রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

কেয়া চ্যাটার্জীর অনুগল্প ‘স্বার্থপর’

সমুদ্রতটে লোনা হাওয়ায় চুল উড়িয়ে বালিয়াড়িতে পায়ের ছাপ রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল মধুরিমা। স্বামী শুভময় আমেরিকা থেকে ফেরার পর সপরিবারে ঘুরতে এসেছে শংকরপুর। হঠাৎ তার সামনে এসে দাঁড়াল একটি পুরুষ। বয়সে তার থেকে সামান্য বড়ই হবে। উত্তাল হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তার চুল। তার চোখে বিস্ময় মাখা আনন্দ। একদৃষ্টে সে তাকিয়ে আছে মধুরিমার দিকে। মধুরিমা কি চিনতে পারছে ছেলেটিকে? সে বলে উঠল, ‘মধু আমায় চিনতে পারছ? আমি রাতুল। দার্জিলিং থেকে কলকাতা ফিরে তোমায় কত খুঁজেছি। ফোন নম্বর ছাড়া তো আর কিছুই ছিল না। সেটাও বদলে গেছে। এত বড় শহরে তোমায় হন্যে হয়ে খুঁজে গেছি। আজ কেমন পেয়ে গেলাম দেখো।’

মধুরিমার পাশে এসে দাঁড়ায় শুভময়, ‘কী ব্যাপার? ও কে মধু?’ পায়ে-পায়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মধুরিমার বাবা, মা, শ্বশুর, শাশুড়ি। সে বলে, ‘আমি ওকে চিনি না।’ ছেলেটি সবিস্ময়ে বলে ওঠে, ‘চেনো না? তুমি ভুলে গেলে, তোমার বাবাকে আমি কথা দিয়েছিলাম যত দিন না নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব তত দিন তোমার সঙ্গে দেখা করব না। তুমিও তো অপেক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে মধু। স্যার আপনি ভুলে গেলেন?’ মধুরিমা ছেলেটির কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ফিরে আসে গাড়িতে। শুভময়ও তাকে শাসিয়ে গাড়িতে এসে বসে। যত্তসব ঝামেলা। ছেলেটিকে পাস কাটিয়ে এগিয়ে যায় দুটি গাড়ি। ছেলেটি ঘৃণাভরে মধুরিমার দিকে তাকিয়ে আবার মুখ ফিরিয়ে নেয়।

লাঞ্চের জন্য একটা হোটেলে দাঁড়ায় ওরা। মধুরিমা ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশ রুমে ঢোকে। ঝাপসা চোখে হ্যান্ডব্যাগ থেকে বের করে একটা ছবি। এক জোড়া কিশোর-কিশোরী। রাতুল আর মধুরিমা। ব্যাকগ্রাউন্ডে দার্জিলিংয়ের চা বাগান। মধুরিমার ব্যবসায়ী বাবা জানতেন কিশোর মনকে কীভাবে সামাল দিতে হয়। তাই রাতুলের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মেয়েকে নিয়ে আসেন কলকাতায়। তারপর ১৫ বছরের প্রবাহে জীবন গেছে পাল্টে। মধুরিমাও মেনে চলেছে বাবার দেওয়া শর্ত, রাতুলের হাত অথবা রাতুলের জীবন। ছবিটা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলে ফ্লাশ করে দিল মধু। এত বছর পর রাতুলের ঘৃণার দৃষ্টিই হোক তার জীবনের রসদ। শর্ত সাপেক্ষ জীবন দানের পরিবর্তে রাতুল আজীবন মধুরিমাকে স্বার্থপর হিসেবেই মনে রাখুক।

লেখক পরিচিতি

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা