রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

রুবেল কান্তি নাথের রহস্য গল্প

দেবী
চারপাশে ধানখেত। মাঝখানে মেঠো একটা পথ। গ্রামে ঢোকার একমাত্র পথ সেটাই। গ্রামে সর্বোচ্চ দশটা বাজলেই মানুষজন বউ-পোলাপান নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সেখানে শঙ্কর বাড়ি ফিরছে প্রায় রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। বড় বাজারে একটা চালের গুদামে কাজ করে সে। তাদের এলাকাটা হিন্দু অধ্যুষিত। বেশিরভাগই গৃহস্থ পরিবার। খুব কম পরিবার আছে যাঁরা আর্থিকভাবে দুর্বল।
তবে শঙ্করদের অবস্থা তার বিপরীত। কেননা ওরা হল নিচু জাতের লোক। ওদের বেশিরভাগ পরিবারেই অর্থনৈতিক টানাপোড়েন লেগে আছে। এই পরিবারগুলোর হর্তাকর্তাদের বেশিরভাগই জুতা সেলাই, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার ও মুঠে-মজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে।
বেঁচে থাকার তাগিদে সামান্য কিছু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ধনী হিন্দু গৃহস্থের জমিতে কামলা খাটেন কেউ কেউ। কেউ ফসল লাগান। তোলেন ফসল। মাড়াই করেন। করেন তাদের বিশাল বিশাল বাগান দেখাশোনা। কেউ-বা কাজ করেন বাজারের আড়তে। অল্প কিছু টাকার জন্য বিভিন্ন ফাই-ফরমাশ খাটেন। মোটকথা, ওদের চেয়ে ধনী গৃহস্থ হিন্দুদের অর্থনৈতিক অবস্থান অনেক উঁচুতে।
শঙ্করও ওরকমই একটি হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। বেশিদিন হয়নি ওর মা মারা গেছে। সে যখন বেঁচে ছিল, তখন ওকে সারাক্ষণ ছায়ার মতো আগলে রাখত। বাবা বাজারে জুতা সেলাইয়ের কাজ করে। আর সেই পরিশ্রমের টাকা উড়িয়ে দেয় নেশাপানি করে। এই ব্যাপারটা নিয়ে মা-বাপের অনেক ঝগড়া হতে দেখেছে শঙ্কর।
বাবাকে এই খারাপ পথ থেকে ফেরাতে গিয়ে মাকে মাঝেমধ্যে বাবার অকথ্য নির্যাতনও সহ্য করতে হয়েছে। সেই মমতাময়ী মা-টা শেষ পর্যন্ত কয়েকদিনের মরন জ্বরে ভুগে শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেই মুক্তি পেয়েছে। মায়ের কথা মনে পড়লে ওর খুব কান্না পায়। খুউব। বাবাও তার কৃতকর্মের শাস্তি ইতোমধ্যে পেয়ে গেছে। মায়ের মৃত্যুর কিছুদিন পর বাজারের মাঝখানে অবস্থিত বড় রাস্তাটায় অ্যাকসিডেন্ট করে ঘরে পড়ে আছে এখন পঙ্গু হয়ে।
শঙ্করকেই এখন দু’জনের খাওয়ার জোগাড়যন্তর করতে হয়। বাবা তো শাস্তি পেয়েই গেছে। তাকে আর কী করতে পারে শঙ্কর। যা করার বিধাতাই তো করে ফেলেছেন। নিজের জন্মদাতাকে তো আর ঘর থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে না! তাই বাবার ভরনপোষণের দায়িত্বটা ও নিজের ছোট্ট কাঁধে তুলে নিয়েছে।
ওর বয়স খুব বেশি হয়নি। ওকে পরিপূর্ণ একজন কিশোরই বলা চলে। নিয়তির পরিহাসে এই বয়সেই সে বাজারের এক কোণে বসে বাবার মতোই হাটুরেদের জুতো সেলাই করে। মুচির সন্তান মুচি, এটাই এখন ওর একমাত্র পরিচয়।
প্রায় প্রতিদিনই হাটে গিয়ে বসে থাকতে হয় ওকে। না গেলে তো খাবার জুটবে না বাপ-পুতের। রাত বাড়ার সাথে সাথে হাটের মানুষজন কমে যেতে শুরু করলে, শঙ্কর তার কামাইয়ের হিসাব মেলায়। তারপর উপার্জিত অর্থে কেনে চাল-ডাল, তেল-নুন ইত্যাদি।
এসব সওদাপাতি কেনাকাটা শেষ করে বাড়ি ফেরে সে। বাড়িতে এসে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে রান্না করতে বসে। বাবাও অবশ্য যথাসাধ্য সহযোগিতা করে ওকে। বর্তমানে বাপ-ছেলের মধ্যে খুব ভালো একটা সম্পর্ক তৈরী হয়ে গেছে। যেটা মা বেঁচে থাকার সময় ছিল না।
বাবা বসে বসে তাড়াতাড়ি ছেলেটা যেন নিরাপদে বাড়ি ফিরে আসে, তার জন্য ভগবানের কাছে দু’হাত তুলে প্রার্থনা করে। যেদিন শঙ্কর দ্রুত বাড়ি ফিরে আসে, সেদিন ওর বাপের আনন্দ আর ধরে না। বাচ্চাদের মতো আচরণ করতে থাকে সে।
সে জানে, শঙ্কর ছোটবেলা থেকেই একা একা খুব ভয় পায়। কোথাও কখনো একা যেত না। সবসময় ওর মা ছায়া হয়ে থাকত ছেলেটার পাশে। রাতে তো ছেলেটা প্রস্রাব পায়খানা করার জন্য ঘরের বাইরে যেতেই ভয় পেত। ওর মা-ই হাত ধরে নিয়ে যেত ওকে। আজ সেই ছেলেটা অনেক রাত করে ঘরে ফেরে। একা একা।
ধানখেতের মাঝখানের মেঠোপথটা দিয়ে আসার সময়ই ওর কেন যেন ভয় লাগতে শুরু করল। অন্য কোনো সময় এরকম অনুভূতি হয়নি ওর। মনে হচ্ছে, কেউ যেন ওর দিকে দূর থেকে নজর রাখছে। একটা ভয়ানক অস্বস্তি লাগছে ওর। মন্ত্র-টন্ত্র যা জানে, তা মনে মনে আওড়িয়ে বুকে থুতু দেয়। তবু ভয়টা দূর হচ্ছে না কিছুতেই।
ধানখেত শেষ হলে উঁচু একটা টিলার মতো জায়গায় রয়েছে বেশ পুরনো একটা কালীবাড়ি। এই কালীবাড়ির সামনে খোলা জায়গাটায় কত বার যে শঙ্কর ওর বন্ধু-বান্ধবদের সাথে আড্ডা দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। যেহেতু গ্রামে ধনী হিন্দু গৃহস্থ পরিবার বেশি। সেহেতু বেশিরভাগ ধনী পরিবারের বন্ধুদের সাথে ছিল ওর চলাফেরা। বন্ধুত্ব। খেলাধুলা। হাসি-ঠাট্টা।
এখন ওরা একেকজন দেশের একেক জায়গায়। কেউবা দেশের বাইরে। ওদের বাপেদের যে বিস্তর টাকা। তাই ওদের বাপেরা সন্তানদের ভালোভাবে পড়াশোনা করানোর জন্য ভালো ভালো স্কুল-কলেজে পাঠিয়ে দিয়েছে। বন্ধুদের কথা মনে উঠলে ওর খারাপ লাগে। কিন্তু বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই ওর। তাই খারাপ লাগাটাকে জোর করে হজম করে নিতে হয়।
বন্ধুদের সাথে থাকতে থাকতে ওদের কিছু আচার-আচরণও রপ্ত করে ফেলেছে সে। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে সবার সাথে যোগদান করত। মজা করত পূজাতে সবাই মিলে। বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে পিঠা-পুলি খেত। ছেলের, ভাইয়ের মতোই সমান আদর পেত বন্ধুদের মা-বোনেদের কাছে। আহা, ওসব কথা মনে পড়লে এখনো চোখে পানি আসে ওর।
কালীবাড়ির কাছাকাছি আসতেই আবারও ভয়ে গা ছমছম করতে লাগল ওর। বুঝতে পারছে না, কেন হচ্ছে এমনটা। কখনো এরকম হয়নি ওর। কত রাত এই জায়গায় বন্ধুদের সাথে রাত কাটিয়েছে সে। কালী পূজার সময় বন্ধুদের সাথে রাত জেগে পূজার প্যান্ডেলে বসে থাকত।
ওর বন্ধুরা পূজার কাজকর্ম করতে থাকলে সেসবে দূর থেকে সাহায্য করত। সবাই মিলে রাত পার করে দিত রঙ্গ-তামাশায়। এমনকি বন্ধুরা যখন দেবী কালী মাকে অশেষ শ্রদ্ধায় প্রণাম করত, তখন কেন যেন চোখে জল চলে আসত শঙ্করের। দেবীর মুখটাতে ও যেন দেখতে পেত অভাগিনী মা-টার মুখ।
এখন প্রতিদিন কাজ শেষে বাড়ি ফেরার সময় কালীবাড়ির সামনে এলে শঙ্কর কালী মাতাকে গভীরভাবে স্মরণ  ও ভক্তি করে।
মন্দিরের কিছুটা দূরে থাকতেই ধানখেতের মাঝখানে একটা আলোড়ন উঠল। পিলে চমকানো একটা হুঙ্কারের শব্দ কর্ণগোচর হলো ওর। ভরা পূর্ণিমার আলোয় দিনের মতোই সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। যতই রাত বাড়ছে ততই যেন চাঁদের আলো বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। ভয়াল শব্দটা শুনতেই বুকের ভেতর ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গেল ওর। ভয়ের পাশাপাশি ভীষণ কান্না পেল। ঈশ্বর এ কোন্ বিপদে ফেলল ওকে, মনে মনে ভাবে ও।
দ্রুতবেগে কোনো এক ভয়ানক অশরীরী যেন ছুটে আসছে ওর দিকে। শঙ্কর একদম স্পষ্ট করে কুয়াশার মতো একটা কুণ্ডলী দেখতে পেল। যেটা ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে এদিকেই। পা দুটোতে যেন শিকড় গজিয়েছে ওর। কিছুতেই সামনে বাড়াতে পারছে না। ঝেড়ে যে দৌড় দেবে সেই শক্তিও নেই। আবারও বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে লাগল ও।
ঘূর্ণিঝড়ের মতো কুণ্ডলীটা ওর প্রায় এক হাত সামনে এসে থমকে গেল। ইতিমধ্যে ওটার তাণ্ডবে চারপাশের ধান গাছগুলো মাটির সাথে দোস্তি করছে। কুণ্ডলীটা এখনও পাক খেয়ে চলেছে। শোঁ শোঁ করে কান ঝালাপালা করা একটা আওয়াজ হচ্ছে। কিন্তু সেই বাতাস শঙ্করের গায়ে কেন লাগছে না, সে রহস্যটা বুঝতে পারছে না। যেখানে ক্ষেতের ধানের চারাগুলো মাটির সাথে মিশে গেছে প্রায়! ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকা কুণ্ডলীটা একটা অবয়বে পরিণত হতে লাগল ।
কিছুক্ষণ পর ওটার আকৃতি এমন একটা পর্যায়ে দাঁড়াল যে, শঙ্করের দেখে মনে হলো; নিচের দিকটা মানুষের মতো হলেও উপরের দিকটা দেখতে ঠিক একটা শিয়ালের। এরকম জীব জীবনেও দেখেনি শঙ্কর। ও দেখতে পেল, অদ্ভুত ভয়ঙ্কর জীবটা উঁচু টিলাটির দিকে তাকিয়ে আছে ক্রোধান্ধ দৃষ্টিতে। শঙ্কর ওদিকে তাকাতেই দেখল, কালীবাড়ির সামনে বড় টিলাটির উপর কেউ একজন যেন দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে নারীমূর্তির মতোই লাগছে। এত রাতে এই স্থানে কোনো নারী থাকার প্রশ্নই আসে না। এটা কীভাবে সম্ভব? আর যদি সম্ভবই হয় তবে নারীটা কে? ভাবছে শঙ্কর।
সেই নারীমূর্তির চোখ দুটো ভয়ঙ্কর আক্রোশে ধ্বকধ্বক করে জ্বলছে। শঙ্করের মনে হলো, ওই দুটো চোখ যেন ছোট্ট দুটো গনগনে জ্বলন্ত ইটের ভাটা। দূর থেকে শঙ্করকে মূর্তিটি তাঁর কাছে যাবার জন্য ইশারা করল। শঙ্কর তাঁর আদেশ অমান্য করতে পারল না। ওর মন বলছে, এই নারী যেই হোক; তাঁর দ্বারা ওর কোনো ক্ষতি হবার সম্ভাবনা নেই। কী অদ্ভুত ব্যাপার, ও যেন এতক্ষণ এই আদেশের অপেক্ষাতেই ছিল। ছুট লাগাল তার দিকে।
ছুটতে ছুটতেই দেখতে পেল, নারীটির হাত থেকে একটি অগ্নিশেল ছুটে গেল ওই অদ্ভুত প্রাণীটির দিকে। ওটা তার শরীরে লাগতেই ধাউধাউ করে আগুন ধরে গেল। খড়ের কাকতাড়ুয়া বানিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলে যেরকম হয়, ঠিক সেই রকমভাবেই চড়চড় শব্দে পুড়তে শুরু করল ওটা। ভয়ানক কষ্টে গগনবিদারী বিভৎস চিৎকারে ফেটে পড়ল চরাচর। কাছে গিয়ে শঙ্কর বুঝতে পারল, এই নারী এই জগতের কেউ নয়–অন্য জগতের কেউ!
কুচকুচে কালো নারীমূর্তিটির মুখশ্রীটাতে নিজের জন্মদাত্রী মায়ের চেহারার আদলটা দেখতে পেল যেন। মন্দিরের দিকে তাকিয়ে দেখল, যেখানে কালী মায়ের মূর্তিটা ছিল–সেই স্থানটা একদম ফাঁকা!

লেখক পরিচিতি

রুবেল কান্তি নাথ
রুবেল কান্তি নাথ
রহস্যপত্রিকা'র নিয়মিত লেখক। ২০০৪ সাল থেকে তিনি 'সেবা প্রকাশনী' কর্তৃক প্রকাশিত এই জনপ্রিয় মাসিক পত্রিকায় লিখছেন। তার জন্ম ২২শে ফেব্রুয়ারি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর প্রকৃতি ও পাহাড়ের শহর চট্টগ্রামের দক্ষিণ কাট্টলীতে। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় একটানা লিখে চলেছেন ১৯৯৪ সাল থেকে। দৈনিক প্রথম আলো,সমকাল,সংবাদ,ইত্তেফাক, যুগান্তর, আমার দেশ ও খোলা কাগজের রম্য-বিদ্রূপ সাময়িকী আলপিন,প্যাঁচআল, বাঁশ, ঠাট্টা, বিচ্ছু, ভিমরুল ও বাংলা ওয়াশে প্রদায়ক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন যাবত। পত্র-পত্রিকায় তার প্রকাশিত লেখার সংখ্যা হাজারের অধিক। এছাড়া একক, যৌথ ও সম্পাদিত মিলিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ২০টির বেশি গ্রন্থ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-সর্পমানবী, রক্তপুরাণ, বিষাক্ত প্রজাপতি, ১০০% অ্যাডাল্ট ও ভয় অমনিবাস।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা