বিশাল আয়োজন। গ্যালারিতে কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নাই। স্বাধীনতা পদক বিতরণ অনুষ্ঠান। অতীনকে বড় মনে পড়ছে। জন সমুদ্রের মাঝে তাকে খুঁজছি। উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে কোথাও সে নেই। তার অনুপস্থিতি আমাকে ভীষণ পীড়া দিচ্ছে। মঞ্চের সাজানো চেয়ারগুলির দিকে তাকিয়ে তন্য তন্য করে খুঁজছি।
ভুলে গেছি অতীন নেই। কারণ সে তো অসাধারণ। কোন বিশেষ স্থানেই তার অবস্থান হওয়া স্বাভাবিক। হঠাৎ নজর কাড়লো পিছনে মাথার উপর টাঙ্গানো ব্যানারটি। সুবজের মাঝে লাল বৃত্ত ভরা আমার জাতি সত্ত্বার প্রকাশিত গর্ব তিলক। বৃত্ত ঘরে হাসিমাখা অশরীরি অতীনের মুখখানা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। নির্মল হাসি। জীবনে শ্রেষ্ঠ পাওয়ার অনাবিল আনন্দ। ইচ্ছে হল – দৌড়ে গিয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরি। আমার জীবন মরণে অচ্ছেদ্য বন্ধনের প্রিয় সাথী। বাল্য-কৈশোর-যৌবন জুড়ে একই নাটাইয়ে বাঁধা দুটি ঘুড়ি আকাশে উড়েছি। কখনও কেউ আগে পিছে চিন্তা করিনি।
আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি মুক্তিযুদ্ধে দুঃসাহসিক অবদানের জন্য যে স্বাধীনতা পদক পাচ্ছি, তা আমি অতীনের উদ্দেশ্যেই উৎসর্গ করব। আর দেবযানীর গলায় লাল ফিতায় গাঁথা গৌরব অলংকার পরিয়ে দিয়ে বলবো “অতীনকে তুমি আঁচলে বেঁধে রাখনি, বরং মুক্ত করে দিয়েছ। তার অবর্তমানে এটি তোমারই প্রাপ্য। আমি তো তার অনুসারি প্রতিনিধি মাত্র৷”
প্রধান অতিথির বিলম্বিত আগমনের জন্য সঞ্চালকের ক্ষমা প্রার্থনার ঘোষণা। আমি হারিয়ে গেলাম। বর্তমানের গর্ভধারিণী অতীত আমাকে ডেকে নিয়ে গেল সেই নিশীথ রাতে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে।
রাত ১২ টা। আমার শোবার ঘরে আমি আর অতীন। অতীন দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ এক উত্তাল যুবক। অন্যায় অত্যাচার অসভ্যতার প্রতি তার তীব্র ঘৃণা। দু’চোখে বিদ্রোহের বহ্নিশিখা। পেশিগুলো যেন কঠিন পাথর। প্রায় একঘন্টা কথোপকথন । অবশেষে সে জানালো- যুদ্ধে যাবার পথে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। আমি শিউরে উঠলাম। নিশ্চিত মৃত্যু। জেনে শুনে এমন সুন্দর জীবনটাকে বিলিয়ে দিবে পাগল হয়েছে নাকি? আমি ওকে নিরস্ত্র করতে কৌশলি হলাম। আমি জানতাম অতীন তার বাবা-মাকে বড় ভালবাসে। আরও একজন যাকে ওর দেহ মনের পুরোটাই বিলিয়ে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে বসে আছে। দেবযানী। অনেক বুঝালাম।
অনেক যুক্তি তর্ক, বাদানুবাদ। সব ব্যর্থ। ওর যুক্তি সময়ই সব কিছু ভুলিয়ে দিবে। তাই বলে বিবেকের শব কাঁধে নিয়ে জীবন চলতে পারে না। সেটি মৃত্যুরই নামান্তর। অতীন চেষ্টা করল নানা যুক্তি, ইতিহাস, ভবিষ্যৎ, ধর্ম টেনে আমাকে উদ্বুদ্ধ করতে। পারলো না। মৃত্যু মূল্যে নৈতিকতা কিনতে আমি অসম্মতি জানালাম। আমার জীবন, সুন্দর পৃথিবী, বাবা-মা, ভাই-বোন এবং পৃথা, আশা- আকাঙ্ক্ষা ঐহ্যিক সুখ ত্যাগ করে দেশ প্রেমের সস্তা ভাবাবেগে সব জলাঞ্জলি দেবার মত বোকা আমি নই ।
অতীনের সাথে জীবনে এই প্রথম মত পার্থক্য দেখা দিল। সে আশাহত হলো। আমি ব্যথাহত হলাম। অতীনের চোখ দু’টি জলে ভরে উঠল। আমার হাত দু’টি হাতে চেপে বাবা-মা, দেবযানীকে রক্ষা করার আকুতি জানিয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। ওকে ডাকলাম। এক পা প্রসারিত করে ওকে ধরতে গেলাম। অতীন ততক্ষণ নাগালের বাইরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। বুঝতে পারলাম মনে মনে ও দুর্বল হয়ে পড়ছিল। পাছে শপথ থেকে বিচ্যুত তাই হয়ত সময় ক্ষেপনে অনিচ্ছা। আমার ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। নাটাই থেকে বিচ্ছিন্ন ঘুড়িটা মহাশূন্যে হারিয়ে গেল।
মাস খানেক পার হয়ে গেছে। হঠাৎ একদিন খবর এলো – অতীন নেই। কোনো এক অপারেশনে দুর্বৃত্তের দুরন্ত লালসার বহ্নিশিখায় সে আত্মাহুতি দিয়েছে। অতীনের কাঠামো টুকুও নাকি অবশিষ্ট পাওয়া যায়নি। শোকে তার বাবা-মা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর দেবযানী! যন্ত্রনার প্রতিমূর্তি – এক মানস প্রতিমা অশ্রুবন্যায় প্লাবিত হচ্ছিল। স্মৃতির বহর মাথায় নিয়ে আমি উদভ্রান্তের মতো ছুটতে লাগলাম । ভাবলাম যা হওয়ার ছিল তাই হয়েছে। অতীনের পাখা গজিয়েছিল তাই আগুনের নেশা তাকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে গেছে।
পৃথিবী আবর্তিত। থেমে নেই তার গতি। কিন্তু এই বিশাল ভূখন্ড জুড়ে অমাবশ্যা নিকষ কালো অন্ধকারে পৈশাচিক অট্টহাসি। নিশাচর হিংস্র পশুদের উন্নত্ত উলঙ্গ নৃত্য। সূর্য বন্দী কারারুদ্ধ অমিয় জ্যোতি। দমকা বাতাসের থাবার চোখের রঙিন
চশমাটা খসে পড়লো। ধূলায় পড়ে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল।
রাত কত? বলা মুশকিল। কারণ রাতের পর দিন আসবে কিনা তার নিশ্চয়তা কোথায়? জতুগৃহের সুরঙ্গ পথে নিজেকে লুকিয়ে ভাবছি। বাবা-মা, পৃথা কাউকেই রক্ষা করতে পারলাম না। নিজেও ত্রিশূলের ফলার মুখে দাঁড়িয়ে আছি। কখন গেঁথে যাব এই আশংকায়। উঃ কি বীভৎস দৃশ্য। ধর্ষিত পৃথা মানসিক ভারসাম্যহীন বিধ্বস্ত প্রতিকৃতি। এরপরেও প্রাণের মায়া। সহসা একটা যম ঘুঘু নিশাচর পাখি ডেকে উঠল কড় কড় কড়াৎ। চমকে উঠলাম। বিশ্রী আওয়াজ। চোখের পাতা বুজে আসছে। স্নায়ু জুড়ে অবসন্নতা। ভাঙ্গা চেয়ারের ফোকর থেকে কুট করে কে সূচ ফুটিয়ে দিল। পাশ ফিরে চর্ট জ্বালালাম। লজ্জাবতী অন্ধকার চিৎকার করে লুকিয়ে পড়ল। একটা কালো ছাড়পোকা শোণ দৃষ্টি ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হাতটা নিসপিস করে উঠল। থেমে গেলাম। ওর যুদ্ধটা যেন আমার কাপুরুষতার বিরুদ্ধে। এ যেন আমার ঘুমন্ত চেতনার প্রতি ওর ঘৃনা ভরা থু-থু ৷
আমার স্বপ্ন, সকাল হবে আলো নামবে, ফুল ফুটবে গন্ধ ছড়াবে। আমার প্রাণের স্পন্দন পৃথিবীর প্রান্তর ঘুরে বেড়াবে। সহসা বাইরে বিকট শব্দ। আগুনের লেলিহান শিখা দাউ দাউ জ্বলছে। এই সুড়ঙ্গ পথেও আচ অনুভব করছি। নর-নারী শিশু কণ্ঠের মর্মন্তদ আর্তনাদ ভেসে আসছে। কালো জানোয়ারের হুংকার। এই সুড়ঙ্গ পথেও তার প্রতিধ্বনি কানের তালা ফাটিয়ে দিচ্ছে।
একটা ছায়া মূর্তি। চিৎকার করে উঠলাম – অতীন! মূর্তিটি মিলিয়ে গেল। দু’চোখের দু’পাশে দুটি টর্চ জ্বেলে খুঁজতে লাগলাম। কোথায় পথ? সবকিছু হারিয়ে আমি যে একটি জড়বস্তু। স্থবির হয়ে গেছি। উদ্ভ্রান্তের মত টর্চের ক্ষীণ আলোয় পথের সন্ধানে ছুটতে লাগলাম। জতুগৃহের চারদিকে আগুনের ক্রদ্ধ কণা। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম জলন্ত অগ্নিশিখার পাশদিয়েই একটি সরু পথ। পথের ও প্রান্তে জ্বলজ্বল একটি মূর্তিমান পদাঙ্ক। অবশেষে সেই পথ ধরেই — |


