মঙ্গলবার, এপ্রিল ২১, ২০২৬

পাঠ আলোচনা : প্রাগৈতিহাসিক

পারিজাত দেবনাথ

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পটি মূলত সভ্যতার মুখোশ খুলে মানুষের ভেতরের আদিম সত্তাকে সামনে এনে দাঁড় করায়। এটি কোনো সাধারণ সামাজিক গল্প নয়। বরং এটি মানুষের অস্তিত্বের সেই স্তরকে স্পর্শ করে, যেখানে নৈতিকতা, আইন কিংবা সংস্কার গৌণ হয়ে যায় এবং বেঁচে থাকাই একমাত্র সত্য হয়ে ওঠে।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ভিখু। সে কোনো রোমান্টিক নায়ক নয়, আবার নিছক এক খলচরিত্রও নয়। ভিখু আদিম মানুষের প্রতীক। ক্ষুধা, কামনা, হিংসা, প্রতিশোধ—এই সব প্রবৃত্তির এক নগ্ন সমাহার। বর্শার আঘাতে পঙ্গু হয়ে পড়ার পরও তার জীবনীশক্তি নিভে যায় না। বরং বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে অমানবিক সীমার দিকে ঠেলে দেয়। এখানে মানিক দেখান, মানুষ যখন চরম সংকটে পড়ে, তখন সে সভ্য মানুষ থাকে না; সে হয়ে ওঠে প্রকৃতির সন্তান।
পেহলাদের চরিত্রটি সভ্যতার ভীরু দিককে তুলে ধরে। বিপন্ন ভিখুকে আশ্রয় দিতে না পারা তার ব্যক্তিগত নিষ্ঠুরতা নয়, বরং সামাজিক ভয় এবং আত্মরক্ষার প্রতিফলন। কিন্তু সেই ভীরুতার ফল ভয়াবহ। ভিখু আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মানিক দেখান, সভ্যতার নৈতিকতা কতটা ঠুনকো, যখন তা নিজের নিরাপত্তার মুখোমুখি হয়।
পাঁচীর সঙ্গে ভিখুর সম্পর্ক গল্পের সবচেয়ে অস্বস্তিকর এবং গভীর স্তরটি উন্মোচন করে। এখানে প্রেম নেই, আছে টিকে থাকার দরকষাকষি। পাঁচী ভিখুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বাস্তব বুদ্ধিতে। সে জানে, এই আদিম পুরুষের সঙ্গে নিরাপত্তা ক্ষণস্থায়ী। ভিখুর প্রতিশোধপরায়ণতা এবং বসির হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে, আদিম মানুষের কাছে সম্পর্কও এক ধরনের দখল।পলিমাটি
গল্পের শেষ দৃশ্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। চাঁদের আলোয় ভিখু ও পাঁচীর যাত্রা এক গভীর প্রতীক। আলো থাকা সত্ত্বেও তারা বহন করে চলেছে এক জন্মগত অন্ধকার। এই অন্ধকার কোনো ব্যক্তিগত পাপ নয়, এটি মানবজাতির উত্তরাধিকার। মানিক এখানে স্পষ্ট করে বলেন, সভ্যতা আমাদের বদলায়নি; শুধু ঢেকে রেখেছে।
‘প্রাগৈতিহাসিক’ পাঠকের জন্য স্বস্তিকর নয়। এটি প্রশ্ন তোলে, অস্বস্তি তৈরি করে, নিজের ভেতরের অস্বীকার করা সত্যগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায়। এই গল্প পড়তে গিয়ে পাঠক বুঝতে বাধ্য হয় যে, আদিমতা কোনো অতীত নয়। তা আমাদের সঙ্গেই আছে, আমাদের ভেতরেই আছে। আর এই নির্মম সত্যটাই ‘প্রাগৈতিহাসিক’-কে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম শক্তিশালী ও অমোঘ গল্প করে তুলেছে।

লেখক পরিচিতি

পারিজাত দেবনাথ
পারিজাত দেবনাথ
জন্ম মানিকগঞ্জ শহরের পূর্ব দাশড়ায় ৷ সেখানেই বেড়ে ওঠা ৷ রসায়নে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ৷ পড়তে ভালোবাসেন ৷ নিতান্ত শখ করেই লেখালেখি করেন ৷

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা