শনিবার, মে ১৬, ২০২৬

বাঙালির চিত্রকলা: পর্ব-০২

পর্ব:০২

পঞ্চাশের দশকে ঢাকার আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আধুনিক ধারার চিত্রশিল্পীদের মধ্যে তৎকালীন জনপ্রিয় নির্বস্ত্তক রীতির আন্তর্জাতিক আদল ও আবেদন স্বাভাবিকভাবেই প্রতিফলিত হয়। ফলে আধুনিক ইউরোপীয় শৈলীসমূহের মধ্যে বিমূর্ততার চর্চা লক্ষ করা যায়। এ ধারার বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া। চিত্রকলা ও ছাপচিত্র চর্চার ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্বতা প্রতিভাত। রঙ রেখা ও বুনটের নির্বস্ত্তক উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি নির্মাণ করেন একটি নিজস্ব শিল্পজগৎ। শিল্পী আমিনুল ইসলাম নির্বস্ত্তকতার মধ্যেই শিল্পের সারাৎসার অনুভব করেন, তবু কখনও তাঁর তুলিতে ফিরে আসে মানবদেহ, কখনও ব্যবহূত হয় ভাঙ্গা আয়না, কখনো কোলাজ। ফ্রেস্কো ও মোজাইক পদ্ধতিতে উল্লেখযোগ্য কিছু দেয়ালচিত্র রচনা করেন আমিনুল ইসলাম। হামিদুর রহমান নিরীক্ষাপ্রবণ শিল্পী। বহুমুখিনতা সত্ত্বেও তাঁর প্রধান ঝোঁক মূর্ত ও বিমূর্ত প্রকাশবাদিতার দিকে। ম্যুরাল বা ভিত্তিচিত্রের ক্ষেত্রে হামিদুর রহমান এদেশের অন্যতম পূর্বসূরী। ভাস্কর নভেরা আহমেদের সঙ্গে মিলিতভাবে তিনি ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক শহীদ মিনারের নকশাকার। রশিদ চৌধুরী তেলরঙ ছাড়াও কাজ করেন টেম্পেরা, গোয়াশ ইত্যাদি স্বল্পপ্রচলিত মাধ্যমে। তবে তাঁর সর্বপ্রধান ভিন্নতা ট্যাপেস্ট্রি মাধ্যমের শিল্পী হিসেবে। রশিদ চৌধুরী তাঁর শিল্পের উৎস হিসেবে প্রত্যাবর্তন করেছেন বাংলার লৌকিক ঐতিহ্যে। তিনি চেষ্টা করেছেন লোকচিত্রের বর্ণবৈশিষ্ট্য এবং দ্বিমাত্রিক বিন্যাস, আলোছায়ার উদ্ভাস ও কারিগরিকে একসঙ্গে মেলাবার। পঞ্চাশের দশকের অন্যতম বৈচিত্র্যসম্পন্ন ও নিরীক্ষাপ্রবণ শিল্পী মুর্তজা বশীর। তিনি চিত্রকলা, ভিত্তিচিত্র, ছাপচিত্রকলা ও ভাস্কর্যই শুধু সৃষ্টি করেননি, বিচরণ করেছেন সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও গবেষণার জগতেও। তাঁর সৃষ্টিশীলতা ক্রমপরিবর্তনশীল ও অনুসন্ধানী একটি মানসকে প্রতিবিম্বিত করে। ফলে মূর্ত ও বিমূর্ত বিবিধ ধারার শৈলীতে তিনি বিভিন্ন সময় কাজ করেন। আবদুর রাজ্জাক চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও ছাপচিত্র তিনটি মাধ্যমেই শিল্পচর্চা করেন।

লোকশিল্পের কারুকাজ ও নকশা কাইয়ুম চৌধুরীর শিল্পকর্মের অনুপ্রেরণার উৎসস্থল। তাঁর সাম্প্রতিকতম চিত্রমালায় বর্ণ হয়ে উঠেছে প্রবলভাবে উজ্জ্বল এবং অবিমিশ্র, লোকজ মটিফ ও নকশা নেমে এসেছে ইঙ্গিতমাত্রে, নির্মাণ হয়ে উঠেছে অধিকতর স্বতঃস্ফূর্ত ও সাবলীল। দেবদাস চক্রবর্তীর প্রথম পর্বের নিরীক্ষাধর্মী কাজে দেখা যায় আধাবাস্তব, আধাবিমূর্ত ঢঙে মনুষ্য-অবয়ব, মিছিল, নারীমুখ ইত্যাদি। দ্বিতীয়পর্বে সমসাময়িকদের মতো দেবদাস চক্রবর্তীর যাত্রাও বাস্তবধর্মীতা অতিক্রম করে বিমূর্তভাব প্রকাশের দিকে। সৈয়দ জাহাঙ্গীরও অন্যান্য সহগামীদের মতো নির্বস্ত্তকতার প্রতি আসক্ত হয়ে ওঠেন। বিমূর্ততার প্রাথমিক পর্যায়ে নুড়ি ও বরফির আকৃতি ক্যানভাসময় ছড়ানো, জীবনের ক্লান্তিহীন চলমানতার প্রতিচ্ছবি। পরবর্তী পর্যায়গুলি থেকে তাঁর চিত্রভাবনা হয়ে ওঠে অনেক বেশি দর্শন ভাবাপন্ন। কাজী আবদুল বাসেতের প্রথম পর্বের ছবিতে বিষয়বস্ত্ত গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন দিক; বিশেষত একক ও যুগল নারী। বিদেশ-প্রত্যাগত হয়ে আবদুল বাসেতও বিমূর্ত শৈলীতে চিত্রাঙ্কন শুরু করেন। তাঁর কাজ ক্রমশ অগ্রসর হয়েছে দৃশ্যমানতার আপাত-চিহ্নগুলি মুছে ফেলে প্রকৃতির একটি নির্বিশেষ রূপ নির্মাণের দিকে। পঞ্চাশের দশকের প্রধান শিল্পীদের পাশাপাশি নিয়মিত সৃজনশীল শিল্পনির্মাণে ব্রতী থেকেছেন নিতুন কুন্ডু, কাজী আবদুর রউফ, সৈয়দ শফিকুল হোসেন, শাহতাব, মুবিনুল আজিম, শামসুল ইসলাম নিজামী প্রমুখ। নিতুন কুন্ডু তৈলচিত্র, ছাপাই ছবি ও ভাস্কর্য নির্মাণে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

ষাটের দশকের অন্যতম শিল্পী আবু তাহের। বিমূর্তধর্মী চিত্রতলে বুনট, অাঁচড় বা বিক্ষত উচ্চাবচ জমিন তৈরি করে অনুভূতিকে প্রবলতর করবার প্রবণতা তাঁর চারিত্র্যলক্ষণ। সমরজিৎ রায়চৌধুরী বাংলাদেশের প্রকৃতি ও লোকজীবনের বিভিন্ন উপাদান ও মটিফ অবলম্বন করে চিত্রতলে গড়ে তোলেন একটি নকশাদার উপস্থাপনা।

রাজনীতি ও সমাজ-সচেতন হাশেম খান বাণিজ্যকলায়, বিশেষত পুস্তক প্রকাশন, প্রচ্ছদ ও অলংকরণ শিল্পে, অধিক পরিচিতি অর্জন করেন। তাঁর শিল্পকর্মে রয়েছে প্রতীক, অর্থ ও বক্তব্য। রফিকুন নবী পুস্তক অলংকরণ এবং কার্টুন শিল্পী হিসেবে অধিক পরিচিতি পেলেও ছাপচিত্রকলায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ লাভের পর তিনি বর্তমানে দেশের অন্যতম ছাপচিত্রী ও চিত্রকর হিসেবে স্বীকৃত। কিছুটা লৌকিক, কিছুটা জ্যামিতিক ছাঁদে বিষয়কে বিন্যস্ত করেন তিনি। বিমূর্ত বা আধাবিমূর্ত শৈলীর অন্যান্য শিল্পী দেলোয়ার হোসেন, গোলাম সারোয়ার, মোহাম্মদ মহসীন, আনোয়ারুল হক পিয়ারু প্রমুখ।

পলিমাটি

কোম্পানী শৈলী, ঢাকা
(চলমান)

লেখক পরিচিতি

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা