রবিবার, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

অজয় কুমার রায়ের গল্প- বানবিদ্ধ মরাল

বিষন্ন সকাল। অপ্রিয় বসন্ত। কর্কশ কোকিল। বৈচিত্রহীন দিনগুলি যাতাকলে পিষ্ট। বিশ্বাদ আস্বাদ। বিন্দুহীন জীবন। বিভ্রান্ত বিস্রস্ত ঢেউগুলির মত এলোমেলো, পরিসর গন্ডীবদ্ধ সীমাবদ্ধ সীমানা। ক্ষণস্থায়ী প্লুতোগতি তারপরই বুদ্বুদন। সরোবরের পদ্ম হয়ে ফোটার নেই অভিলাষ শুধু কীট দংশনে পচে গলে মৃত্যুর সাধ। বৃত্য পৃথিবী বিতৃষ্ণার বিষধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। প্রোন্নত হিমালয়ের বক্ষ জুড়ে শুধু দীর্ঘশ্বাস। দিনের আলো নামে শৃঙ্খল হাতে প্রহরীর মত। রাতের আঁধারে হাত জোড় করে বসে ইতিহাস পুরানের বেদীমূলে বৃতিহীন কল্পরাজ্যের রাজকুমার হয়ে।

ফটকের ঘড়ির কাটা টিক্ টিক্ করে ছুটে চলেছে। তার প্রসারিত অবেষ্টনীতে একটা হাল্কা পলকের মত পৃথিবীটা ঘুরছে। সুমন দেখছে- এখানে শেওলা ধরা পরিত্যাক্ত ঘাটের সমাহিত ইটের উপর বসে। নির্নিমেষ দৃষ্টি। কখনো আতংকিত, কখনো কুঞ্চিত, কখনো তাচ্ছিল্য ভরা। প্রবন্ধ ঘূর্ণনে আত্মবলি দিতে সবাই প্রোৎসাহিত। বিস্মৃতির মরুভূমিতে নিজের সমাধি খননে উদ্যত। সুমন ক্ষীণ কণ্ঠ, হীনবল অসংকলিত একটি ছেঁড়া দলিল।

একটি ঘুঘু ডেকে উঠলো। বিগর্হিত দুপুরের প্রাচীর ভেদ করে কটু কাংস্যধ্বনি। দোয়েলের গান ওর সুখ তৃপ্ত মনের অভিব্যক্তি, কিন্তু কি কান ঝালাপালা সুর। কিসের এক বিকট শব্দ তরঙ্গ। দেবদারুর চূড়ায় যেখানে সরু পাতাগুলি বির্পলুদ্ধা রমনীর মত আকাশের দিকে তাকিয়ে, অসভ্য নির্লজ্জ শকুন শকুনি মৈথুন ক্রীয়ায় ব্যাপৃত। পাদদেশে দাঁড়িয়ে সেই ছেলেটি। চূড়ায় দৃষ্টি। তেইশটি বসন্তের আগমন-নির্গমনের সাক্ষী অনিয়ন্ত্রিত বিধ্বস্ত অবয়ব। মেরুদন্ডে ঘূণ ধরেছে। ফাপা হাড়ের সুরঙ্গ পথের বিদ্যুৎস্ফুরণ। অন্তরে প্রকট জ্বালা। ধমনীতে উচ্চ উপসাগরীয় স্রোত। কঠোরাগত চোখ দুটি সদ্য উদিত সন্ধ্যাতারা অথবা মৃতপ্রায় শুকতারার মত চকচকে। পায়ের নিচে অসংখ্য বিছুটি গাছ। বিকচ আঁখি তারায় প্রকটিত এক আদিম রমপোন্যাস যেন সহস্র যুগের ক্ষুধাপীড়িত একটি দৃষ্টির সামনে একফোটা পঁচা মাড়ের কটু গন্ধ। উন্মত্ত বালকের হাত দুটি নিসপিস করে উঠল। দেহটা কেঁচোর মত কুকড়ে গেল। তলপেটে চিনচিনে ব্যথা। রণে ভঙ্গ দেওয়া আহত হাতির মত বসে পড়লো বিছুটি ঝোঁপের উপর। ত্বকে জ্বালা বিছুটি পাতার গুনাঙ্কিত তাড়স।

ক্ষীপ্ত বাতাসের ঘেউ ঘেউ শব্দ। পৃষ্ঠা নম্বর দুই। লুতাতন্তু ভেদ করে লেংটি কুকুরটা উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গেল। একটা লাল বিষ পিঁপড়া বিবর থেকে ঘনঘন উঁকি মারছে। ঠাকুমার খাপছাড়া চশমাটা উন্মুক্ত গীতার উপর। নিমিলীত চোখ। বর্ণবোধ হাতে কচি শিশুটির মত উচ্চস্বরে মুখস্থ করছেন- সাংখ্যযোগ, “যিনি সর্ববিধ কামনা পরিত্যাগপূর্বক নিস্পৃহ নিরহঙ্কার ও মমতাশূণ্য হইয়া বিষয়ভোগ………।” মূহূর্তে উবে গেল গীতার অনুধ্যান। জ্বলন্ত কাঁচা খেকো চোখ দুটি তেঁতুল ডালে, হাক ডাক হুলস্থুল। নরেন এসে দাঁড়াল- শিকার হাতের মুঠোয়। বুকের ছাতিটা স্ফীত। পৌরুষ প্রকাশে সিংহ গর্জন। হাতে কয়েক ছড়া কাঁচা তেঁতুল। লেংটা ছেলেটার ভয়ার্ত চিৎকার। ঠোঁট কাটা লাল রক্তে পোকা খাওয়া দাঁতগুলি লাল রঞ্জিত। ঠাকুমা নরেনকে পুরস্কৃত করলেন।

তালগাছের মসৃণ মেরুদন্ড বেয়ে একটা সাপ সরসর করে নীচে নামল। মুখের ইঁদুরটা একবার গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল। বাবুই পাখিটা সহসা আতঙ্কে গুটিসুটি হয়ে শাবক দুটিকে ডানায় আড়াল করে চোখ বন্ধ করলো। একটা মাছ লেজ তুলে ডিগবাজী দিল। শান্ত জলরাশিতে মৃদু আলোড়ন। একটা ঢিল ছোঁড়ার শব্দ।

মেয়েটা স্নান করছে। শরীরের আনাচে কোনাচে ঘষে মেজে একেবারে সাফ। উন্মুক্ত দেহ খানি আটপৌরে শাড়ীর আবরনে আটকাতে কষ্ট হচ্ছে। কমদামী সাবানের কটু গন্ধ। মাটির লাল কলসিটি ভাসছে। চকিত হরিণীর মত চোখ দুটি অস্থির। ওষ্ঠযুগলে এক ক্লিন্ন হাসি। স্নায়ুতে এক পাগলা ঘোড়ার দাপট।

নরেনটা বেপরোয়া। শিকারী বিড়ালের মত একটা দাও ধরে বসলো। হোগলা ঝোপের অন্তরালে বিবরমুখী সাপটি জবা ফুলের মত লজ্জা রাঙা। অন্ধকার খুঁজছিল। চেঁচিয়ে উঠল নরেন। জামার পকেটে হাতটা
ঢুকাতে গেল। কৌটাটা দুরে ছিটকে পড়লো। হিমানীর কৌটা। ছ’আনার ফেরিওয়ালার ঝুলির ভিতর থাকে।

গাঁয়ে সুন্দরী রমনীর ছবি আঁকা। ছেলেটি মাথা হেড করে দাঁড়িয়ে রইলো। বাতাসের শমশম্। কলসী ভরার শব্দ।ভিজে কাপড়ের খপ্প্ শব্দ তরঙ্গ। থলথলে মাংস পিন্ডের অথৈ নৃত্য। দুই জোড়া আশাহত লোলুপ দৃষ্টি। দুইটি দীর্ঘশ্বাস। সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মত বুকে দুরূহ ব্যথা- অসহ্য যন্ত্রনা। নিঃসহ মরুর শুষ্ক কান্না। …..

দলিলের বুকে মালীর আঁচর। জ্বলজ্বল করছে অঙ্কিত কালো একটি স্বাক্ষর। সভাতার ক্যাবিসে মোড়া পৃথিবীর গায়ে জলছাপ। অসংখা বিচিত্র চিত্র অজন্তার জীবন্ত হাসি কান্নার জীবনোচ্ছ্বাস। বিগত আজ আগত, মুর্ছনা আজ এষনা।

মরা দুর্গন্ধ কাকটির উপর একটি শকুন এসে বসলো। ডানার বাতাসে একটা ইট খসে পড়লো খানিকটা জীর্ণ সুড়কি নিয়ে। দলিলের পাতাগুলি কেঁপে উঠলো মাথা কাটা যজ্ঞোর পাঠার মতো। ঠাকুমার চশমার কাঁচ বড় আবছা- অস্পষ্ট। বিষন্ন চাঁদটি কেরল কাঁদে। ক্লান্ত সূর্যের চোখদুটি নিদ্রালু। পৃথিবীর এতবড় বুকটার সবটাই শুধু আগ্নেয়গিরি। দগদগে আগুনের জ্বালা। সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে একপাল মেষ, জ্বালামুখে লাফিয়ে পড়ার অপেক্ষা।

শুকনো চোখ দুটিকে এক সামুদ্রিক ঝড়। ইতস্তত, বিক্ষিপ্ত সিক্ত কনা হলের মত বিষয়ে। জোয়ার এলো না. ভাটার টানে খরকুটোগুলি ছুটে চলেছে ঢেউয়ের মাথায় খাবি খেতে যেতে। রাগগানের কৃষ্ণচূড়া গাছগুলি দপদপ মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। রক্তিম ফুলগুলির মুখে বোবা কান্না আর মালিন জিজ্ঞাসা। নিষ্ঠুর কাঠুরিয়া মহা উল্লাসিত। পরশু ফালকে সূর্যের কিরণ ঝিকিমিকি করছে যেন দুর্বার্তের দুপাটি দাঁতে ঝলসানো সুড়সুড়ি।

সুমন চুপ করলো। চোখে মুখে তার বিরক্তির ছাপ। বাবা দাঁড়িয়ে আছে। চেক লুঙ্গির উপরে কোমর। গামছা দিয়ে কষে বাঁধা। অনুর্ধর উষর মরুভূমির মত প্রাংশু খোলা বুক। সুমন মাত দেয়নি। বড় ভাল লাগত সূর্য। উদয় আর অন্তরাগের রাগা আবেশ। কিন্তু বাবার যুক্তি আবর্জনা আর কতগুলি আগাছার সমারোহে এতখানি জায়গা রসিয়ে রাখার কোন যুক্তি হয় না। তাছাড়া বাড়িটাতে সূর্যালোকের স্বাচ্ছন্দ প্রবেশ বাধামায়। রুদ্র থমকে দাঁড়িয়েই ফিরে চলে যায়। এবার থেকে বাড়িটা আলো বাতাস রোদে হাসবে শুধু। বাবার পরিকল্পনা ওখানে দালান উঠবে। লাললাল ইটের বন্দি আত্মার দীর্ঘশ্বাস। হোটেল উঠবে। জুতোর গুতোয় ঠকঠক শব্দ কোঁকিয়ে উঠবে মোজাইক করা মেঝে। তন্বীবালার হাতে থাকবে লাল পানি, চোখে মুখে ঢঙে থাকবে মাকড়শার ফাঁদ, ঠোঁটে যুদ্ধ পরশ। কৃত্রিম আলোয় শানিত ছুরির মত চক চক করে উঠবে। অন্ধকারে অসংখা অশরীরীর অবহেলিত জিজ্ঞাসা কবর খুঁড়ে উঠে দাঁড়াবে। ঝড় থেমে যাবে, সাগর ঘুমিয়ে পড়বে। গায়ে সহস্র বিহার দংশন বিষে নীল হয়ে যাবে একগুচ্ছ মলিন মল্লিকা কষ্ট জুড়ে করুন মল্লার। পাশে একগাদা মরকত, দৃষ্টিতে একরাশ বিরুপ। একটা মস্ত বড় সিন্দুক। সামনে একটা তালা। পাশে ধারা। ঠাকুমাটাও কেমন বা নির্লজ্জ বেহায়া। নিজেতো বারণ করলোই না সুমন, কলার পরেও না। অথচ ঠাকুমাই বলেছে ঠাকুমাকে নিয়ে মধুরাতি উদযাপনের জন্য ঠাকুরদাই নাকি বাগানটি গড়ে তুলেছিলেন। আজকের হানিমুন সেদিন ঐ কৃষ্ণচূড়ার অসংখ্য উলুধ্বনির মাধ্যেই হতো। কত বসন্ত জোছনার স্মৃতি বুকে নিয়ে গাছগুলি বাঁচতে চেয়েছিল।

কালও হয়তো ঠাকুরদা গাছগুলির চারপাশে ঠাকুমাকে খুঁজেছে। কিন্তু ঠাকুমা যে এতো দুরে গেছে- সে কি ঠাকুরদা জানতেন।

সূর্য উঠলো। বাবার টাক চাঁদিতে একথালা কয়লার আগুন। চামড়া পোড়ার বিশ্রি গন্ধ। ছায়া খুঁজছে ৷ কৃষ্ণচূড়া গাছগুলি শুকিয়ে গেছে। ঠাকুমার চশমা খানি পুড়ে ছাঁই। চশমা মুক্ত চোখ দুটি ছানা বড়া।

সুমন হেসে উঠলো। সেই লাল পিঁপড়েটা কুট করে হুল বসিয়ে দিল। নরম মাংস জ্বলে পুড়ে ছারখার ৷ পুঞ্জপুঞ্জ কালো মেঘ ফিরে চলেছে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে। নিন্দিত দৃষ্টিতে পৃথিবী ছিন্ন ভিন্ন। জলহীন জলাশয় ফে চৌচির। কাঁকড়ার গর্তে অন্ধকারের পদচারণা। মেঘের দল নির্বাসিত যক্ষকে খুঁজছে সঙ্গে তার মানসীকেও। কোথায়?

সুমন উঠতে গেল ৷ জীর্ণ ইটগুলির সাথে কাপড়খানা শেটে গেছে দারুন ভাবে। বাঁধা পেল। আকাশ ভাঙ্গার শব্দ। একজোড়া জঙ্গী। হিংস্র গর্জন। নীল আকাশটার কপাল কেটে গেল। সেখান থেকে পুচ্ছ নির্গত কালো বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিষন্ন আকাশ তাকিয়ে রইলো। চোখে মুখে সীমাহীন শূণ্যতা আর নির্জনতা।

দলিলটা বানবিদ্ধ মরালের মতো উড়ে এসে ঠাঁই নিল অবতার বুদ্ধের পবিত্র অঙ্কে। সুমন কৌতূহল নিয়ে পৃষ্ঠা খুললো। একপাল ক্ষুদ্র ক্ষুধার্ত কীট। দলিলের বুকে অসংখ্য ধারালো দাঁত আর নখের আঁচর। নিন্দা বিন্দু রক্ত ঘিরে গভীর কান্না। কান্না দিয়ে জড়ানো এক ঝাঁক বিকৃত হাসি।

লেখক পরিচিতি

অজয় কুমার রায়
অজয় কুমার রায়
কবি গল্পকার ও প্রাবন্ধিক অজয় কুমার রায় মানিকগঞ্জ জেলায় ঘিওর উপজেলার নারচি গ্রামে ১৯৪৮ সালের ৫ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-প্রয়াত অক্ষয় কুমার রায়,মাতা-দিভা রায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি রাজবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে ২০০৫ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা,সাময়িকীতে ও যৌথ গ্রন্থে কবিতা,গল্প,নাটক প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর অসংখ্য ফাইলবন্দী লেখা থেকে প্রথম গল্পগ্রস্থ ‘শতাব্দীর ক্ষুধা’ একুশে বইমেলা‘১৫ তে প্রকাশ হয়েছে। পরবর্তী বছর একক কাব্যগ্রন্থ 'রংধনু' প্রকাশিত হয়েছ ৷ তিনি অন্তরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ৷ তিনি শিল্প সাহিত্য ও মননের অনলাইন মাসিক'পলিমাটি'র উপদেষ্টা সম্পাদক ৷ এছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। বিভিন্ন সংগঠন হতে বহু সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন ।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা