শনিবার, মে ১৬, ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষায় চাই সুশাসন

বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি কতটা বৈচিত্র্যময় এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রকৃতই কতটা প্রকৃতিপ্রেমী ও পরিবেশবাদী ছিলেন তা তাঁর জীবনী পর্যালোচনায় প্রতিভাত হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। জীববৈচিত্র্য অর্থাৎ প্রাণ-প্রকৃতির প্রতিকূলতা উপলব্ধি করে তিনি এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘মনে রেখো, মুখে হাসি বুকে বল/তেজে ভরা মন, মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন’। ১০ আগস্ট ‘হুমকির মুখে টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি বঙ্গবন্ধুর সেই মূল্যবান বক্তব্যটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওর তো বটেই, মনুষ্যসৃষ্ট নানা কারণে কীভাবে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতির ওপর আঘাত লাগছে সংবাদমাধ্যমে এই চিত্র প্রায়ই উঠে আসছে। এর বিরূপ প্রভাব বহুমুখী হয়ে উঠলেও মানুষের হুঁশ ফিরছে না।

এ দেশের অপার সৌন্দর্য বাংলা সাহিত্যে নানাভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। রূপসী বাংলার কবি হিসেবে খ্যাত জীবনানন্দ দাশ, পল্লীকবি জসীম উদ্‌দীন তো বটেই, আরও কত খ্যাতিমান বাংলা সাহিত্যিক কতভাবে এর রূপ বর্ণনা করেছেন। তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এরই ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। শিক্ষাবিদ ও বহুমাত্রিক লেখক আবু হেনা মোস্তফা কামাল তার ‘ছবি’ কবিতায় যথার্থই আহ্বান জানিয়েছিলেন, ‘আপনাদের সবার জন্য এই উদার আমন্ত্রণ/ছবির মতো এই দেশে একবার বেড়িয়ে যান…।’ কিন্তু কিছুসংখ্যক মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড শুধু দেশটির ছবিই ক্রমাগত মলিন করছে না, মানুষের জীবন-জীবিকাসহ নির্মলভাবে বেঁচে থাকার পথও করছে কণ্টকাকীর্ণ। প্রাণ-প্রকৃতির স্বভাববিরুদ্ধ নেতিবাচক বিষয়গুলো প্রাকৃতিক বিপর্যয়েরও অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। প্রাণ-প্রকৃতি কিংবা জীববৈচিত্র্য আমাদের গ্রহের একটি মৌলিক দিক, যা বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য ও প্রাচুর্যকে অন্তর্ভুক্ত করে। এতে উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে শুরু করে অণুজীব, স্থলজগৎ, সামুদ্রিকসহ স্থলভাগের জলাভূমি; সেই সঙ্গে পরিবেশগত ব্যবস্থা বিদ্যমান। ইতঃপূর্বে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা লিখেছিলাম, উন্নয়নের নামে যেন জীববৈচিত্র্য সংকটে না পড়ে, এ ব্যাপারে আমাদের বিশেষ সজাগ থাকতে হবে। কিন্তু দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ হাওরাঞ্চলের উন্নয়নে হাওরকে হাওরের মতো রেখে এমন কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে যার সুফল নয়, বরং কুফলই দেখা গেছে। অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওরও এ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এমন নজির আরও আছে।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি জেলার সাড়ে আট লাখ হেক্টরজুড়ে বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এসব হাওর জীববৈচিত্র্যের আধার। হাওরের ভূ-প্রকৃতিগত গঠন জলজ উদ্ভিদ, মাছ আর পশুপাখির জন্য নিরাপদ চারণক্ষেত্র হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে দীর্ঘকাল থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ও আমাদের পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রমের কারণে প্রকৃতি ও পরিবেশ হারাচ্ছে স্বাভাবিক ভারসাম্য। কখনও এই প্রকৃতি ধারণ করছে রুদ্র রূপ। এতে বিনষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। হচ্ছে ফসলহানি। এমনকি প্রাণহানিও। টাঙ্গুয়ার হাওর সুনামগঞ্জ তথা ভাটি বাংলার সম্পদের খনি বললে অত্যুক্তি হবে না। দুঃখজনক হলেও সত্য, মনুষ্যসৃষ্ট আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডের ফলে বিরল প্রজাতির অনেক প্রাণীসহ জলাভূমি ও প্রকৃতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আমরা জানি, ১৯৯৯ সালে সরকার এই এলাকাকে ‘বিপন্ন প্রতিবেশ এলাকা’ ও ২০০০ সালে ইউনেস্কো ‘রামসার এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে। ইঞ্জিনচালিত নৌকার অবাধ বিচরণ, প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের বর্জ্যের কারণে অতিথি পাখির স্বর্গরাজ্য খ্যাত অন্য প্রাণ-প্রকৃতির ওপর যে অভিঘাত লেগেছে, তা সহজে কাটিয়ে ওঠা কঠিন। তারপরও আশার কথা, সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন এই হাওর রক্ষায় একটি নীতিমালা তৈরি করেছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এর বাস্তবায়ন জরুরি ভিত্তিতে করা প্রয়োজন।

টাঙ্গুয়ার হাওর পর্যটকদেরও বিশেষ আকর্ষণ। দেশের সব পর্যটন কেন্দ্রের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথ সুগম করার যে অবকাশ রয়েছে, মনোযোগ নিবিড় করা বাঞ্ছনীয় সেদিকেও। আমরা মনে করি, জীববৈচিত্র্য অর্থাৎ প্রাণ-প্রকৃতির ব্যাপারে অবশ্যই মনোযোগ গভীর নয় শুধু, বাস্তবানুগ পদক্ষেপ নিতে হবে দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে। এক্ষেত্রে উদাসীনতা কিংবা হেলাফেলার কোনো অবকাশ নেই। আমরা এ-ও মনে করি, টাঙ্গুয়ার হাওরসহ দেশের সব হাওর, পাহাড়, বনাঞ্চলসহ প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষায় পরিবেশ-প্রতিবেশের স্বার্থেই সরকারকে অনমনীয় হতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সচেতন জনসাধারণ ও পরিবেশকর্মীদের সমন্বয়ে চালাতে হবে যূথবদ্ধ প্রয়াস। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না যদি পরিবেশ-প্রতিবেশসহ প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করা না যায়। হাওরাঞ্চলের সম্পদ জনজীবনে তো বটেই, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় সহায়ক শক্তি। জীববৈচিত্র্য কিংবা প্রাণ-প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে জীবনও অধিকতর হুমকির মুখে পড়বে। এজন্য সুশাসন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

উন্নয়নই টেকসই হবে না যদি পরিবেশ-প্রতিবেশসহ প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করা না যায়। হাওরাঞ্চলের সম্পদ জনজীবনে তো বটেই, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় সহায়ক শক্তি। জীববৈচিত্র্য কিংবা প্রাণ-প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে জীবনও অধিকতর হুমকির মুখে পড়বে। এজন্য সুশাসন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।

লেখক পরিচিতি

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা