আফরোজা মামুদ
রাতের আঁধারে পথ চলেছে সে। দ্রুত বাড়ি পৌঁছাতে হবে। পেটের ধান্দায় সেই কখন থেকে ঘুরছে। নির্দয় মানুষের মনে আজকাল কোনো দয়া মায়া নেই। চাইলে তাদের কাছে খাবার পাওয়া যায় না। সে অবশ্য কখনো চেয়েও দেখেনি। চাইতে হয় কীভাবে তা সে জানে না। তাই খাবার হয় সে আদায় করে নেয়, না হয় চুরি করে। দুটোতেই যদিও ধরা পড়া এবং জীবনহানির ঝুঁকি আছে। তবু ঝুঁকি নিতে হয়। কাজ করে খাওয়ার সুযোগ তো আর নেই।
পেটের ক্ষুধাও আজব এক ব্যাপার। একবারে খেয়ে নিবারণ করা যায় না। এসব ক্ষুধার ব্যাপার না থাকলে জীবনটা খুব সুন্দর উপভোগ করা যেত।
বউটা এখনো ঘরে ফিরল কিনা কে জানে। যা দিনকাল পড়েছে। জীবনের কোনো ভরসা নেই। কি পুরুষ, কি মহিলা আর কি শিশু! কেউই বাঁচতে পারে না নিষ্ঠুর মানুষগুলোর ঘৃণা ও ক্রোধ থেকে। দয়া মায়াহীন একটি নিষ্ঠুর প্রজাতি এই মানুষ। কেউ স্বীকার করুক আর না করুক, সে বিশ্বাস করে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী ওই তারাই। এদের মানুষ না বলে দানব বলা গেলে বেশ জুতসই হতো।
হাঁটার গতি সে বাড়িয়ে দিল। বউ বাচ্চাকে দেখার জন্য মনটা ছটফট করছে। দূর থেকে দেখতে পেল ঘরের দরজার কাছে বউ দাঁড়িয়ে আছে। অপেক্ষা করছে তার জন্য।
বউয়ের হাজার পুঞ্জাক্ষি চোখজোড়ায় তাকে দেখে খুশির ঝিলিক বয়ে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। পরক্ষণে তা বিচলিত হয়ে ভয়ার্ত নেত্রে রূপ নিল। সে দেখল বউয়ের চোখ তার শরীর ছাপিয়ে পেছন দিকে স্থির। বউয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করে সে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকাল। ঠিক তখনই ঝলমল করে আলোকিত হয়ে গেল চারপাশ। এনার্জি সেভিং লাইটের সাদা আলোয় তার দৃষ্টি খানিকটা ঝাপসা হয়ে উঠল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো শরীরের ওপর মানুষ নামের দানবের একটি পা এসে পড়ল প্রচণ্ড আক্রোশে। ঠকাস করে ভোঁতা এক ধরনের আওয়াজ হলো পেট ফাটার। তবু পায়ে থাকা চপ্পলটা এদিক সেদিক ঘুরিয়ে তাকে চিড়ে-চ্যাপ্টা বানানোর চেষ্টা চলতে থাকল।
সেই সঙ্গে মানুষটা রান্নাঘর থেকে গ্লাস নিতে নিতে বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল—‘উফ! এই তেলাপোকার যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না। কি দ্রুতগতিতেই না এদের বংশবৃদ্ধি ঘটে। আলো বন্ধ হলেই ঘরজুড়ে এদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়।’


