ভুল প্রাপক
লাঠির ঠকঠক শব্দটা ব্যাংকের মেঝেতে নয়, যেন সময়ের বুকেই পড়ছিল। জুলাইয়ের দুপুরের ভিড়ে ব্যাংকের থানা শাখায় টোকেন নম্বরের ডাক, নোট গোনার খসখস শব্দ, মানুষের ব্যস্ততা। সেই ভিড় চিরে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে এক বৃদ্ধ ঢুকলেন। ঘামে ভেজা কপাল। হাঁপ ধরা বুক।
বৃদ্ধ কাউন্টারের সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, — বাবা, আমার ছেলেটা বিদেশে থাকে। মেসেজে লিখেছে, “বিশ হাজার টাকা পাঠিয়েছি। আগে ডাক্তার দেখাবেন, তারপর ফল কিনে খাবেন।” তাই টাকা তুলতে এসেছি।
পিওনকে ইশারা দিয়ে আমি তাঁকে বসালাম।
—চাচা, কাউকে সঙ্গে আনেননি?
তিনি মৃদু হেসে বললেন, — বুড়ো মানুষের সঙ্গী হয় লাঠি, মানুষ না।
কথাটা শুনে আর কিছু বলার ছিল না। ইতিমধ্যে
পিন নম্বর মিলিয়ে সহকর্মী ফিরে এলো।
— স্যার, টাকা আছে। কিন্তু নামটা উনার নয়।
আমি নিজেই আবার যাচাই করলাম। ভুল নেই। শুধু প্রাপকের নাম অন্য একজন। বৃদ্ধের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, — এই নামটা কি আপনার পরিচিত?
তিনি নামটা শুনলেন। যেন ভেতর থেকে আলো নিভে গেল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
— না..। তবে ভুলটা আমার ছেলে করেনি, করেছে ভাগ্য।
কথাটা বলে তিনি চোখ নামিয়ে ফেললেন। দুটি অশ্রুবিন্দু তাঁর লুঙ্গি ছুঁয়ে মেঝেতে পড়ল। সেই অশ্রুবিন্দু পরিবেশটা অন্য রকম করে দিল।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
— থাক স্যার। ছেলেকে ফোন দেব না। ও ভাবুক, আমি টাকা পেয়েছি। বিদেশে ও সুখেই আছে। আমার কষ্টের খবর জেনে লাভ কী!
লাঠি ঠুকতে ঠুকতে তিনি দরজার ওপারে মিলিয়ে গেলেন। বাইরে বেরিয়ে যেতে যেতে দেখলাম,লাঠির শব্দের চেয়ে ভারী ছিল তাঁর নীরবতা।
এর ঘণ্টা দেড়েক পর আরেকজন এলেন। সব তথ্য মিলল। টাকা হাতে নিয়ে তিনি উজ্জ্বল মুখে বললেন, — আমার জামাই পাঠিয়েছে। কয়েক মাস পরপর জোর করে টাকা পাঠায়। বলে, “আব্বা, শরীরের যত্ন নেবেন।” আল্লাহ এমন জামাই সবার ঘরে দিক।
লোকটি চলে গেলেন আনন্দ নিয়ে।
আমি অনেকক্ষণ কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সেদিন বুঝলাম, পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ংকর ভুলটি মোবাইলের ভুল নাম্বারে হয় না। হয় সম্পর্কের ঠিকানায়।
যেখানে একজন বাবা আজও সন্তানের ভালোবাসার প্রাপক হতে অপেক্ষা করে, অথচ সেই ভালোবাসা পৌঁছে যায় অন্য কারও নামে।


