শুক্রবার, মে ১৫, ২০২৬

ফিচার [] সুনীতা উইলিয়ামস: নক্ষত্র ছোঁয়ার গল্প

শুরুর গল্প: এক স্বপ্নবাজ নারীর উত্থান

সুনীতা উইলিয়ামস— একজন ভারতীয় মার্কিন মহাকাশচারী , একজন স্বপ্নবাজ, একজন অভিযাত্রী। জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে, কিন্তু শিকড় ছড়িয়ে আছে ভারতীয় উপমহাদেশে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অকুতোভয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে তার মনে হতো, মানুষ কেন শুধু পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এই প্রশ্নই তাকে ঠেলে দেয় মহাকাশ অভিযানের পথে।

মার্কিন নৌবাহিনীর পাইলট থেকে নভোচারী হওয়ার দীর্ঘ যাত্রা সহজ ছিল না। প্রশিক্ষণের কঠোর ধাপ, শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা—সব পেরিয়ে তিনি যখন মহাকাশ অভিযানের জন্য নির্বাচিত হন, তখনই তার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।

মহাকাশে দীর্ঘতম বাস: শূন্যতার মধ্যে জীবন

৯ মাসের দীর্ঘ মহাকাশ যাত্রা শেষে অবশেষে দেশে ফিরছেন নাসার নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামস। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) থেকে স্পেসএক্স ড্রাগন মহাকাশযানে চড়ে তিনি এবং সহকর্মী বুচ উইলমোর পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। যা কোনো নারীর জন্য দীর্ঘতম মহাকাশবাসের রেকর্ড।

পলিমাটি

কিন্তু মহাকাশে থাকা কি শুধুই রোমাঞ্চ?

নিশ্চয়ই না। সেখানে দিন-রাত বলে কিছু নেই। সময়ের ধারণা বদলে যায়, শরীরে অভিকর্ষের অভাব অনুভূত হয়, মানসিকভাবে একাকিত্ব গ্রাস করতে চায়। তবু তিনি হাসিমুখে সবকিছু জয় করেছেন।

মহাকাশে থাকাকালীন প্রতিদিন তাকে করতে হতো—
✅ শরীরচর্চা
✅ গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা
✅ ISS-এর রক্ষণাবেক্ষণ
✅ পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা

এছাড়া মহাকাশে খাবার খাওয়া আর ঘুমানোও এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। খাবার ভাসতে থাকে, তাই সেটাকে সাবধানে মুখে নিতে হয়। বোয়িং স্টারলাইনার মিশনের সমস্যার কারণে তাঁদের তাজা ফল এবং শাকসবজি খাওয়ার পরিমাণ সীমিত ছিল। শুরুর দিকে তাঁদের খাদ্যতালিকায় তাজা ফল ছিল। তিন মাস পার হওয়ার পর সেগুলোর মজুদ শেষ হয়ে যায়। পরে প্যাকেটজাত বা ঠাণ্ডা ও শুকনো খাবার খেতে থাকেন। মহাকাশে কর্নফ্লেক্স জাতীয় খাবার, গুঁড়া দুধ, পিৎজা, মুরগির কাবাব, ঝিনুক ককটেল ও টুনা ছিল। নাসার মেডিকেল টিম পৃথিবী থেকে মহাকাশচারীদের ক্যালরি গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করতেন ৷ স্যুপ, স্ট্যু (সাধারণত মাংস, শাকসবজি এবং অন্যান্য উপকরণ একসঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে সেদ্ধ করে তৈরি খাবার) এবং ক্যাসেরোল ধরনের (মাংস, শাকসবজি, শসা, পাস্তা, চিজ, সস ইত্যাদি একত্রে তৈরি খাবার) খাবারগুলোতে পানি যুক্ত করে খাওয়ার উপযোগী করা হতো। এই পানির সরবরাহ মিলত আইএসএসের ৫৩০ গ্যালন পানির ট্যাংক থেকে।
আর ঘুম? এক বিশেষ ব্যাগে নিজেকে বেঁধে রাখতে হয়, না হলে শূন্য অভিকর্ষে ঘুমের মধ্যেই দিক হারিয়ে ফেলার ভয়!

ভয়, হতাশা ও একাকিত্ব: মহাশূন্যের অন্ধকার দিক

মহাকাশে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো একাকিত্ব। পরিবার থেকে দূরে, পৃথিবী থেকে বহু মাইল ওপরে, যেখানে কোনো বাতাস নেই, পাখির ডাক নেই, সবকিছু শূন্যতার মধ্যে ভেসে বেড়ায়—সেখানে মানসিক চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

সুনীতা নিজেই একবার বলেছিলেন, “মহাকাশে যখন পৃথিবীকে দেখি, মনে হয় কত ক্ষুদ্র! তখন বুঝতে পারি, আমরা সবাই কত সংযুক্ত, অথচ আমরা পৃথিবীতে থেকেই কত বিভক্ত থাকি।”

মহাকাশযানে ছোটখাটো সমস্যাও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। একটি স্ক্রু হারিয়ে ফেলা মানেই বিশাল বিপদ, কারণ শূন্য অভিকর্ষে সেটি ভেসে গিয়ে কোনো মেশিনে আটকে গেলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো স্পেসওয়াক বা মহাকাশে বেরিয়ে কাজ করা। সুনীতা উইলিয়ামস মহাকাশে মোট ৯ টি স্পেসওয়াক করেছেন, যা নারী নভোচারীদের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। সেখানে একটুও ভুল করা মানেই জীবন শেষ!

সফল প্রত্যাবর্তন: সাহসের নতুন সংজ্ঞা

দীর্ঘ ২৮৬ দিন মহাকাশে কাটিয়ে তিনি যখন পৃথিবীতে ফিরে এলেন, তখন নতুন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছিল। শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক প্রক্রিয়া বদলে গিয়েছিল, পা মাটিতে রাখতেই ভারী মনে হচ্ছিল, মাথা ঘুরছিল, চোখে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। তবু, ধাপে ধাপে সব কাটিয়ে উঠে তিনি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেন।

সফল প্রত্যাবর্তনের পর তিনি হয়ে উঠলেন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা। মহাকাশ গবেষণা, নারী শক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তার অবদান অনস্বীকার্য।

শেষ কথা: মহাকাশের পথিকদের জন্য এক আলোকবর্তিকা

সুনীতা উইলিয়ামসের গল্প শুধু এক নভোচারীর গল্প নয়, এটি এক সংগ্রামী নারীর গল্প, যিনি নিজেকে বারবার ছাপিয়ে গেছেন।

তিনি প্রমাণ করেছেন—
✅ স্বপ্নের কোনো সীমা নেই
✅ সাহস ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সব বাধা জয় করা সম্ভব
✅ মহাকাশ শুধু পুরুষদের জন্য নয়, নারীরাও সেখানে সমান দক্ষ

সুনীতা আজও ভবিষ্যৎ অভিযাত্রীদের জন্য এক আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন। হয়তো একদিন, তার পথ অনুসরণ করে কোনো নতুন অভিযাত্রী ছুঁয়ে ফেলবে আরও দূরের নক্ষত্র!

লেখক পরিচিতি

পংকজ পাল
পংকজ পাল
তরুণ গল্পকার ও কবির জন্ম ১৫ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলায় ৷ বি.এস.সি (অনার্স), এম.এস.সি ; এল.এল.বি; শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন ৷ তার প্রকাশিত একক গ্রন্থ দুইটি ৷ কাব্যগ্রন্থ-'নিঃসঙ্গতার মেঘমালা' ও গল্পগ্রন্থ-'আকাশের নীল রং' এবং যৌথগ্রন্থ-চল্লিশের বেশি ৷ জেলার উদীচী, প্রগতি লেখক সংঘ, খেলাঘর, প্রথম আলো বন্ধুসভা, উত্তরণসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন ৷ বর্তমানে সম্পাদনা করছেন-'পলিমাটি','অন্তরঙ্গ 'ও 'চিন্ময়ী'৷ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে জেলা পর্যায়ে আয়োজিত ৩১তম বিজ্ঞান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সপ্তাহ ২০০৯-১০ খ্রিস্টাব্দে সিনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান, কবিতা সংসদ সাহিত্য পদক-২০১৪, বাংলাদেশের লেখক-'লেখক ডিরেক্টরি'র অন্তর্ভূক্ত-২০১৪, কাব্য চন্দ্রিকা একাডেমি পদক-২০১৭, লিখিয়ে কাব্য সাহিত্য সম্মাননা-২০১৮, পল্লী কবি জসীমউদ্দীন স্মারক-২০১৮, কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি স্মারক ও সম্মাননা-২০২২ পেয়েছেন ৷ মেইল : pankajprenoy@gmail.com/ paulpankaj864@gmail.com

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা