শুভংকর পোদ্দার
হাজারী গুড়ের উৎপত্তি জেলার হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা অঞ্চলে। এ অঞ্চলের কিছু পরিবার এখানো হাজারী গুড় তৈরি করছে। একসময় ব্যাপকভাবে হাজারী গুড়ের উৎপাদন হলেও খেজুর গাছের স্বল্পতা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে তা কমে এসেছে।
চ্যানেল আইয়ের এক প্রতিবেদনে শাইখ সিরাজ বলেছেন, ‘‘জনশ্রুতি আছে, ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথকেও এই গুড় উপহার দেওয়া হয়েছিল। রানি এলিজাবেথ গুড় খেয়ে অভিভূত হয়েছিলেন। গুণমুগ্ধতা প্রকাশ করতে আগ্রহী হয়ে ‘হাজারী’ নামে একটি সিলমোহরও তৈরি করে দিয়েছিলেন রানি। তিনি নিজেই ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এ গুড়ের নাম।’’
খেজুর গাছে রসের হাড়ি।
হাজারী গুড়ের ইতিহাস: হাজারী গুড় নিয়ে এলাকায় প্রচলিত গল্প থেকে জানা যায়, প্রায় দেড়শ বছর আগে হরিরামপুর উপজেলার ঝিট্কা অঞ্চলে মো. হাজারী প্রামানিক নামে একজন গাছি ছিলেন। যিনি খেজুরের রস দিয়ে গুড় তৈরি করতেন। একদিন বিকেলে খেজুর গাছে হাঁড়ি বসিয়ে গাছ থেকে নামামাত্রই একজন দরবেশ তার কাছে রস খেতে চান। তখন হাজারী প্রামানিক ওই দরবেশকে বলেছিলেন, সবেমাত্র গাছে হাঁড়ি বসানো হয়েছে। এত অল্প সময়ে বড় জোর ১০-১৫ ফোঁটা রস হাঁড়িতে পড়েছে। তবু দরবেশ তাকে গাছে উঠে হাঁড়ি নামিয়ে রস খাওয়ানোর অনুরোধ জানান। দরবেশের অনুরোধে আবারও খেজুর গাছে ওঠেন হাজারী প্রামানিক। তিনি দেখতে পান, রসে হাঁড়ি ভরে গেছে। রসভর্তি হাঁড়ি নিয়ে তিনি গাছ থেকে নেমে দরবেশকে রস খাওয়ান এবং দরবেশের পা জড়িয়ে ধরেন। তখন দরবেশ তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তুমি যত গুড় তৈরি করবে, তার সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে। এরপর থেকেই গাছি হাজারী প্রামানিকের নামেই এই গুড়ের নামকরণ করা হয় ‘হাজারী গুড়’।
মাটির পাত্রে বাঁশের তৈরি কাঠি দিয়ে ঘুটে বিশেষ পক্রিয়ায় হাজারী গুড় বানাচ্ছেন ঝিটকা সরদার পাড়া এলাকার সিদ্দিক প্রামাণিক নামক গাছি।
যেভাবে তৈরি হয় হাজারী গুড়: কয়েকজন গাছি জানান, আগের দিন বিকেলে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেওয়া হয়। পরদিন ভোরে গাছ থেকে রস নামিয়ে ছেঁকে ময়লা পরিষ্কার করে মাটির তৈরি পাত্রে (জালা) অথবা টিনের তৈরি পাত্রে (তাপাল) চুলায় জ্বাল দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে গুড় তৈরি করতে হয়। মিষ্টি ও টলটলে রস ছাড়া এ গুড় হয় না। এক কেজি হাজারী গুড় তৈরিতে প্রায় ১২ থেকে ১৫ কেজি রস প্রয়োজন। প্রচুর চাহিদা থাকায় গুড় নেওয়ার জন্য আগে থেকেই গাছিদের বলে রাখতে হয়। প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হয় ১৮০০-২০০০ টাকায়।
ঝিটকা গাছিপাড়া এলাকার আব্দুস সালাম গাছি বলেন, ‘দিন দিন খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। নানা কারণে কমে যাচ্ছে রসের পরিমাণও। যে কারণে চাহিদা মোতাবেক গুড় তৈরি করা যাচ্ছে না। এছাড়া বছরের অল্প কিছু সময় খেজুরের রস থেকে গুড় তৈরি করা যায়। বাকি সময় গাছিদের প্রায় বেকারই থাকতে হয়। তাই অনেকে পেশাও বদল করেছে। এখন ঝিটকা এলাকায় ১০-১২টি পরিবার এই গুড়ের ঐহিত্য টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত গাছ ও গাছির সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে অদূর ভবিষ্যতে হাজারী গুড় অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।’
হাজারী গুড়ের পাটালীর আকার দিতে, ছোট ছোট মাটির বাটিতে শুকনো কাপড়ের উপর তরল গুড় ঢালা হচ্ছে।
সিদ্দিক প্রামানিক নামের এক গাছি বলেন, ‘চাহিদা বেশি থাকায় অসাধু কিছু ব্যবসায়ী নকল সিল ও অল্প দামে ভেজাল গুড় তৈরি করে হাজারী গুড় বলে বিক্রি করে আসছে। এতে নষ্ট হচ্ছে হাজারী গুড়ের সুনাম।
‘হাজারী প্রোডাক্টস, মানিকগঞ্জ’-এর স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম হাজারী শামীম বলেন, ‘ঝিটকা এলাকার ১০ থেকে ১২টি পরিবার প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ কেজি গুড় তৈরি করেন। খেজুর গাছ কমে যাওয়ায় গুড়ের উৎপাদনও কমছে। ভেজাল প্রতিরোধ করতে গতবছর থেকে রেজিস্টার্ড ট্রেডমার্কযুক্ত প্যাকেটের মাধ্যমে গুড় বাজারজাত করা হচ্ছে। হাজারী গুড় টিকিয়ে রাখতে হলে রাস্তাঘাট, পতিত জমি ও ভিটে-বাড়ির আঙিনায় বেশি বেশি করে খেজুরগাছ রোপণ করতে এলাকাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
হাজারী গুড়।


