শনিবার, মে ১৬, ২০২৬

শীতের হাওয়া এসে লাগলো প্রাণে

সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ প্রকৃতির এক অনন্য আশীর্বাদ। ষড়ঋতুর আবর্তনে এই ভূখণ্ড বারবার নতুন রঙে, নতুন আবেশে নিজেকে মেলে ধরে। হেমন্তের সোনালি ফসল ঘরে ওঠার পরই কুয়াশার চাদর জড়িয়ে, উত্তরের হিমেল হাওয়া নিয়ে হাজির হয় শীত। শীত মানেই যেন প্রকৃতির নিঃশ্বাস ধীর হয়ে আসা—নিস্তব্ধ, কোমল, অথচ গভীর।
শীতের সকাল বাংলার প্রকৃতিকে সাজায় এক অপার্থিব সৌন্দর্যে। সবুজ ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির বিন্দু সূর্যের প্রথম আলোয় ঝিলমিল করে ওঠে—মনে হয় যেন মাটির বুকে ছড়িয়ে আছে অগণিত সোনার দানা। ঘন কুয়াশা ভেদ করে যখন সূর্য উঁকি দেয়, তখন প্রকৃতি যেন দীর্ঘ নিদ্রা ভেঙে চোখ মেলে তাকায়। ফুলে ফুলে মৌমাছির আনাগোনা, মধু সংগ্রহের ব্যস্ততা—এই দৃশ্য কেবল চোখ জুড়ায় না, মনকেও এক ধরনের শান্তিতে ভরিয়ে তোলে।
শীত মানেই গ্রামবাংলার কর্মচাঞ্চল্য। কৃষকেরা ব্যস্ত থাকে শাক-সবজি আর ফসলের ক্ষেতে। অন্যদিকে ঘরের ভেতরে বধূদের হাতে তৈরি হয় বাহারি পিঠা—চিতই, পাটিসাপটা, ভাপা, দুধচিতই। খেজুরের রসে তৈরি গুড় আর পায়েসে ভরে ওঠে শীতের আয়োজন। এই সময়টায় গ্রাম যেন এক জীবন্ত উৎসবের নাম। কবি আহসান হাবীবের কবিতার পংক্তির মতোই—শীতের পিঠা ঝাল-নোনতা, মিঠে স্বাদে ভরা, আনন্দের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।
তবে শীতের এই রূপ সকলের জন্য সমান নয়। যে শীত কারো কাছে সৌন্দর্য আর উৎসব, কারো কাছে তা চরম অভিশাপ। যাদের নেই গরম কাপড়, নেই মাথার ওপর ছাদ—শীত তাদের জীবনে আনন্দ নয়, বরং টিকে থাকার কঠিন লড়াই। শহরের ফুটপাত, বস্তির অন্ধকার কোণে কিংবা গ্রামের প্রান্তিক মানুষের জীবনে শীত আসে কান্নার রূপ নিয়ে। কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল তাদের কাছে কবিতার ছবি নয়, বরং অসহায়তার প্রতিচ্ছবি।
বৃদ্ধদের ঠকঠক করে কাঁপা শরীর, শিশুদের দাঁতে দাঁত চেপে শীত ঠেকানোর চেষ্টা—এই দৃশ্য আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। সামান্য একটি কম্বল, একটু রোদের আশায় তারা সারারাত ভোর গোনে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের সূর্যের কাছে করা আর্তি যেন তখন আরও বাস্তব হয়ে ওঠে—সূর্যের সামান্য উষ্ণতাই তাদের কাছে সোনার চেয়েও মূল্যবান।
তবু শীত শুধু কষ্টের গল্প নয়। কৃষকের কাছে শীত আবার আশীর্বাদ। এই ঋতুতেই মাঠ ভরে ওঠে সবুজ শাক-সবজিতে, হলুদ শর্ষে ফুলে। প্রকৃতি তখন রঙিন ক্যানভাস হয়ে ওঠে। দূর সাইবেরিয়া থেকে আগত পরিযায়ী পাখিরা বাংলার জলাভূমিতে আশ্রয় নেয়, শীতের আকাশে যোগ হয় নতুন কোলাহল।
শীতের শেষভাগে প্রকৃতি আবার বদলের আভাস দেয়। কুয়াশা পাতলা হয়, রোদ উষ্ণ হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে শীত বিদায়ের প্রস্তুতি নেয়, রেখে যায় স্মৃতি—কখনো আনন্দের, কখনো বেদনার। এই ঋতু আমাদের শেখায় বৈচিত্র্য, সহমর্মিতা আর উপলব্ধির পাঠ। শীত আসে, শীত যায়—কিন্তু মানুষের জীবনে রেখে যায় অনুভবের গভীর ছাপ। ঠিক তখনই মনে হয়, সত্যিই হাওয়া লেগেছে প্রাণে।

লেখক পরিচিতি

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা