১.
রুদ্র নতুন শহরে এসে উঠেছে “নীলম হোস্টেল” নামে পুরনো এক ছাত্রাবাসে। সে পলিটেকনিক কলেজে সদ্য ভর্তি হয়েছে, আর্কিটেকচার নিয়ে পড়বে বলে। সবাই নিচতলার রুম পেলেও রুদ্র পায়নি ৷ এদিকে হোস্টেলের রুম তার প্রয়োজন ৷ মঙ্গল ঘোষ নামের এক ব্যবস্থাপক তাকে নিয়ে যায় দোতলার শেষ রুমটিতে। একমাত্র এটিই খালি ছিল ৷
ঘরটা পুরনো, ছাদের প্লাস্টার খসে পড়া, জানালার পাশ ঘন নীল পর্দা, আর দেয়ালে এক অদ্ভুত প্রাচীন ঘড়ি। কাঠের তৈরি, মায়াবী। মঙ্গল ঘোষ বলল, “এই ঘড়িটা বহু পুরনো ৷ একটা মানসিক পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে এটা এখানে এসেছে ৷ এখনও চলে, তবে রাত বারোটার পর… যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে।”
রুদ্র হেসে উড়িয়ে দিল। এমনিতেই রুদ্র নিরিবিলি থাকা পছন্দ করে তাই এঘরটাতেই সে থাকবে ৷
প্রথম রাত। ঘড়ি তখন ১২:০১ মিনিটে থেমে যায়। জানালার কাঁচে আচমকা পড়ে একটা ধাতব শব্দ, যেন পাথর নয়—কিছু অন্যরকম। সে উঠে দরজা খুলে দেখে… করিডোর ফাঁকা। কিন্তু তার পেছনে ঘরের ঘড়িটা… যেন বাজছে… ধীরে ধীরে। অথচ কাঁটা থেমে আছে।
২.
পরদিন রুদ্র কলেজে গিয়ে সবার সঙ্গে মিশতে চেষ্টা করল। কেউ কেউ অবাক হয়ে বলল—“তুই ঐ রুমে আছিস?!”
তারপর কে যেন চাপা স্বরে নাম করল—“শুভ্র…!”
রুদ্র জানতে চাইল, শুভ্র কে?
তারা বলল—“তিন/চার বছর আগে একজন ছাত্র ছিল। সে ঐ ঘরেই থাকত। এক রাতে হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে হাঁটতে হাঁটতে ছাদে উঠে গিয়ে ঝাঁপ দিয়েছিল। পরদিন রুমের ঘড়িটা থেমে ছিল—১২টা ০১ মিনিটে।”
সন্ধ্যার দিকে রুদ্র রুমে ফিরে আসলো ৷ মঙ্গল ঘোষ বললো—’একটা কথা বলা হয় নাই ৷ তোমার সাথে শুভ্র নামের ছেলেটার চেহারায় অনেক মিল৷ ও হাসল। কাকতালীয় ঘটনা ভেবে পাশ কাটিয়ে গেল। তবে ম্যানেজার আরও বলল— “অমাবস্যার দিনে ঘড়িকে স্পর্শ করো না। সময়কে জাগিয়ে তুললে, সে উত্তর চায়।”
রুদ্র ঠিক তখনই বুঝেছিল, ঘড়ির কাঁটা থেমে যাওয়া মানেই কিছু একটা ঘটবে। ছাত্রাবাসের এই কক্ষে ওঠার পর থেকেই রাত বারোটার পর তার দেয়ালঘড়ি বন্ধ হয়ে যেত। শুধু দেয়ালঘড়ি নয়, তার হাতঘড়িও। মুঠোফোনের ঘড়ি ঠিক থাকত, কিন্তু সেকেন্ডের কাঁটা—সেও মাঝে মাঝে দুলে উঠত যেন কোনো অদৃশ্য ঘুমন্ত হাওয়া তাকে ছুঁয়েছে।
৩.
রাত। জানালার পর্দা যেন নিজে থেকেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। বাইরের আলো নেই, বিদ্যুৎ চলে গেছে। ঘড়ি আবার থেমে গেল ১২টা ০১-এ।
সম্পূর্ণ ভৌতিক পরিবেশ ৷ কোথাও কোন শব্দ নেই ৷ জনমানব কোথাও কেউ নেই ৷ সময় যে যেন সব গ্রাস করেছে ৷ অদৃশ্য শক্তির সম্মোহনে রুদ্র ঘড়ির দিকে যায় ৷ রুদ্র উৎসাহে ঘড়ির কাঁটা ছুঁয়ে দেয়… হঠাৎ কাঁপুনি দিয়ে ওঠে সারা ঘর। এবার অদৃশ্য শক্তির টানে সে আয়নার সামনে যায় ৷ মুঠোফোনের আলোয় আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব মিলছে না। বরং, আয়নায় দেখা যাচ্ছে এক অপরিচিত যুবক, যাকে কোথাও থেকে চেনা লাগে।
হঠাৎ দরজায় ধাক্কা—বহু পায়ের শব্দ। আর ঘরের ভেতর ঝিমঝিম শব্দে কেউ ফিসফিস করছে— “আমি ফিরব বলেই থেমে আছি… সময় থেমে আছে, কারণ আমি চলিনি…”
রুদ্র পেছনে তাকায়—ঘরে কেউ নেই। আয়নার মধ্যেই সেই ছেলেটি বলে ওঠে:
“তুই শুভ্র না রুদ্র? যেই হোস, তুই আমার মতোই একা, ক্লান্ত, সন্দিগ্ধ। আমাদের সময় আমাদের গিলে ফেলে। আমরা ঘড়ির মতোই বাজতে পারি না, কেবল থেমে থাকি।”
প্রচণ্ড ভয়ে রুদ্রর গলা শুকিয়ে যাচ্ছে ৷ এসব কি হচ্ছে ? সে বুঝতে পারছে না ৷ ঘটনার আকস্মিকতায় সে হতবিহবল ৷ এবার দেয়ালঘড়ির ভেতর থেকে রক্তের মতো লাল তরল গড়িয়ে পড়ছে।
৪.
পরদিন সকাল। ঘড়ি আবার ঠিকঠাক চলছে। কোথাও রক্তের দাগ নেই বিদ্যুৎ এসেছে, সূর্য উঠেছে, মনে হচ্ছে সব ঠিক আছে। রুদ্র চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবল—সবই হয়তো ঘুমের মধ্যে দেখেছে।
দিনের বেলায় ঘড়ির কাঁটা স্বাভাবিক চলে। সময়ে ক্লাস, সময়ে খাবার, এমনকি বারান্দার ধুলোর দাগও ঘড়ির সঙ্গে তাল মেলে।
আতিক, পাশের রুমের পুরনো ছাত্র, বলল—“তুই চিন্তা করিস নে ভাই । রাতে ঘড়ি থেমে গেলেও কিছু হয় না। মন দিয়ে পড়। আবার অনেকেই পাগল হয়ে গেছে এসব ভেবে।”
রুদ্র আতঙ্কে ছাদে উঠে আসে বিকেলেই। কিন্তু ছাদে গিয়ে দেখে, একপাশে কাঠের দরজা—লকড। দরজায় লেখা—“প্রবেশ নিষেধ ৷”
৫.
রাত প্রায় বারোটা ৷ রুদ্র ঠিক করে আজ ঘড়িতে হাত দেবে না। সে চুপচাপ বসে থাকে। কিন্তু হঠাৎ জানালার বাইরে বিদ্যুৎ চমকায়—এক পলকের জন্য দেখে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক ছেলে,এক ছায়া, শুভ্র! তাকিয়ে আছে গম্ভীর চোখে।
ঘরের বাতি নিভে যায় নিজে থেকে। ঘড়ি আবার থেমে গেছে ১২:০১ এ।
রুদ্র ছুটে দরজা খুলে বেরোয়। করিডোরে কেউ নেই। আয়নার পাশে দাঁড়ানো সে—আবার সেই অপরিচিত মুখ। এবার মুখ বলল—
“ঘড়ি তো থেমে আছে রুদ্র। এবার তোকে থেমে যেতে হবে। তুই পালাতে চেয়েছিলি… আমিও পালাতে চেয়েছিলাম। কেউ পারিনি।”
হঠাৎ পেছনে দাঁড়িয়ে মঙ্গল ! অমাবস্যার এই অদ্ভূত সময়ে এই কক্ষে কেউ থাকলে মঙ্গলও অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে ৷ তার চোখ অদ্ভুত অন্ধকার। ঠোঁটে মৃদু হাসি ৷ মঙ্গল বললো— “আমরা যারা সময়কে ছুঁয়েছি, তারা সময়ের মধ্যে আটকে গেছি। আমি একসময় এ হোস্টেলের ছাত্র ছিলাম। এখন… শুধু একজন ম্যানেজার। দেখাশোনা করি… নতুনদের থামানোর জন্য। কিন্তু সবাই থামে না। সময় কাউকে ছাড়ে না।”
ছায়া বলে—“তোর সময় ফুরোতে চলেছে। আজ রাতটাই শেষ সুযোগ। পালাতে পারলে বাঁচবি। নইলে তুইও থেমে যাবি।”
দূরে আতিককে দেখতে পায় সে ৷
ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনি হয় না, কিন্তু রুদ্র অনুভব করে—কেউ যেন তার বুকের ভেতর কাঁটা বসিয়ে দিয়েছে।
৬.
সকালের আলোয় হোস্টেলের রুমে মেলে এক তরুণের নিথর দেহ। মুখে আশ্চর্য শান্তি, ঘড়ি থেমে আছে বুকের পাশে—১২:o১।
মঙ্গল পুলিশকে বলে—“নতুন ছেলেটা ছিল একটু একা। কিছু মানসিক চাপ হয়তো ছিল। হঠাৎ রাতে…”
পুলিশ প্রশ্ন করে—“এখানে ঘড়িটা কি তার?”
মঙ্গল অপলক চেয়ে থাকে। মনে মনে বলে—”আর কেউ না জানুক সে তো জানে ৷ এসবই নিয়তি ৷ রুদ্র নামের ছেলেটার নিয়তিই এখানে ডেকে এনেছে ৷”
তারপর মঙ্গল অস্ফুট স্বরে বলে—“না, ঘড়িটা কখনোই কারও না। ঘড়ির মালিক সময় নিজে।”


