চিত্রকলা বাংলায় চিত্রকলার প্রাচীনত্ব নির্ণয় বেশ দুরূহ। তবে প্রাপ্ত নিদর্শনের বিবেচনায় বাংলার প্রাচীনতম চিত্রকলার নিদর্শন পাল-আমলে (৭৫০-১১৬২ খ্রি.) রাজা মহীপাল দেব (৯৯৩-১০৪৩ খ্রি.)-এর সময়ে তালপাতায় অঙ্কিত নালন্দা মহাবিহারের ‘বৌদ্ধ-অনুচিত্র’। অঙ্কনশৈলীর বিচারে এ চিত্রকলা সর্বভারতীয় ধ্রুপদী চিত্রকলার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন পশ্চিম ভারতের ‘অজন্তা-দেয়ালচিত্রের’ সমগোত্রীয়। সঙ্গতকারণে এ বৌদ্ধ-অনুচিত্রগুলি বাংলার চিত্রকলার সর্বপ্রাচীন বা প্রাথমিক পরিচয় নয়। ওই সময়ের পূর্বে এ অঞ্চলে চিত্রচর্চার ঐতিহ্য বজায় ছিল।
বঙ্গীয় অঞ্চলে মানবসভ্যতার প্রাচীনতম নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ‘পান্ডুরাজার ঢিবিতে’। প্রাচীন যুগের মানুষের চিত্রাংকন দক্ষতার সর্বপ্রাচীন নিদর্শন পান্ডুরাজার ঢিবিতে পাওয়া মৃৎপাত্রের গায়ে অাঁকা নানা নক্সাধর্মী অলঙ্করণ। আদি মৃৎশিল্পী শুধুমাত্র বিমূর্ত বা অর্ধবিমূর্ত নক্সাই অঙ্কন করেনি, মৎস্য বা পাখির রেখাচিত্রও অঙ্কন করেছিল। এ চিত্রে অঙ্কন শিল্পীর দক্ষতা নয়, স্বতস্ফূর্ততাই লক্ষণীয়। উল্লেখ্য, পান্ডুরাজার ঢিবির মৃৎপাত্র অলঙ্করণে কোনো পশু বা মনুষ্যমূর্তির অনুপস্থিতি বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। অথচ সমসাময়িক সিন্ধু সভ্যতার মৃৎপাত্রে ওইসব বস্ত্তর উপস্থিতি দেখা যায়।
পালপূর্ব আমলের প্রাচীন বাংলার ইতিহাস যেমন অস্পষ্ট, ওই সময়ের শিল্পকলাও বিচ্ছিন্ন এবং বিক্ষিপ্ত। বাংলাদেশের বগুড়া অঞ্চলে মহাস্থানের প্রাচীন ‘পুন্ড্রনগর’-এ প্রাপ্ত মৌর্যযুগের (খ্রি.পূর্ব ৩২২-১৮৫) এবং ‘চন্দ্রকেতুগড়’-এ আবিষ্কৃত সুঙ্গ যুগের (খ্রি.পূর্ব ১৮৫-৭১) টেরাকোটা ফলকচিত্রগুলি এবং ময়নামতির গুপ্ত পরবর্তী (৬ষ্ঠ-৭ম খ্রি.) ও পাহাড়পুরের প্রাথমিক পালযুগের (৮ম-৯ম খ্রি.) পোড়ামাটির ফলকগুলি বিবেচনা করা চলে। ‘রিলিফ’ পদ্ধতিতে নির্মিত বলে ফলকচিত্রগুলিতে এক ধরনের স্বাভাবিক চিত্রধর্মীতা বর্তমান। উল্লিখিত পোড়ামাটির ফলকগুলিতে ফুলপাতা থেকে শুরু করে পশুপাখি, নরনারী, দেবদেবী এবং কাল্পনিক গল্পগাথাও রূপায়িত হয়েছিল। স্থানীয় লোকশিল্পীদের এ শিল্পকর্ম রাজশিল্পের দৃষ্টিতে উচ্চশিল্পবোধসম্পন্ন না হলেও এতে বাংলার লোকজীবনের বলিষ্ঠ প্রকাশভঙ্গী প্রতিফলিত হয়েছে। এ টেরাকোটা ফলকগুলির মাধ্যমে পালপূর্ব বাংলার অজ্ঞাত চিত্রকলা সম্পর্কে অনুমান করা চলে। তবে ঐতিহ্যগত ভারতশিল্প মূলত ‘সমবায়িকশিল্প’ (যৌথশ্রমে নির্মিত শিল্পকলা)।
বাংলার চিত্রকলার সর্বপ্রাচীন প্রামাণিক নিদর্শন পাল আমলের তালপাতার পুথিতে এবং কাঠের প্রচ্ছদে অঙ্কিত বৌদ্ধ ধর্মের অনুচিত্রগুলি যা ভারতশিল্পের ইতিহাসে ‘পালচিত্র’ নামে পরিচিত। এ চিত্র সম্পর্কে প্রথম কথা হচ্ছে, পুথির লেখার সঙ্গে চিত্রায়িত হলেও এগুলি বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এখানে বুদ্ধ এবং অন্যান্য বৌদ্ধ দেবদেবীর প্রতিমূর্তিগুলি মূলত পুথিকে দৈবগুণসম্পন্ন করার প্রয়োজনে অঙ্কিত হয়েছিল। পালচিত্রের মাধ্যমে ভারতবর্ষে ‘মিনিয়েচার’ বা অনুচিত্র যুগের সূচনা। অবশ্য ক্ষুদ্রাকার হলেও পাল পুথিচিত্রকে প্রকৃত মিনিয়েচার বলা সঙ্গত নয়। কারণ অনুচিত্রের মূল চরিত্র বিষয়ের সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম অঙ্কন ও অলঙ্করণ। অথচ পালচিত্রে এ গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যই অনুপস্থিত। ক্ষুদ্রাকার এ চিত্রে ‘ম্যুরাল’ বা দেয়ালচিত্রের চরিত্র দৃশ্যমান। ‘গোয়াস’ মাধ্যমে অঙ্কিত পালচিত্রের আঙ্গিক প্রধানত রৈখিক হলেও তা আলঙ্কারিক নয়। কারণ চিত্রী ব্যবহূত রেখাকে একই সঙ্গে মোটা, সরু কিংবা হাল্কাভাবে প্রয়োগ করে বিষয়বস্ত্ততে ঢৌলাভাস সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে ‘মডেলিং’ তৈরির জন্য রঙের সঙ্গে সাদা বর্ণের মিশ্রণও লক্ষণীয়। উল্লেখ্য, ভারতবর্ষে চিত্রকলা শিল্প ধ্রুপদী চরিত্র অর্জন করেছিল গুপ্তযুগের (৩২০-৫৭৫ খ্রি.) চূড়ান্ত পর্বে। যার সর্বোত্তম নিদর্শন পশ্চিম ভারতীয় ‘অজন্তা দেয়ালচিত্র’। অবশ্য দশম শতকের শেষ পর্যায় থেকে পাল চিত্রকলার প্রচুর নিদর্শন পাওয়া যায় এবং দ্বাদশ শতকে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার কিছুকাল পরও তা অব্যাহত ছিল। তবে ওই সময়ে মুসলিম সুলতানদের দরবারে ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ধারার চিত্রকলার আবির্ভাব ঘটে। সুলতানী দরবারের চিত্রশৈলী সর্বাংশে ঐতিহ্যগত পারস্য চিত্রকলার ‘সাফাভী চিত্ররীতি’ দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল।
হোসেন শাহী বাংলায় (১৪৯৪-১৫৩৮) নবদ্বীপের চৈতন্যদেব (১৪৮৫-১৫৩৩) প্রভাবিত যে নতুন সংস্কৃতির উত্থান ঘটে, এর অনুপ্রেরণায় সতের ও আঠার শতকের প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত বিষ্ণুপুর ও অন্যান্য জায়গায় বাংলার এক নিজস্ব চিত্রকলা বিকাশ লাভ করে। এ ধারার অন্যতম চিত্রাঙ্গিক কাগজে অাঁকা ‘জড়ানোপট’ এবং পুথির প্রচ্ছদ হিসেবে ব্যবহূত কাঠের উপরে অঙ্কিত ‘পাটাচিত্র’। বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে ভক্তিমূলক কাহিনীধর্মী এ চিত্র উজ্জল রঙে সুঢৌল রেখায় অঙ্কিত। পাটাচিত্রের অবক্ষয়ী রূপ দৃষ্টিগোচর। এ চিত্রকলায় একই সঙ্গে অনুচিত্রের অনুপুঙ্খ,
দেয়ালচিত্রের প্রসারতা এবং আবহমান বাংলার লোকায়ত পটচিত্রের অনেক বৈশিষ্ট্য প্রকটভাবে উপস্থিত।
আলীবর্দী খানের আমলে (১৭৪০-১৭৫০) মুগল চিত্রশৈলী প্রভাবিত ‘মুর্শিদাবাদ চিত্ররীতি’ নামে একটি স্বতন্ত্র চিত্রকলার জন্ম হয়েছিল। সুশৃঙ্খল ও সংযত অঙ্কনশৈলী এবং শীতলাভ ছায়াচ্ছন্ন বর্ণের প্রাধান্যে চিত্রিত এ চিত্রকলায় মুগল শৈলী ছাড়াও রাজপুতনা-চিত্র এবং বাংলার পটচিত্রের সম্মিলন ঘটেছিল। মুর্শিদাবাদ এবং পরে কলকাতায় স্থানীয় শিল্পীরা ভারতীয় জনজীবন ও প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলির যে বাস্তবধর্মী চিত্রাঙ্কন করেন, তা ‘কোম্পানিচিত্র’ নামে পরিচিত যা কোম্পানি শাসনের অবসানের কিছুকাল পরও টিকে ছিল।
উপনিবেশিক অর্থনীতির সহায়ক শক্তি হিসেবে স্থানীয় শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষে এখানে পাশ্চাত্যের অনুকরণে ‘আর্ট-স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভারতীয় শিল্পীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ঐতিহ্য ছিল না, শিল্পকলা ছিল বংশানুক্রমিক কৌলিক শিক্ষার অংশ। ভারতে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার প্রবর্তনের মাধ্যমে ভারতশিল্পে বৈশিষ্ট্যগত এবং শিল্পীদের ক্ষেত্রে শ্রেণীগত পালাবদলের সূচনা ঘটে। এভাবে বাংলা তথা ভারতবর্ষের শিল্পকলার ইতিহাসে প্রাচীন ও মধ্যযুগের অবসান এবং আধুনিকতার সূত্রপাত হয়। [ফয়েজুল আজিম]
দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে যেসব শিল্পী চারুশিল্পের চর্চা সূচিত করেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সৃজনশীল শিল্পী হিসেবে সফিউদ্দিন আহমেদ, কামরুল হাসান ও শেখ মোহাম্মদ সুলতান। চল্লিশের দশকের শিল্পীদের সাধারণ ঐক্যসূত্রটি স্বদেশের প্রকৃতি ও জনজীবনকে শিল্পে প্রতিবিম্বিত করার প্রয়াসের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়।
আধুনিকযুগে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন শিল্পচর্চার পথিকৃৎ। ১৯৪৩-এর বাংলার মন্বন্তর-ভিত্তিক চিত্রমালা তাঁকে ভারতব্যাপী খ্যাতি এনে দেয় এবং এক সকরুণ মানব-ট্র্যাজেডির তাৎক্ষণিক, সহানুভূতিপূর্ণ ও সবল রূপায়ন হিসেবে এগুলি বহির্বিশ্বেও শিল্পরসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দুর্ভিক্ষের স্কেচে, কেবল তুলির কালো রেখায় যার সূচনা, সেটাকে বর্ণপ্রয়োগের ন্যূনতায় ও স্পেস ব্যবহারের পরিমিতিবোধে তিনি ক্রমশ এক নিজস্ব শৈলীতে রূপান্তরিত করেন। তাঁর এপর্যায়ের ছবিগুলো- ‘বিদ্রোহী’, ‘মই দেওয়া’, ‘সাঁওতাল যুগল’ ‘সংগ্রাম’ এবং লোকশৈলীর মটিফে জ্যামিতিক বিন্যাসে সন্নিবেশিত চিত্র- ‘পাইন্যার মা’, ‘প্রসাধন’, ‘গুণটানা’ প্রভৃতি।
তাঁর দুটি উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অাঁকা স্ক্রলচিত্র ‘নবান্ন’ এবং সত্তরের ভয়াবহ ঘুর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত মানুষের অসহায়তাকে অবলম্বন করে চিত্রিত ‘মনপুরা ৭০’।
এ দশকের অন্যতম শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ, একইসঙ্গে চিত্রকর এবং ছাপচিত্রশিল্পী হিসেবে সৃজনশীলতায় ও উৎকর্ষে বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছেন। ‘বনের পথে’, ‘সাঁওতাল বালা’, ‘ঘরে ফেরা’ তাঁর প্রাথমিক পর্বের উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম। পরে জল, মাছ ও নৌকা এবং প্রতীকায়িত চোখ তাঁর শিল্পকর্মের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। ক্রমশ তিনি আঙ্গিকের আধাবিমূর্ত জ্যামিতিকায়নের দিকে ঝুঁকেছেন এবং বাঙালির লোককলার নানা মটিফকে তিনি চিত্রতলে সম্পৃক্ত করাতেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
কামরুল হাসান অতি অল্প বয়সেই গুরুসদয় দত্ত প্রতিষ্ঠিত ব্রতচারী আন্দোলনে যোগ দেন এবং শিল্পীর সমগ্র জীবনে এর এক ব্যাপক প্রভাব লক্ষ করা যায়। লোকজ চিত্রকলা, পুতুল, ভাস্কর্য, কারুকলা ইত্যাদির প্রতি তাঁর আগ্রহ ও শিল্পচর্চায় এদের অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহারে এ প্রভাব লক্ষণীয়। প্রথমদিকে তাঁর ছবিতে নারীদেহ পুতুলের মত ভরাট, গ্রীবা দীর্ঘ ও চোখ-নাক লৌকিক আদলে আবদ্ধ। ‘তিনকন্যা’, ‘গুনটানা’ এ রীতির কাজ। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং সামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রামের রূপ তাঁর চিত্রকলায় প্রবলভাবে প্রতিফলিত হয়। এ সময়ে তাঁর অাঁকা জনপ্রিয় পোস্টার ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’। স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন পর্যায়ের স্বপ্নভঙ্গ ও হতাশা তাঁর চিত্রকর্মে নানা প্রতীকে রূপায়িত হয়েছে।
শেখ মোহাম্মদ সুলতান জীবনযাপনে এবং আচার-আচরণে যেমন, তেমনই শিল্পচরিত্রে ও শিল্পভাবনায়ও তাঁর স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন। তাঁর পেশীবহুল অতিকায় মানব-মানবী একই সঙ্গে মৃত্তিকা-সম্পৃক্ততা ও অপারাজিত মানবসত্তার প্রতীক। চারা রোপণ, ভূমিকর্ষণ, মাছধরা, ফসল তোলা প্রভৃতি চিরকালীন গ্রামীণ দৃশ্যের গতানুগতিকতাকে তিনি মোচন করেন অতিরঞ্জিত মানবশরীরের তেজীয়ান মনোভঙ্গী দ্বারা। (চলমান)





