শনিবার, এপ্রিল ১৮, ২০২৬

ভজন সরকারের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস-‘চন্দ্রমুখী জানালা’|| পর্ব-১০

দশ

বাড়িতে পাকবাহিনী এলো

থানা সদর থেকে আসা দুটি নৌকার একটি নিমাই বিল দিয়ে সোজা ভবানীপুরের দিকে চলে গেল। অন্য নৌকা হঠাৎ করে মোড় ঘুরে নিমাই বিল থেকে যে খালটি আমাদের গ্রামের এসে পড়েছে সেখানে ঢুকল। তারপর সোজা গিয়ে ভিড়লো বাড়ির ঘাটে। বাড়ির সামনের পুরানো কয়েকটি নারকেল গাছের পাশেই নৌকা ঘাট। বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এলাকার বাড়িগুলো বেশ উঁচু। শুকনো মরশুমে তাই বাঁশ কিংবা কাঠ দিয়ে ধাপে ধাপে অনেকগুলো সিড়ি বেয়ে বাড়িতে উঠতে হয়। বর্ষাকালেও তাই একেবারে বন্যা না হলে ঘাটে নৌকা ভিড়লেও বেশ কয়েক ফুট উচ্চতা ধাপ বেয়ে বেয়ে উঠতে হয়।

বিল এলাকায় গ্রামের বাড়িগুলো বর্ষাকালে যেন এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির মাঝখানে ছোট নিচু খাঁড়ি। আঞ্চলিক ভাষায় এ খাঁড়িগুলোকে ‘জোলা’ বলে। জোলা শব্দটি জল থেকে হয়ত এসেছে। শুকনো মরশুম বাদে আষাঢ় থেকে কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত প্রতিটি বাড়ি এ জোলা দিয়েই বিচ্ছিন্ন থাকে।

গ্রামের পূর্বপাড়ার প্রায় ২০টির মতো বাড়ির মাঝখানে কমবেশি প্রশস্তের জোলা। বর্ষাকালে বাঁশ আড়াআড়ি পেতে সাঁকো বানিয়ে এই ২০টি বাড়ির সংযোগ করা হয়। একেবারে পূর্বদিকের আমাদের বাড়ির জোলাটি অনেকটা প্রশস্থ। এই দীর্ঘ দূরত্বকে সাঁকো দিয়ে জুড়ে দিতে যে পরিশ্রম করা দরকার তার তাগিদ ও মানসিকতা কারো নেই। একে তো যুদ্ধ চলছে। তার উপর ছোট দাদুর মৃত্যু। তাই বাঁশের সাঁকোটি বানায়নি কেউ। আর সেটাই এদিন শাপেবর হয়ে দেখা দিলো।

মিলিটারি বোঝাই নৌকা গ্রামের দিকে আসতে দেখেই সাত-আট মাসের অন্তঃসত্বা মাকে বড়মার সাথে নৌকায় তুলে দিয়ে বাবা বাড়ির অন্যান্যদের নিয়ে শলাপরামর্শ করলেন কিভাবে বাড়ির বউ-ঝি ও অন্যান্যদের রক্ষা করবেন।

সব মিলিয়ে তখন বাড়িতে ছয়-সাত জন যুবক আর পূর্ণবয়স্ক মানুষ। পারিবারিক গড়নের জন্যই সবাই বিশাল দেহের অধিকারী। শক্তিশালী ও সাহসী। তাই একজেঠা বললেন, বউদের ছেলেমেয়েসহ ‘জোলা’ পার করে পাশের পাড়াতে পাঠিয়ে দিয়ে আমরা ছয় জন লাঠি-বল্লম নিয়ে দাঁড়াব। নৌকা থেকে নামার সাথে সাথে এক একজনকে গেঁথে ফেলবো মাছ ধরার টেটা আর কোজ দিয়ে। লোহার শিক বাঁকা করে বাঁশের সাথে গেথে টেটা এবং কোজ তৈরি করা হয়। বর্ষার জল আসার সাথে সাথে বড় বড় মাছ নতুন জলের সাথে চলে আসে। খাল বা নালার উপরে তৈরি করা বাঁশের চং বা বেঞ্চিতে বসে রাতের বেলা টেটা এবং কোজ দিয়ে বিশাল সাইজের সব বোয়াল এবং রুই মাছ ধরা হয়।

বাবা আগাগোড়াই খুব ধীরস্থির-ঠান্ডা মাথার মানুষ। বাবা বললেন, “শুধু রাজাকার আসলে কোনো অসুবিধে নেই। কিন্তু আমরা তো জানি না, সাথে মিলিটারি আছে কি না। তাছাড়া বাড়িতে কোনো বন্দুক-রাইফেলও নেই যে, অস্ত্রের সামনে লড়াই করা যাবে। বউ-ছেলেমেয়েদের পাশের পাড়ায় পাঠিয়ে দাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আমি একটু চিন্তা করে নেই। আর লক্ষ রেখো নিমাইবিলের ওপার থেকে কোনো নৌকা এদিকে আসে কি না। বহেরাতলিতে মুক্তিবাহিনীর একটি গ্রুপ আছে। বুদ্ধি করে যদি ওরা এদিকে আসে তবেই আমরা লড়াই শুরু করবো।”

সে মতেই ডিঙি নৌকায় করে কয়েক জোলা পার করে বেশ দূরত্বে জেঠিমাদের সাথে ছোট ছেলেমেয়েদের নামিয়ে দেয়া হলো। ঠাকুমা কিছুতেই ছেলে আর নাতিদের রেখে বাড়ি ছেড়ে যাবেন না। বাবা শতবার বুঝিয়েও তাঁর মাকে পাঠাতে পারলেন না। মাত্র দিন দুই আগেই এক পিসিমার বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে রাজাকারেরা। পিসিমা তাঁর বিবাহযোগ্যা দুই মেয়েকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে। মেয়েদের পাঠিয়ে পিসিমাও ঠাকুমার সাথে রয়ে গেলেন বাড়িতে। তিন জ্যেঠাতো ভাই ও তিন জ্যেঠা মাছ মারার জন্য প্রস্তুত করে রাখা টেটা আর কুছের মাথায় লোহার ধারালো আংটাগুলো প্রস্তুত করে বৈঠকখানার পাশে জমা করতে লাগলেন।

বাবা তাকিয়ে আছেন মিলিটারি নৌকার দিকে। বহেরাতলি থেকে মুক্তিবাহিনীর কোনো গ্রুপ এদিকে আসে কি না সেদিকেও খেয়াল। একটি নৌকা নিমাইবিল থেকে খালে ঢুকতেই এক অজানা আশঙ্কায় বাড়ির সবাই সন্ত্রস্ত হয়ে গেলেন। ঠাকুমা আর পিসিমা অহেতুক চিৎকার করে বাড়িতে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করতে লাগলেন।

নিঃসন্তান সেজো জ্যেঠামশাই বাবাকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসেন। বাবাও তাঁর এই ভাইয়ের কথাকে কখনওই অমান্য করেন না। সেজো জ্যেঠামশাই বাবাকে বললেন, “দেখ এ বাড়িতে মিলিটারি আসবে শুধু তোকে মারার জন্য। বাড়ির অন্য সবাই মরে গেলেও যদি তুই বেঁচে থাকিস তবে পরিবারটা ভবিষ্যতে হয়ত বেঁচে থাকবে। তাই তুই পালিয়ে যা। আমরা মরার আগে যতটুকু পারি লড়াই করতে পারবো। কিন্তু তুই থাকলে সবাই তোকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে তাই প্রতিরোধটা ঠিকমতো করা যাবে না।”
বাবা বললেন, “এটা কী বলো। আমি সবাইকে ছেড়ে স্বার্থপরের মতো পালিয়ে যাব। তাছাড়া এই বর্ষাকালে পালাবই বা কোথায়? তার চেয়ে চল সবাই মরলে এক সাথে মরি। আর যদি বাঁচি তবে সবাই একসাথে।”

সেজো জ্যেঠামশাই বাবার মাথায় হাত দিয়ে বলল, “দেখ মিলিটারি এলে সবাইকে মেরে ফেলবে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই। আর যদি রাজাকার আসে তবে ওরা তোকে শুধু মারবে। তোকে না পেলে বাড়িতে লুট করবে এর বেশি কিছু না। রাজাকারেরা আমাদের মারবে না বোধহয়। তাই পাগলামি করিস না ভাই। তুই পেছনের বাঁশঝাড়ের মধ্যে দিয়ে পুকুরের ওপারে জলের মধ্যে কচুরিপানার ভিতর লুকিয়ে থাক মাথা জাগিয়ে। এখনই যা। যত তাড়াতাড়ি যাবি তত দূরে সাঁতরে যেতে পারবি। মিলিটারি আসলে ফাঁকা গুলিও করতে পারে। তাই নিরাপদে একটি জায়গায় চুপ করে লুকিয়ে থাকা চাই তোর। যা আর তর্ক করিস না।”

বাবার কোনো প্রতিরোধই সেজো জ্যেঠামশাইর কাছে ধোপে টিকলো না। বাবাকে প্রায় জোর করেই ঠাকুমা-পিসিমার অলক্ষ্যে রান্না ঘরের পেছন দিয়ে ঘন লম্বা কচুরিপানা মধ্যে ডোবার জলে নামিয়ে দিলেন। বর্ষাকালে চারদিকে বাঁশ দিয়ে বেড়ি দিয়ে কচুরিপানা চাষ করা হয় গরুর খাবারের জন্য। বাবা সে কচুরিপানার ভিতর ডুব দিয়ে দিয়ে চলে গেলেন অনেক ভিতরে। পেছনের ডোবার ওপাশে আমন ধানের ক্ষেত। বর্ষাকালে জল বাড়ার সাথে সাথে ধানও বেড়ে ওঠে। তাই কচুরিপানার ডোবার সাথে আমন ধান খেতের সংযোগে সহজেই অনেক দূরে চলে যাওয়া যায় সন্তর্পণে সাঁতার কেটে কেটে। এককালের দক্ষ সাঁতারু বাবা তাই বাড়ির নাগাল থেকে অনেক দূর চলে গেলেন। সেজো জ্যেঠামশাই বাঁশঝাড়ের ঝোঁপের আড়াল থেকে লক্ষ করলেন, বাবা অনেক দূরে চলে গিয়ে ডোবার একেবারে শেষ মাথায় একটি বাঁশের বেড়া ধরে আমন ধান আর কচুরিপানার মধ্যে একটু মাথা বের করে আছেন।

ততক্ষণে মিলিটারির নৌকা বাড়ির ঘাটে ভিড়ে গেছে। বড় জ্যেঠামশাই একা কলতলায় নারিকেল গাছের কাছে এগিয়ে গেলেন। দেখা গেল হাতে কাঠের রাইফেল নিয়ে পাশের গ্রামের কালু রাজাকার নৌকার ছইয়ের ভিতর থেকে মাথা বের করে বাড়ির ঘাটের কাঠের পাটাতনের সিঁড়িতে নামলো।

পেছনে আরও আট থেকে দশ জন অচেনা লোক। এদের কয়েক জনের হাতে দোনালা কাঠের বন্দুক। চেহারা দেখে এদের কাউকেই পশ্চিম পাকিস্তানি মিলিটারি মনে হলো না।

(চলমান)

লেখক পরিচিতি

ভজন সরকার
ভজন সরকার
ভজন সরকারের জন্ম বাংলাদেশের ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের মামাবাড়িতে । বেড়ে উঠেছেন মানিকগঞ্জ জেলার পশ্চিমের জনপদে ।বাবা-মা দু’জনেই স্কুল শিক্ষক । ভজন সরকার মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন তেরশ্রী কে এন ইনস্টিটিউশনে। তারপর ঢাকা কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়(বুয়েট) এবং কানাডার উইন্ডসর ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পুনরায় স্নাতক এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর শেষে কানাডায় স্থানীয় সরকারী সংস্থায় প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন কানাডার ওন্টারিও প্রদেশের হ্যামিল্টন শহরে। বর্তমানে সিটি অব হ্যামিল্টনের ৩০ বছরের মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পের প্রধান হিসেবে দায়িত্বরত। প্রথম বই ‘বিভক্তির সাতকাহন’ ‘মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশের পরই ব্যাপকভাবে আলোড়িত এবং আলোচিত সবমহলেই। প্রধানত কবি হ’লেও লিখছেন নিবন্ধ, কলাম ও উপন্যাস বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক এবং সাপ্তাহিক পত্রিকায়। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হ’লোঃ বিভক্তির সাতকাহন ( প্রবন্ধ)- মুক্তিচিন্তা প্রকাশনী; ক্যানভাসে বেহুলার জল ( কাব্য)- নন্দিতা প্রকাশ; বাঁশে প্রবাসে ( প্রবন্ধ রম্যরচনা)- নন্দিতা প্রকাশ ; রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে বসবাস (প্রবন্ধ)- নন্দিতা প্রকাশ; চন্দ্রমুখী জানালা ( উপন্যাস) - নন্দিতা প্রকাশ ।

আরও লেখা

spot_img

সাম্প্রতিক লেখা