বৈচিত্র্যময় এ পৃথিবীতে রয়েছে লক্ষ লক্ষ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণি ৷ এর মধ্যে কতটুকু আর চেনাজানা যায় ? কত ফুল ফোটে, কত পাখি গান গায় কিন্তু আমরা চিনি কি সব ফুলকে? শুনি কি সব পাখির গান ? এমনও বহু ফুল আছে যাদের আমরা দেখি কিন্তু চিনি না আবার চিনি কিন্তু জানিনা।
আমাদের চোখের সামনে বেড়ে ওঠা, অনাদারে অবহেলায় বিশেষ করে গ্রাম-বাংলায় যাদের বেড়ে ওঠা তাদের কাছে এ ফুল এমনিতেই খুব পরিচিত। খুব কাছ থেকে বার বার দেখা এক অতিপরিচিত এ ফুল, ভাঁটফুল। ভাঁটফুল বসন্তের ফুল হলেও চৈত্রমাসে এর আধিক্য বেশি দেখা যায়। মূলত বসন্ত ঋতুতেই কম-বেশি সারাদেশেই হাসি হয়ে ফুটে থাকে বাড়ির আসেপাশে, ঝোপঝাড়ে, রাস্তার দুপাশে, পুকুর,জলা, নদীর পাড়ে। আঞ্চলিকতার প্রভেদে নানা জেলায় নানান নামে একে পরিচিত হতে দেখা যায়। সিলেট অঞ্চলে এ ফুল ভাঁটিফুল, বগুড়া অঞ্চলে ভেঁটফুল বা ভ্যাঁটফুল, টাংগাইলে এ ফুল ভাইটা ফুল নামে পরিচিত। এটি মূলত একটা বুনোফুল। ভাট ফুলের আরও অনেক নাম আছে যেমন ভাত ফুল, ঘণ্টাকর্ণ, বনজুঁই ইত্যাদি। একে বলা হয় হিল গ্লোরি বোয়ার (hill glory bower)। এর বৈজ্ঞানিক নাম Clerodendrum viscosum. Verbenaceae গণের এই ফুল Lamiaceae) পরিবারভুক্ত।
গ্রামে রাস্তার ধারে, ঝোপঝাড়, জঙ্গল, টিলা, পাহাড়ের গায়ে ব্যাপকভাবে ভাঁটফুলের দেখা মেলে। গ্রামবাংলার পথের ধারে অবহেলায় ফুটে থাকা এ ভাঁটফুলের সৌন্দর্য অন্য ফুল থেকে কোন অংশেই কম নয়। পথিকের মনকে অল্প সময়ের জন্য আন্দোলিত করে বটেই এ ফুলের সৌন্দর্য ও সৌরভ মানুষকে যথেষ্ট আকৃষ্ট করে। গ্রামীন শিশু, কিশোর, কিশোরীদের খেলাধুলায় চরম আর্কষণ এ ভাঁটফুল। বুনোফুল হলেও এর কদর কখনো কম নয়। শেফালি, মল্লিকা, রজনীগন্ধা, হাস্নাহেনা, গোলাপ, করবী, গাঁদার সাথে পাল্লা দিয়েই সাহিত্যে পুরাতন ও আধুনিক কবি, লেখকদের হাতেই এ ফুল যথাযথ সমাদৃত হতে থাকে সাহিত্যাঙ্গনে। যেমন উল্লেখ করা যায়
ভাঁট ফুল নিয়ে জীবনানন্দের একটি কবিতা …
“কোথাও মঠের কাছে”
“কোথাও মঠের কাছে — যেইখানে ভাঙা মঠ নীল হয়ে আছে
শ্যাওলায় — অনেক গভীর ঘাস জমে গেছে বুকের ভিতর,
পাশে দীঘি মজে আছে — রূপালী মাছের কণ্ঠে কামনার স্বর
যেইখানে পটরানী আর তার রূপসী সখীরা শুনিয়াছে
বহু বহু দিন আগে — যেইখানে শঙ্খমালা কাঁথা বুনিয়াছে
সে কত শতাব্দী আগে মাছরাঙা — ঝিলমিল — কড়ি খেলা ঘর;
কোন যেন কুহকীর ঝাড়ফুঁকে ডুবে গেছে সব তারপর
একদিন আমি যাব দু-প্রহরে সেই দূর প্রান্তরের কাছে,
সেখানে মানুষ কেউ যায় নাকে — দেখা যায় বাঘিনীর ডোরা
বেতের বনের ফাঁকে — জারুল গাছের তলে রৌদ্র পোহায়
রূপসী মৃগীর মুখ দেখা যায়, — সাদা ভাঁট পুষ্পের তোড়া
আলোকতার পাশে গন্ধ ঢালে দ্রোণফুল বাসকের গায়;
তবুও সেখানে আমি নিয়ে যাবো একদিন পাটকিলে ঘোড়া
যার রূপ জন্মে — জন্মে কাঁদায়েছে আমি তারে খুঁজিব সেথায়।
“বাংলার মুখ” কবিতার শেষ লাইনে কবি তেমনি লিখেছিলেন-
“বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ
খুঁজিতে যাই না আর : অন্ধকারে জেগে উঠে ডুমুরের গাছে
চেয়ে দেখি ছাতার মতো ব্ড় পাতাটির নিচে বসে আছে
ভোরের দয়েলপাখি – চারিদিকে চেয়ে দেখি পল্লবের স্তূপ
জাম-বট-কাঁঠালের-হিজলের-অশথের করে আছে চুপ;
ফণীমনসার ঝোপে শটিবনে তাহাদের ছায়া পড়িয়াছে;
মধুকর ডিঙা থেকে না জানি সে কবে চাঁদ চম্পার কাছে
এমনই হিজল-বট-তমালের নীল ছায়া বাংলার অপরূপ রূপ
দেখেছিল; বেহুলাও একদিন গাঙুড়ের জলে ভেলা নিয়ে –
কৃষ্ণা-দ্বাদশীর জোৎস্না যখন মরিয়া গেছে নদীর চড়ায় –
সোনালি ধানের পাশে অসংখ্য অশ্বত্থ বট দেখেছিল, হায়,
শ্যামার নরম গান শুনেছিল – একদিন অমরায় গিয়ে
ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়
বাংলার নদ-নদী-ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়। “
ভাঁটফুলের আরেক নাম ঘণ্টাকর্ণ। এ নামে আছে পৌরাণিক কাহিনী। রবীন্দ্রনাথেরও দৃষ্টি এড়ায়নি এইটুকুন ফুল। তাঁর ‘সে’ শিরোনামে লেখা গল্পটিতে পাওয়া যায় ঘণ্টাকর্ণকে। গল্পের একটি চরিত্র ঘণ্টাকর্ণ। এর দুই কানে দুই ঘণ্টা। লেজও দুটি। দুই লেজে দুই হাতুড়ি। ওগুলো দিয়ে নিজেই নিজের ঘণ্টা বাজিয়ে যায়।
কাজী নজরুল ইসলামের গানে পাই…..
আমি ময়নামতীর শাড়ি দেবো, চলো আমার বাড়ি
ওগো ভিনগেরামের নারী
তোরে সোনাল ফুলের বাজু দেবো চুড়ি বেলোয়ারি।।
বৈঁচী ফুলের পৈঁচী দেবো কলমিলতার বালা,
গলায় দেব টাটকা তোলা ভাঁট ফুলেরই মালা কন্যা
রক্ত-শালুক দিবো পায়ে, পরবে আলতা তা’রি।।
এছাড়া বিখ্যাত লেখক বিভূঁতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় তার লেখায় ভাঁটফুল নিয়ে বলেন-
“বেলা বেশ পড়ে এসেছে। সন্ধ্যার বাতাসে ছাতিম বনে হুরা সুর শব্দ হচ্ছে। গ্রামের মাঠটা অনেকদূর পর্য্যন্ত উচুনীচু ঢিবি আর ঘেটু ফুলের বনে একেবারে ভরা। বঁদিকে দূরে একটা পুরনো ইটের পাজার খানিকটা ঘন জিউলি গাছের সারির মধ্য দিয়ে চোখে পড়ে। নৌকোর গলুই-এ বসে আসন্ন সন্ধ্যায় আশী বছর আগেকার পলাতকা গ্ৰাম্য-বন্ধুর ইতিহাসটা ভাবতে লাগিলুম। মাঠের মাঝে উঁচু টিবির ওপরকার ঘেঁটু ফুলের ঘন বনের দিকে চেয়ে মনে হ’ল সারা দিনমান সে হয়ত ওর মধ্যে লুকিয়ে বসে থাকে।”
কবি আবুল হাসানের কবিতায়ও ভাঁটফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়, তাছাড়া বনফুল, তারাশঙ্কর এসকল খ্যাতিমান লেখকদেরও ছোটছোট লেখায় ভাঁটফুলের উল্লেখ পাওয়া যায় ৷
সাহিত্যে ভাঁটফুলের সৌন্দর্য যেমন বিখ্যাত বিখ্যাত কবি, লেখক, সাহিত্যিকের হাতে নিপুণভাবে বর্ণিত হয়েছে তেমনি এ ফুলের আছে ঔষধি গুণ। ঘণ্টাকর্ণ, ঘেঁটু বা ভাঁটে জ্বর, চর্মরোগ, বিছের হুল ফোটানোতে ওষুধের কাজ করে। আর কি আশ্চর্য, বসন্তকালে এসব রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। এমনকি ম্যালেরিয়া জ্বরে, পান্ডু রোগে, অজীর্ণে এর রস কাজ করে ওষুধের মতো। এজন্য চৈত্র সংক্রান্তিতে ঘণ্টাকর্ণ বৃক্ষের আরাধনা করা হয় চর্মরোগ নিবারণের জন্য। গ্রামের মানুষ জ্বর হলে এর পাতার রস খেয়ে থাকে। কৃমি, পুরনো শূল বেদনা দূর করতে ভাঁট একটি উৎকৃষ্ট ভেষজ।


