনলগুলোর একটি অংশ কিছুতেই মেনে নিতে পারলো না, বিশেষত মার্ক্সবাদী কমিউনিস্টদের একটি অংশ। কৃষক শ্রমিক এবং ভূমিহীন মানুষের পাশে থাকারই সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা রাজ্যক্ষমতার বাইরে থাকার সিদ্ধান্ত নিলো। সে সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে কৃষকদের সংগঠিত করতে সভাসমিতির কাজ জোরদার করতে লাগলো ।
এ অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি মহকুমার একটি থানা নকশালবাড়িতে ঘটে গেল প্রথম বিদ্রোহ। বেনামী জায়গা ভূমিহীন কৃষকের দখলে নিতে কৃষকেরা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। স্থানীয় জোতদার এবং পুলিশও মরিয়া হয়ে শুরু করলো বন্দুক হাতে প্রতিরোধ। নিহত আহত মানুষের সংখ্যাও বেড়ে যেতে লাগলো। সেই সাথে বেদখল হতে লাগলো জোতদারের দখল করে রাখা ভূমি। ১৯৬৭ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া এ বিস্ফোরণ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো। যেহেতু নকশালবাড়ি থেকেই এর সূত্রপাত, তাই সারা দেশে এ বিস্ফোরণ নকশাল আন্দোলন নামেই প্রচার পেলো।
১৯৬৭ সালে জাতীয় কংগ্রেস নির্বাচনে হেরে গিয়ে প্রথম ধাক্কা পেলো। যদিও দেশবিভাগের পথ থেকে পশ্চিমবঙ্গে তাদেরই একচ্ছত্র আধিপত্য। কিন্তু ‘৬৭ সালেই প্রথম বোঝা গেল জাতীয় কংগ্রেসের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বিশেষত দেশবিভাগের ফলে পূর্ববঙ্গের উদবাস্ত্র বাঙালিদের মোহভঙ্গ ঘটে গেছে।
কিন্তু পাকিস্তানকে ভেঙে দুটুকরো করে দিতে সহায়তা এবং দুকোটি শরণার্থীদের সমস্যার সমাধানের আশায় আবারও কংগ্রেসকে ভোট নিলেন তারা। ফলে যে বামপন্থী কমিউনিস্ট বিশেষত সিপিআই এবং সিপিআইএম আস্তে আস্তে উদ্বাস্ত অধ্যুষিত শহর ও শহরতলীতে নিজেদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল, সেখানেও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস জয়যুক্ত হলো সে বারের নির্বাচনে।
অথচ ‘৪৭-এর দেশবিভাগের ফলে পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তুদের কংগ্রেসের প্রতি আনুগত্য থাকাই স্বাভাবিক ছিল। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ৬০ দশকের শেষ অব্ধি সে আনুগত্য অটুটও ছিল যথারীতি। কিন্তু ৫০ থেকে ৬০ এর দশকে ক্রমান্বয়ে পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলো। এ উদ্বাস্তুদের একশো শতাংশ আবার হিন্দু। পূর্ব পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং বাঙালিদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানিদের চরম বৈষম্য উদ্বাস্তুদের সংখ্যা বাড়িয়েই দিল দিনের পর দিন। ফলে পূর্ববঙ্গে কংগ্রেসকে সমর্থন করলেও পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু হয়ে এসে অনেকেই দেখলেন কংগ্রেসের আচরণ তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। এ সুযোগই খুঁজছিল একদা অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি এবং পরবর্তীতে সিপিআইএম এবং প্রধানত সিপিআই।
মূলত কংগ্রেসের প্রতি মোহভঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু কলোনিগুলিতে গঠিত হলো ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রিফিউজি কলোনিজ বা ইউসিআরসি। ইউসিআরসি-র সাথে সংযুক্তদের অনেকেই পূর্ববঙ্গ থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত এবং রাজনৈতিকভাবেও সচেতন। অথচ উদ্বাস্তু হওয়ার ফলে তাদেরকে শ্রমিকশ্রেণির মতো মানবেতর পেশা ও জীবন যাপন করতে হচ্ছে। ফলে এতদিন শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে শক্ত অবস্থান গড়তে ব্যর্থ কমিউনিস্টরা উদ্বাস্তুদের মধ্যে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে শুরু করে দিল।
৬৭’র নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস এ উদ্বাস্তু কলোনিগুলোতে ভালো ফলাফল করতে পারলো না। অজয় মুখার্জীর নেতৃত্বে বাংলা কংগ্রেস ও কমিউনিস্টদের যুক্তফ্রন্ট স্বল্প সংখ্যক মেজরিটি নিয়ে সরকার গঠন করলো।
অথচ ১৯৭২-এর নির্বাচনে ঘটলো তার বিপরীত। আবার জাতীয় কংগ্রেস ক্ষমতায় এলো মূলত: প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে সদ্য জন্ম নেয়া বাংলাদেশকে সহায়তা দান, দুকোটি শরণার্থী সমস্যার সমাধান এবং নকশাল আন্দোলনের প্রতি জনবিমুখতার কারণেই। যদিও সাংগঠনিকভাবে পশ্চিমবঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্যের সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ তো বটেই, পশ্চিমবঙ্গের অবস্থাও তখন খুব সঙীন। এ অবস্থাতেই উন্মুক্ত সীমান্ত দিয়ে বাবা কলকাতা এলেন। প্রথমে এসে উঠলেন কলকাতার উপকণ্ঠ দমদম বারাসাত এলাকার একটু ভদ্রোচিত উদ্বাস্তু কলোনিতে। বাবার বাল্যবন্ধু / অমল মণ্ডল আগে থেকেই বাস করছিলেন সেখানে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স পাস অমল কাকু ৬০-এর দশকের প্রথম দিকে ভাগ্যের সুপ্রসন্নতায় একটি কেরাণির চাকরি জুটিয়ে নিয়েছিলেন। দমদমের একটা উদ্বাস্তু কলোনির ঘরে বাস করছিলেন একা একা বেশ স্বচ্ছলভাবেই। সেই সাথে যুক্ত হয়েছিলেন সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিকভাবেও কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে।
কিন্তু অমল কাকুর সবকিছু এলোমেলো করে দিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। উদ্বাস্তু কলোনির এক কামরার ঘরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হে পড়লো মা সহ দুই ভাই ও তাদের পরিবার।
বাবা যখন তাঁর বাল্যবন্ধু অমলের বাসায় ‘৭২-এর এপ্রিল মাসে বেড়াতে এলেন, তখনও অমল কাকুর দুই ভাই সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেননি। যদিও বাংলাদেশের বয়স তখন ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। ফেলে আসা ঘরবাড়ি- জমাজমি ব্যবসা-বাণিজ্য ফিরে পাবার এক অজানা আশঙ্কায় অনেক শরণার্থীর মতো তারা তখনও রয়ে গেছেন পশ্চিমবঙ্গে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডে যোগাযোগের অব্যবস্থা তো ছিলই, সেই সাথে ছিল সমন্বয়হীন প্রশাসনিক উদ্যোগ। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের ছিল না শরণার্থীদের ফিরিয়ে এনে পূনর্বাসনের যথোপযুক্ত পরিকল্পনা ও ইচ্ছে। শরণার্থীদের অনেকেই নিজ উদ্যোগে ফিরে এসে প্রশাসনিক তেমন কোনো সাহায্য সহায়তা পায়নি। অনেকেই ফিরে পায়নি যুদ্ধের সময় ফেলে যাওয়া সম্পদ-সম্পত্তিটুকুও। স্থানীয়
রাজনৈতিক টাউটদের খপ্পরে পড়ে অনেকেই আবার আংশিক সম্পত্তি ফিরে পেয়েছেন; বাকি অর্ধেক চলে গেছে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। যুদ্ধের নয় মাসের অধিকাংশ সময়েই অনেকে নিশ্চুপ ছিল। অনেকে আবার ভারতে পালিয়ে যাওয়া হিন্দুদের বাড়িঘর ও জমিজমা নিজেদের দখলে রেখেছিল এ ভরসায় যে, তারা আর কখনও ফিরে আসবে না এদেশে।
বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে আবার হিন্দু বাড়ি দখল করে প্রথমেই একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। যদিও মানিকগঞ্জে তেমনটি করা সম্ভব ছিল না। কারণ, ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থানের জন্য মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর কাছে স্ট্যাটেজিক ভাবেই এ অঞ্চলটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকারদের তেমন আনাগোনা দেখা যায়নি। এর ফলে দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া হিন্দুদের বাড়িঘর-ব্যবসায় বাণিজ্য অক্ষতই ছিল এ এলাকাতে।
এ রকম নানামুখী সংবাদে বিভ্রান্ত হয়ে অমল কাকুর ভাইয়েরা বাংলাদেশে ফিরে আসতে ভরসা পাচ্ছিলেন না তখনও। বাবার কাছে বিস্তারিত শুনে দুদিন পরেই দুই ভাইকে পরিবারসহ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিলেন অমল কাকু। অনেকদিন পরে যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা গেল।
কলকাতা তখন এক ভয়ের শহর। সদ্য ক্ষমতায় বসা জাতীয় কংগ্রেসের প্রাদেশিক নেতা ও কর্মীরা প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙুলি প্রদর্শন করে নকশাল খতমে নেমেছে। অলিতে গলিতে পড়ে থাকছে লাশ। শ্রেণিশত্রু শতমের রাজনীতিওয়ালাদের থেতলানো লাশের ওপর দিয়ে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে ইন্দিরা কংগ্রেসের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অভিযান তখন চলছে পুরোদমে। এক সময়ের উদ্বান্ত আক্রান্ত কলকাতা তখন এক লাশের শহর। অমল কাকু তার ভাইদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়ে ছোটবেলার বন্ধুকে নিয়ে ত্রাসের শহর কলকাতা ঘুরে দেখাতে বের হলেন সেদিনই।
(পর্ব- ০৩ পড়ার জন্য সেপ্টেম্বর সংখ্যায় চোখ রাখুন)


