- কামরুল আহসান
বঙ্গবন্ধুর কথা মনে হলেই হিমালয় সমান এক ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি ভাসে চোখের সামনে। তাকে নিয়ে যারা লিখেছেন কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-বুদ্ধিজীবী-অধ্যাপক সবাই তার রাশভারী ব্যক্তিত্বটাকেই সামনে এনেছেন বেশি। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে তিনি বেশ রসিকও ছিলেন। ছিলেন শিশুর মতো সরল। যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি হাস্যপরিহাসের মধ্য দিয়ে হালকা করে ফেলতে পারতেন। লিখেছেন কামরুল আহসান
যেকোনো মানুষেরই নান্দনিক বোধের পরিচয় পাওয়া যায় তার রসবোধ থেকে। রসবোধ জীবনকে সহজ করে দেখার এক অকৃত্রিম জানালা। যার রসবোধ নেই, তাকে আর যাই হোক, সহজ মানুষ বলা যায় না। এদিক দিয়েও রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ এসে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের লেখার সঙ্গে যার পরিচয় আছে, তিনিই জানেন প্রতিটি লেখায় তিনি কতটা সূক্ষ্ম রসবোধের পরিচয় দিয়েছেন। ব্যক্তিজীবনেও তার কৌতুকপ্রিয়তা নিয়ে অনেক গালগল্প আছে। আশ্চর্য হয়ে যেতে হয় বঙ্গবন্ধুর রসবোধ দেখেও। তার অসংখ্য লেখায়, সরস মন্তব্যে, তাকে নিয়ে অন্যদের স্মৃতিচারণায় সেই রসিকজনের খোঁজ মেলে।
চীন দেখতে গিয়ে
বঙ্গবন্ধুর রসবোধের প্রধান পরিচয় পাওয়া যায় তার নিজের লেখা থেকেই। সম্প্রতি প্রকাশিত তার ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইটি পড়লে মনে হবে সৈয়দ মুজতবা আলীর কোনো ভ্রমণকাহিনী।
বিশিষ্ট লোক-সংস্কৃতি গবেষক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু যদি রাজনীতিবিদ না হয়ে শুধু লেখক হতেন, তাহলেও অনেক বড় লেখক হতে পারতেন।’ সত্যিই তার লেখনীর মধ্যে এমন জাদুও ছিল, যা তার যেকোনো ভাষণের মধ্যেই আছে। আমার দেখা নয়া চীনের প্রতি পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় সেই রসের ঝরনাধারা বহমান। যেমন- বইটির ৫১ পৃষ্ঠায় বর্ণনা দেন, তিনি পিকিং শহরে গেছেন দাড়ি কাটার ব্লেড কিনতে। কিন্তু কোথাও ব্লেড পেলেন না। তাই এক দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ভাই সমস্ত পিকিং শহরে একটা ব্লেড পেলাম না, কারণ কী?’ দোকানদার ভাঙা ভাঙা ইংরেজি জানে। তিনি মুজিবকে বললেন, ‘বিদেশ থেকে এসব জিনিস আমরা আনি না। আমাদের নিজেদের ঘরে ক্ষুর তৈরি হয়, তা দিয়েই শেভ করি। যে পর্যন্ত আমরা ব্লেড ফ্যাক্টরি করে নিজেরা তৈরি করতে না পারব, সে পর্যন্ত ব্লেড কেউই ব্যবহার করবে না। আমরা বিদেশকে কেন টাকা দেব?’ বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “দেশে বসে শুনতাম, চীন দেশ রাশিয়ার হুকুমে চলে। তবে রাশিয়ার কোনো ‘ব্যবহারিক দ্রব্য’ ইংরেজিতে ‘কনজ্যুমার গুডস’ এ দেশে পাওয়া যায় না। কোনো জাপানি পুতুল নেই। আমেরিকার স্নো, পাউডার, ব্লেড, দাঁতের মাজন কিছু নেই। ভারতের কাপড়, ইংরেজের ব্লেড, কলম, সুইজারল্যান্ডের ঘড়ি, কিছুই এ দেশে নেই।” এরপরই তিনি শ্লেষমাখানো রসিকতার সুরে লিখেছেন, ‘ভাবলাম বেরসিক দেশ। আমার দেশে সব পাওয়া যায়। আমেরিকা, ইংরেজ, জাপানি সব পাওয়া যায়।’ (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫১)
শেখ মুজিব চীন গিয়েছিলেন ১৯৫২ সালে। তখন তার বয়স ৩২ বছর। তরুণ নেতা। তারুণ্যের কৌতূহল নিয়েই তিনি চীন পরিভ্রমণ করছেন। চীনের মানুষের সততা পরীক্ষার জন্য এক দিন হোটেলে ফেরার পথে রিকশাওয়ালাকে দশ টাকা দিলেন। তিনি ভাড়া জানেন না, রিকশাওয়ালাও ইংরেজি জানে না। বঙ্গবন্ধু আন্দাজেই টাকাটা তুলে দিয়েছেন দেখার জন্য যে, রিকশাওয়ালা কত নেয়। রিকশাওয়ালা তার হাত থেকে ঠিক আট আনা পয়সা গুনে নিয়ে চলে গেল। বঙ্গবন্ধু হোটেলে ফিরে দোভাষীকে ডেকে বললেন, ‘তোমাদের দেশের রিকশাওয়ালা তো চোর।’ এ কথা শুনে দোভাষীর চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। তখন বঙ্গবন্ধু হেসে আসল ঘটনা খুলে বললেন। জানতে চাইলেন, “তোমরা কী করে এদের চরিত্রের পরিবর্তন এত তাড়াতাড়ি করতে পারলে? তখন সে হেসে হেসে বলতে লাগলেন- দেখো এদের ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ আছে। এরা যা উপার্জন করে, যতটুকু এদের দরকার, তা রেখে যতটুকু সম্ভব ইউনিয়নে জমা দেয়। সেই টাকা দিয়ে ওদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, ওদের জন্য থাকার বাড়ি, রিকশা মেরামত, চিকিৎসার বন্দোবস্ত ও অন্যান্য কাজ করে দেওয়া হয়। আমি বললাম, ‘কড়া শাসনও বোধ হয় করা হয়?’ দোভাষীটা ছেলে মানুষ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়ে। হঠাৎ হেসে দিয়ে বলল, আপনারা বোধ হয় শুনেছেন আমাদের সরকার খুব অত্যাচার করে এবং বেশি শাস্তি হয়। সে বলল, কথাটা কিছু সত্য। যখন ওদের কেউ ঠকাতে পারবে না, খাওয়া থাকার বন্দোবস্ত করে দেওয়া হচ্ছে, ভালো ভালো থাকার বাড়ি করে দেওয়া হচ্ছে, তখন যদি ওরা কাউকে ধোঁকা দিয়ে অথবা ফাঁকি দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে চেষ্টা করে, তবে কেন ভীষণ শাস্তি দেওয়া হবে না?” (ঐ-৪৮-৪৯)
শিশুতোষ পরিব্রাজক মন
শিশুদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নিবিড় বন্ধুত্বের কথা আমরা সবাই জানি। তিনি কতটা শিশুর মতে সরল ছিলেন তাও জানা যায় ওই চীন দেশের একটি ঘটনা থেকে। দলে-বলে বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে গিয়ে তিনি শিশুদের সঙ্গে মেতে উঠেছিলেন দুষ্টুমি আর হাসিখেলায়। ছোট ছেলেমেয়েরা তাকে জড়িয়ে ধরল। কারণ, তিনি ওদের সঙ্গে একটু ঠাট্টা করেছিলেন। মুখ ভেংচে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “ওরা মনে করল, ‘পেয়েছি মনের মতো লোক’। তাই আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি ওদের সঙ্গে কিছু খেলা করে রওনা হলাম। আমার বন্ধু-বান্ধবরা আগেই গাড়িতে উঠে বসে রয়েছে। মনে মনে বিরক্ত হলো বলে আমার মনে হলো। কিন্তু কী করব? ছোট ছেলেমেয়েদের আনন্দময় সঙ্গ যেন হুট করে ছেড়ে আসা যায় না, আর আমার স্বভাবও সে রকম না। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মিশতে আমি ভালোবাসি।” (ঐ-৬৮)
দারুণ পরিব্রাজক এক মনও ছিল তার। চলার আনন্দেই যেন তিনি চলতেন। চীনের এক সেলুনে চুল কাটতে গেলে নানা কথার পর সেলুনওয়ালা যখন তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন, তিনি হেসে বললেন, “এমনি ঘুরে বেড়াই, দেশ-বিদেশ দেখি। মনে মনে বলি, ‘আমার আবার পরিচয়? পথে পথে ঘুরে বেড়াই, বক্তৃতা করে বেড়াই। আর মাঝে মাঝে সরকারের দয়ায় জেলখানায় পড়ে খোদা ও রাসুলের নাম নেওয়ার সুযোগ পাই। এই তো পরিচয়।” (ঐ-৭৩)
কল্পনা করা যায়, কতটা রসবোধসম্পন্ন মানুষ হলে নিজেকে এমন সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেন! তখনো দুঃখ-দুর্দশা এতটা লাগেনি গায়ে। এরপর তো আরও দায়িত্ব চাপল মাথায়।
কারাগারের দিনগুলোতে
প্রতিরোধ-সংগ্রামই হয়ে উঠল জীবন। জেলই হলো সার্বক্ষণিক সঙ্গী। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, জেলখানায় বসেও নানা দুরবস্থার মধ্যেও রসিকতা করতে ভোলেননি বঙ্গবন্ধু। যেমন কারাগারের রোজনামচায় এক জায়গায় লিখছেন, ‘ভুঁড়ি হতে চলেছে আমার বসে থাকতে থাকতে। ভীষণ খারাপ লাগে ভুঁড়ি হলে।’ একটু শুনে অনেকে হয়তো হাসবেন, তার মতো মানুষ ভুঁড়ি নিয়ে ভাবছেন।
এরপরের বাক্যতেই তিনি লিখেছেন, ‘ব্যায়াম করবার উপায় নাই, হাঁটুতে বেদনা। বিকেলে হাঁটাচলা করি, একলা কত সময় হাঁটা যায়! ভালো লাগে না, তাই আবার চুপ করে বসে থাকি।’ (কারাগারের রোজনামচা-১৬৬)।
কিছু রসিকতা আছে রান্না নিয়েও। কারাগারে থাকার সময় মাঝে মাঝে তিনি রান্না করে খেতেন। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় লিখেছেন, “আজ আমি বাবুর্চগিরি করেছি, কলিজা দিয়েছিল, পাকাতে হবে। আমি ও বাবুর্চি দুজনেই প্রায় সমান। ‘কেহ কারে নাহি পারে সমানে সমান’। তবু ধারণা করে নিয়ে পাকালাম। মনে হলো মন্দ হয় নাই।” (ঐ-১৬৭)।
আরেক জায়গায় লিখেছেন, “আজ ফলি মাছ দিয়েছে। বাবুর্চি বলল, কোপ্তা করতে হবে। বাবুর্চি জানে না, কেমন করে করতে হয়, আমিও জানি না। তবু করতে হবে। বললাম, বোধ হয় এভাবে করতে হয়। বাবুর্চি ও আমি পরামর্শ করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করলাম। সেভাবেই করা হলো। যখন খেতে শুরু করলাম মনে হলো কোপ্তা তো হয় নাই, তবে একটা নতুন পদ হয়েছে। কী আর করা যায়, চুপ করে খেয়ে নিলাম। বললাম, ‘বাবারা, বাড়িতে যে রকম খাই তার ধারেকাছ দিয়েও যায় নাই। যাহা হোক খেয়ে ফেল, ফলি মাছ তো!’ মনে মনে হাসলাম, পাস করা বাবুর্চি আমি! ভাগ্য ভালো, বাইরের লোক ছিল না, থাকলে কোপ্তা আমার মাথায় ঢালত। এই সময় মনে হলো একলা হয়ে সুবিধাই হয়েছে।”
‘কারাগারের রোজনামাচা’য় আরেকটা মজার ঘটনা লিখেছেনÑ ১৯৬৬ সালের ২০ জুন। কারাগারে থাকার সময় বঙ্গবন্ধু ফুলবাগান করতেন। একদিন হই হই শব্দ শুনে গিয়ে দেখেন বাগানের এক অংশের কিছু মাটি ধসে পড়েছে। ভেতরে অনেক দূর দেখা যায়। জেলখানার এই জায়গাটি শায়েস্তা খানের আমলে লালবাগ কেল্লার অংশ ছিল। খবর পেয়ে জেলার সাহেবে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু তাকে হাসতে হাসতে বললেন, ‘এই গর্তের মধ্যে টাকাপয়সা, সোনা-রুপা পাওয়া যেতে পারে। অনেকেই গম্ভীর হয়ে শুনল। অনেকে বিশ্বাস করতেও আরম্ভ করল। জেলার সাহেব জেলের ডিআইজি সাহেবকেও খবর দিলেন। এটা বন্ধ করা চলবে না, যে পর্যন্ত এটিকে ভালো করে না দেখা হবে।’ (ঐ-১০৯)
১৭ মার্চ, ১৯৬৭ সালে ছিল বঙ্গবন্ধুর ৪৭তম জন্মদিন। এদিনও তিনি জেলে। অপ্রত্যাশিতভাবেই হঠাৎ করে বিকেলবেলা ছেলেমেয়েদের নিয়ে জেলগেটে তাকে দেখতে এসেছিলেন স্ত্রী রেণু। অপ্রত্যাশিত এজন্য যে দুদিন আগেই ফজিলাতুন্নেছা এসেছিলেন, এখন আবার অনুমতি পাবেন কি না সেটা নিয়েই ছিল সন্দেহ। ‘পাঁচটা বেজে গেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে জমাদার সাহেবে এসে বললেন, চলুন আপনার বেগম সাহেবরা ও ছেলেমেয়েরা এসেছে।’ এই আনন্দ বেশি ছিল না জেলখানায় তার। বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে দুঃখ-কষ্ট, নিঃসঙ্গতায়। কখনো অসুস্থতায় শরীর ভেঙে গেছে। তার পরও তিনি প্রবল মনোবল অক্ষুণ্ণ রেখেছেন।
কাকের কাছে হেরে যাওয়া
ছোটখাটো রসিকতার মধ্য দিয়ে জীবনের ক্লেদ ও বিষণ্ণতা মুছতে চেয়েছেন শেখ মুজিব। কল্পনা করা যায়, এত বড় একজন মানুষ কারাগারে থাকার সময় কাকের সঙ্গেও লড়াই করেছেন! কারাগারের রোজনামচার ২১৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘কাকের কাছে আমি পরাজিত হয়েছি। আমার সামনের আমগাছ কটাতে কাক বাসা করতে আরম্ভ করে। আমি বাসা করতে দেব না ওদের। কারণ ওরা পায়খানা করে আমার বাগান নষ্ট করে আর ভীষণভাবে চিৎকার করে। আমার শান্তি ভঙ্গ হয়। আমি একটা বাঁশের ধনুক তৈরি করে মাটি দিয়ে গুলি তৈরি করে নিয়েছি। ধনুক মেরেও যখন কুলোতে পারলাম না, তখন আমার বাগানী কাদের মিয়াকে দিয়ে বারবার বাসা ভেঙে ফেলি। বারবারই ওরা বাসা করে। লোহার তার কি সুন্দরভাবে গাছের সঙ্গে পেঁচাইয়া ওরা বাসা করে। মনে হয় ওরা এক এক দক্ষ কারিগর, কোথা থেকে সব উপকরণ জোগাড় করে আনে আল্লাহ জানে! পাঁচটা আমগাছ থেকে পাঁচ-সাতবার করে বাসা ভেঙে ফেলি, আর ওরা আবার তৈরি করে। ওদের ধৈর্য ও অধ্যবসায় দেখে মনে মনে ওদের সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হই। তিনটা গাছ ওদের ছেড়ে দিলামÑ ওরা বাসা করল। আর একটা গাছ ওরা জবর দখল করে নিল।’ আমি কাদেরকে বললাম, ‘ছেড়ে দেও। করুক ওরা বাসা। দিক ওরা ডিম। এখন ওদের ডিম দেওয়ার সময় যাবে কোথায়?’
‘এই সমস্ত বাসা ভাঙবার সময় আমি নিজে ধনুক নিয়ে দাঁড়াতাম আর গুলি ছুড়তাম। ভয় পেয়ে একটু দূরে যেয়ে চিৎকার করে আরও কিছু সঙ্গী-সাথী জোগাড় করে কাদেরকে গাছেই আক্রমণ করত। দু-একদিন শত শত কাক জোগাড় করে প্রতিবাদ করত। ওদের এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদকে আমি মনে মনে প্রশংসা করলাম। বাঙালিদের চেয়েও ওদের একতা বেশি।’
নিজের গণ্ডির ভেতরে যখন
শ্লেষ ও কৌতুক মেশানো এমন সুন্দর প্রতীকী উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে নিজের ক্ষোভ-বিক্ষোভও ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর রঙ্গরসের পরিচয় দিয়েছেন তার কাছের মানুষরাও। যেমন প্রখ্যাত সাংবাদিক এ বি এম মূসা। ‘মুজিব ভাই’ বইয়ে এ বি এম মূসা একটা অধ্যায়ের নামই রেখেছেন ‘রঙ্গরসে বঙ্গবন্ধু’। একান্ত অন্তরঙ্গ আড্ডায় বঙ্গবন্ধু কীভাবে হয়ে পড়তেন দিলখোলা প্রাণমাতানো রঙ্গরসে ভরপুর, তারই কিছু ঘটনা উল্লেখ করেছেন এ বি এম মূসা। তাদের তিন বন্ধু আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ফয়েজ আহমেদ আর এ বি এম মূসাকে বঙ্গবন্ধু নাম দিয়েছিলেন- আপদ, বিপদ ও মুসিবত। তাদের তিনজনকে একসঙ্গে দেখলেই বলতেন, এই যে আইসা পড়ছে আপদ-বিপদ-মুসিবত! কী না জানি কী ঘটায় এখন!
এ বি এম মূসার ‘মুজিব ভাই’ গ্রন্থ থেকে একটি মজার ঘটনার বিবরণ দেওয়া যাক ‘নিজের মন্ত্রীদের নিয়ে মাঝেমধ্যেই রসিকতা করতেন বঙ্গবন্ধু। দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু ১১ জানুয়ারি সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেন। এরপর বিকেলবেলা সংবাদ সম্মেলন করার পর যথারীতি আমাদের সঙ্গে সান্ধ্য আড্ডায় বসলেন। তখনো মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন হয়নি। এ নিয়ে আমরা একটুখানি কৌতূহল প্রকাশ করায় তিনি কৃত্রিম গম্ভীরতার সঙ্গে জানালেন, সব এখন বলব না, একটু পরই জানতে পারবা। উপযুক্ত ব্যক্তিকেই যথাযথ দায়িত্ব দিয়েছি। তবে একটা দপ্তর নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। অনেক ভেবেচিন্তে সেটা জহুরের কাঁধে চাপালাম। দপ্তরটি হচ্ছে স্বাস্থ্য ও জন্মনিয়ন্ত্রণ (পরবর্তীকালে পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়)। ভেবে দেখলাম, আমার মতো সারা জীবন জেল খাইটা তার শরীরডা খ্যাংরা কাঠির মতো হইয়া গেছে। সব ডাক্তারকে সে মাইনসের স্বাস্থ্য ভালো করার তাগিদ দিতে পারব। সে আবার দুই বউয়ের ১৪টি বাচ্চা নিয়ে হিমশিম খাইতাছে। বেশি বাচ্চা হওয়ার জ্বালা সে-ই ভালো বোঝে। তাই তারে জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিয়েছি।’ (মুজিব ভাই, পৃষ্ঠা-৩০-৩১)
সংগৃহিত


